'এই অনুষ্ঠানের শুরুতেই ঘোষণা দেওয়া হয় 'সত্য ঘটনা অবলম্বনে' অনুষ্ঠানটি নির্মিত।' ছবি: সংগৃহীত

ভারতের সনি টিভির একটি জনপ্রিয় প্রোগ্রাম ‘ক্রাইম পেট্রোল’। এই অনুষ্ঠানের শুরুতেই ঘোষণা দেওয়া হয় ‘সত্য ঘটনা অবলম্বনে’ অনুষ্ঠানটি নির্মিত। যাই হোক, এবার একটা পর্বের মূল ঘটনায় আসা যাক। ঘটনার শুরুর সময় ১৯৮৪ সাল। দীনা নাথ শর্মা পেশায় একজন পোষ্টম্যান। চিঠি, মানি অর্ডার বিলি করাই যার মূল কাজ।

৫৭ রুপি ৬০ পয়সা তছরুপের সন্দেহে অফিসের পোষ্টমাষ্টার বাবু ১৯৮৪ সালে দীনা নাথের বিরদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করেন। যদিও দীনা নাথ শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন এবং তার যুক্তিও অকাট্য ছিল। কারণ দীনা নাথ ৩৫৭ রুপি ৬০ পয়সা পোষ্টমাষ্টারকে জমা দেয়ার ২ মাস পর তার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করা হয় যে সে ৩০০ রুপি জমা দিয়েছে এবং বাকি ৫৭ রুপি ৬০ পয়সা জমা দেয়নি। দীনা নাথের ভাষ্য ছিল তাহলে দুই মাস পূর্বে যখন সে অর্থ জমা দিয়েছিল তখন তাকে কিছু বলা হল না কেন? সরকারী অর্থ তছরুপের অভিযোগ! থানার কর্মকর্তা পর্যন্ত তাকে বুঝিয়ে দিল সরকারী অর্থ তছরুপ মামলার গুরুত্ব। নিষ্পত্তি হতে সময় লাগবে। তবে তারা দ্রুত কোর্টে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়ে দেবে।

কিন্তু দীনা নাথের জন্য দুভাগ্য যেন সামনেই অপেক্ষা করছিল। মামলা দায়ের হবার জন্য দীনা নাথকে চাকরি থেকে সাসপেন্ড করা হল। পোষ্টমাষ্টার বাবু তাকে জানিয়ে দিলেন মামলা নিষ্পত্তি হবার পর তিনি চাকরিতে আবার যোগদান করতে পারবেন। এর আগে নয়। এতোদিন অভাব অনটনেই চলছিল ডাকপিয়নের সংসার। কিন্তু দীনা নাথের চাকরি ছাড়া আয়ের আর কোন পথ ছিল না। কয়েক মাস বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় শহরের ভাড়া বাসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় এবং গ্রামে চলে আসেন। দিন, মাস, বছর পেরিয়ে যায়।

নির্দিষ্ট সময় পর পর দীনা নাথকে কোর্টে এস হাজিরা দিতে হয়। কিন্তু ৫৭ রুপি ৬০ পয়সা চুরির মামলা আর নিষ্পত্তি হয়না। সংসার চালানোর জন্য গ্রামের সহায় সম্বল কিছু জমি আস্তে আস্তে বিক্রি শুরু করেন। অর্থের অভাবে দুটি ছোট বাচ্চা অল্প বয়সে চিকিৎসার অভাবে মারা যায় এবং অন্য এক ছেলে খুব ছোট বয়স থেকেই চায়ের দোকানে কাজ নেয়। আর দীনা নাথ উপার্জনের অবলম্বন চাকরি ফিরে পাবার জন্য কোর্টে হাজিরা দিতে থাকেন। প্রায় ৩০০ বার হাজিরা দেবার পর তার মামলার নিষ্পত্তি হয় কিন্তু ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে ২৯টি বছর এবং মানসিক ভারসাম্যও তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। এই ৩০০ বার হাজিরার মধ্যে একটি বারও মামলার বাদী পোষ্টমাষ্টার আদালতে আসেননি। কিন্তু আনুমানিক ২৫০ নম্বর হাজিরার সময় মামলার এই দীর্ঘব্যাপ্তীতে ক্লান্ত এবং বিরক্ত হয়ে দীনা নাথ একবার কোর্টে হাজির না হওয়ায় পুলিশ তার বাড়িতে এসে তাকে ধরে নিয়ে যায়। ১৯৮৪ সালে শুরু হওয়া ৫৭ রুপি ৬০ পয়সা চুরির মামলা ২০১৩ সালে এসে নিষ্পন্ন হয়। ভাবা যায়!

আমাদের মিডিয়াতেও বিশিষ্টজনেরা মামলার জট সংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন মতামত দেন। সবাই মামলার জট নিয়ে যে চিন্তিত এটা আমাদের দেশেপ্রেমেরই অন্যদিক। আমাদের সীমাবদ্ধতা বিচারক থেকে শুরু করে বিচারকক্ষের সংখ্যা সব কিছুতেই আছে। এছাড়া আইনের খুঁটিনাটি বিষয় বুঝতে পারা আমাদের অশিক্ষিত, অভাবী গরিব মানুষেরও কর্ম নয়।

লেখক: রিয়াজুল হক, উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

আজকের পত্রিকা/সিফাত