ছবি: আজকের পত্রিকা

হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে নতুন আর কী-ই বা বলা যায়! জীবিত থাকতেই তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি। বাংলাদেশে লেখাটাকে যে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা যায় সেটা তিনি প্রথম দেখিয়েছেন তা নয়, তবে তিনি সেটি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। প্রকাশকরা তাঁর বাসায় টাকার ব্যাগ, গাড়ির চাবি, মূল্যবান উপহার সামগ্রী নিয়ে বসে থাকতেন একটা নতুন বই পাওয়ার আশায়। বাংলাদেশ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গেও ভীষণ জনপ্রিয় ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। বাংলা ভাষাভাষী এমন কোনো পাঠক হয়ত আজকের দিনে পাওয়া যাবে না, যিনি হুমায়ূন আহমেদের নাম শোনেননি কিংবা তাঁর কোনো লেখা পড়েননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন লেখালিখির জন্য। শুধু লেখক হিসেবে নন, নাটক ও সিনেমা নির্মাতা হিসেবেও তিনি ঈর্ষণীয় রকমের সফল ছিলেন। কিন্তু শিল্প সাহিত্যের যারা মোড়ল, প্রথম থেকেই হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তাকে তারা ভালোভাবে গ্রহণ করেননি। সম্ভবত, তাদের তোয়াজ না করার জন্য হুমায়ূন আহমেদকে তাঁরা কল্কে দেননি। হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তাও তাদের ঈর্ষার কারণ ছিল। তথাকথিত ‘ভালো সাহিত্যের’ বই যেখানে এক হাজার কপি বিক্রি হয় না, হুমায়ূন আহমেদের বই বিক্রি হয় লাখ লাখ কপি। দৈনিক কিংবা সাপ্তাহিক পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় হুমায়ূন আহমেদের লেখা থাকলে তার বিক্রি বহুগুন বেড়ে যেত। জনপ্রিয়তায় তাঁর ধারে কাছেও ছিলেন না অন্য কোনো বাংলাদেশী লেখক।

জনপ্রিয় সাহিত্য এবং ভালো সাহিত্য নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এটা সবাই স্বীকার করবেন যে, ভালো সাহিত্যও জনপ্রিয় সাহিত্য হতে পারে। আবার ভালো সাহিত্য একেবারেই বাজারে বিকোবার মতো নাও হতে পারে। সুতরাং জনপ্রিয়তা বিষয়টি একদম আলাদা। মার্কেজ যেমন একই সাথে ভালো সহিত্যিক, তেমনি জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু এ কথা কমলকুমার মজুমদারের বেলায় খাটে না। তিনি ভালো সাহিত্যিক, কিন্তু জনপ্রিয় নন। সমকালে জনপ্রিয়তা যে একজন সাহিত্যিকের জন্য ঈর্ষার কারণ হতে পারে, হুমায়ূন আহমেদ তার প্রমান। তবে, হুমায়ূন আহমেদ, ভালো সাহিত্য ও খারাপ সাহিত্য নিয়ে আলাপে বরাবরই উৎসাহী ছিলেন না। তিনি অনেক সাক্ষাৎকারে বলেছেন তিনি শুধু তাঁর নিজের আনন্দের জন্য লেখেন। অন্য কেউ সেটিকে কী বলল, তা নিয়ে তাঁর কোনো মাথাব্যথা নেই। সম্ভবত সাহিত্যের মোড়লদের ওপর রুষ্ট হয়ে এ কথা বলতেন। আর তিনি কোন ধরনের সাহিত্য করছেন সেটি তিনি বুঝতে পারছেন না, এমন ভাবাটা নিতান্তই বোকামি হবে। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন তিনি কী লিখছেন। ফলে, তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর সাহিত্য নিয়ে যারা নাট সিঁটকাতেন, তাদের দেখে তিনি এক ধরনের মজাই পেতেন বলে মনে হয়। তবে, ভালো সাহিত্যের যে মানদণ্ড সেখানেও তাঁর অনেক সাহিত্যকর্ম উতরে গেছে। তাঁর ছোটগল্পগুলিও উৎকৃষ্ট মানের সাহিত্য বলেই বিবেচিত হয়।

