ড্রাইভ নিয়া কথা বলার আগে অবশ্যই প্লেজার প্রিন্সিপাল নিয়াও জানা থাকা জরুরী। ছবি: হিমালয় হিমুর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে সংগৃহীত।

ফ্রয়েড মানুষের দুই ধরনের ড্রাইভের কথা বলেছে, যদিও ফ্রয়েড নিয়া অনেকের মধ্যেই এলার্জি আছে, তবুও তার দৃষ্টান্তই এই বিষয়ে এখনো তাৎপর্য হারায় নাই। ইরোস আর থ্যানাটস মানুষ এই দুই ধরনের ড্রাইভে পরিচালিত হয়। ড্রাইভ নিয়া কথা বলার আগে অবশ্যই প্লেজার প্রিন্সিপাল নিয়াও জানা থাকা জরুরি।

মূল কথায় আসি, তো ইরোস হচ্ছে মানুষের সেই কার্যক্রম যা মানুষকে সামজিক করে, লক্ষ্যে পৌঁইছাইতে সহায়তা করে।
আর থ্যানাটস হচ্ছে মানুষের সেই কার্যক্রম যা তাকে সমাজ থেকে দূরে রাখে, এবং সেলফ ডেস্ট্রাক্টিভ কার্যক্রমে লালিত করে।আত্মহত্যা থ্যানাটসের আওতাভুক্ত। ফলে বাঁচা ও মরা, আত্মহত্যা বা শত বাধাতেও জীবনকে টেনে নিয়ে যাওয়া দুইটাই মানুষের মৌলিক প্রবণতারই অংশ। যেহেতু মানুষ মৃত্যু, হত্যা সম্বন্ধে সচেতন এবং সেলফ রিফ্লেক্টিভ আচরণ তার স্বভাব।

সুইসাইডিক্যাল টেন্ডেন্সি মানুষ ব্যাতিত অন্য প্রাণীদের আছে কী নাই এইটা তর্ক সাপেক্ষ, যদিও বিভিন্ন প্রাণীদের মাঝে সেলফ ডেস্ট্রাকটিভ প্রবণতা দেখা যায়। ফলে, আপাত মানুষের মধ্যেই এই কার্যক্রম নিয়া আলাপ সীমিত রাখি। মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার আগেই সেলফ ডেস্ট্রাকটিভ প্রবণতা প্রচুর আছে এবং এ নিয়া রীতিমত সংস্কৃতিও আছে। আবার মৃত্যু/হত্যাকে আলিঙ্গন করতেও সংস্কৃতি আছে, যেমন যুদ্ধে যাওয়া। সেই অর্থে মানুষের সংস্কৃতিতেই মৃত্যু ও হত্যা নিয়া নানা কার্যক্রম বিদ্যমান।

এই কারণেই আত্মহত্যাকে নিছক ব্যক্তির ইচ্ছা মৃত্যু হিসাবে সব সময় ভাববার কারণ নাই, যতই তা দার্শনিকভাবে হাজির হউক আর যেহেতু সামজিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তিকে আত্মহত্যা করতে দেখা যায় না। শিশু কিশোরদের মাঝে সেলফ ডেস্ট্রাক্টিভ যে প্রবণতা দেখা যায়, তা কখনই সেই শিশু-কিশোরদের নিজের তৈরি নয়, তার পরিবেশ তাকে নিয়ে যায় সেই প্রবণতাতে। লক্ষণীয় বিষয় এই- একই সেলফ ডেস্ট্রাক্টিভ প্রবণতা যখন একজন তরুণ বা প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির ক্ষেত্রে দেখা যায়, তখনই দেখা যাবে সমাজ দায় দিচ্ছে শুধুমাত্র সেই ব্যক্তিকেই, তাকে হেনস্থা করার রীতিমতো সব আয়োজনই সমাজ করে থাকে, বা ক্ষেত্র বিশেষে তাকে মদদ দেবার সাংস্কৃতিক সমস্ত আয়োজনই সমাজ থেকে পূর্বেই চালু রাখা হয়, যেমন- ইয়াবা।

আবার স্ট্রেস না নিতে পারা বা লড়ায়ে হেরে যাওয়া দিয়েও ব্যক্তির ইচ্ছা মৃত্যুকে সরলভাবে দেখার কারণ নাই। সাম্প্রতিক সময়ে তাবৎ বিশ্বে কর্মজীবী পুরুষদের আত্মহত্যার সংখ্যা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ব্যক্তির একার দায় দেওয়া যায় না। কারণ নাই একে একচেটিয়া অপরাধ বা পাপ ভাববার। তেমনই দার্শনিক স্বাধীনতা সম্বলিত বিরচিত কর্ম হিসাবে দেখারও যো নাই। বরং হত্যা, মৃত্যু নিয়া মানুষের যে সমস্ত সংস্কৃতি চালু আছে তা পুনর্পাঠের প্রয়োজন আছে। প্রয়োজন আছে সমাজে সেলফ ডেস্ট্রাক্টিভ প্রবণতাগুলা চালু রাখার রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক কারণগুলারে চিহ্নিত করার। আর খোদ ব্যক্তির পরিচয়, অবস্থান বিচার করা, সর্বগ্রাসী পুঁজিবাদের এই জামানাতে।

হিমুর আত্মহত্যার পর পরস্পর বিরোধী নানা তর্ক দেখতেছি, কিন্তু হিমু কেন ইরোস থেকে থ্যানাটসে পৌঁছাইল, তা নিয়া আলাপ দেখতেছি না। এইটাই হইত হিমুর (দার্শনিক) স্বেচ্ছা মৃত্যুর প্রেক্ষাপট, কারণ বা প্ররোচনা।

(দার্শনিক আত্মহত্যা বললাম মূলত তাদের জন্য যারা আত্মহত্যাকে মহিমান্বিত করছেন তাদের জন্য এবং যারা দার্শনিক তত্ত্ব হাজির করে আত্মহত্যা করেন তাদের জন্য)

লেখক: আবদুল হালিম চঞ্চল 
শিল্পী ও শিক্ষক- পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া একাডেমি

আজকের পত্রিকা/সিফাত/জেবি