আমাদের দেশের সাহিত্য এবং চলচিত্রের অন্যতম প্রবণতা হলো যে চরিত্রটি নেগেটিভ, তাকে আপদমস্তই নেতিবাচকভাবে করে নির্মাণ করা হয়। যেন একজন খারাপ মানুষের সবটাই খারাপ। তার মধ্যে কোনো ভালো গুন নেই! তেমনি একজন নায়ক চরিত্রকে তৈরি করা হয় দুধে ধোয়া তুলসিপাতা হিসেবে। যেন সে বিন্দুমাত্র খারাপ কাজ করতে পারে না। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর সাহিত্যে এই জায়গা থেকে সরে আসেন। তাঁর খারাপ চরিত্রেরও থাকে অসাধারণ কোনো ভালো গুন। আবার তাঁর নায়কদের মধ্যেও থাকে খারাপ দোষ ত্রুটি। এমনকি গ্রামের রাজাকার চরিত্রকেও তিনি মানবিকভাবে দেখিয়েছেন। এই সাহস সম্ভবত এই দেশে আর কোনো সাহিত্যিক করেননি। ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের বাকের ভাই চরিত্রটিকেও আমরা এ প্রসঙ্গে স্মরণ করতে পারি। পাড়ার মাস্তান চরিত্রটির ফাঁসি বন্ধ করতে ঢাকায় মিছিল পর্যন্ত বের হয়। কতটা প্রভাবশালী লেখক হলে একটি টেলিভিশন নাটকের চরিত্রকে বাঁচাতে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।

মধ্যবিত্তের লেখক ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। মধ্যবিত্তকে তিনি কথায় কথায় হাসাতে পারতেন, পারতেন কাঁদাতেও। তাঁর মতো হিউমার সেন্স খুব কম লেখকেরই ছিল। তিনি যেসব চরিত্র নির্মাণ করেছেন, সেগুলো মধ্যবিত্তের স্বপ্নের চরিত্র। তারা সেরকম হতে চায়। কিন্তু, উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত যা সহজেই পারে, মধ্যবিত্ত সেটা পারে না। হুমায়ূন আহমেদের গল্প-উপন্যাসের মধ্যবিত্তেরা সেটা পারত। ফলে, মধ্যবিত্তে যখন তার ফ্যান্টাসির চরিত্র উপন্যাসগুলোতে দেখতে পেত, তাদের সেটা গ্রহণ না করা ছাড়া উপায় ছিল না। সে কারণেই হিমু, বাকের ভাই এত জনপ্রিয়। সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ এটি। হুমায়ূন আহমেদ কয়েকটি প্রজন্মকে বইমুখী করেছিলেন। বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকেও এনেছিলেন ভিন্ন মাত্রা। তাঁর লেখা গানগুলোও মানুষ বহুদিন মনে রাখবে।

হুমায়ূন আহমেদের যারা সমালোচক, তাঁরা তাঁর সবকিছুকেই খারাপভাবে দেখেন। আর যারা তার ভক্ত, তাঁরা সবকিছুকেই ভালো বলেন। সে কারণেই হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যের বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা খুব একটা চোখে পড়ে না। দিন যাচ্ছে, আশা করি আগামীর সাহিত্য সমালোচকরা নির্মোহ দৃষ্টিতে হুমায়ূন আহমেদকে বিচার করবেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে হুমায়ূন আহমেদকে এড়িয়ে যাবার উপায় নেই। বাংলা সাহিত্যের এই প্রভাবশালী লেখকের মৃত্যুদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক: মেহেদি রাসেল; কবি ও কলামিস্ট