রাজধানীর মিরপুর সাড়ে ১১ নম্বর বাসস্ট্যান্ডে হিজবুত তাহরীরের পোস্টার লাগানো। ছবি: আজকের পত্রিকা

নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরীরের তৎপরতা বেড়ে চলছে। তারা কিছুদিন ঝিমিয়ে থাকলেও সম্প্রতি রাজধানীর ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দেয়ালে দেয়ালে তাদের আদর্শ ও দাবি প্রচারণার পোস্টার সাঁটিয়ে চলছে।

১০ জুন সোমবার সকালে রাজধানীর মিরপুর সাড়ে ১১ নম্বর বাসস্ট্যান্ডে দেখা মেলে এমনই একটি জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ। একই আদলে রাজধানীর কমলাপুরসহ আরো কয়েকটি এলাকায় পোস্টার সাঁটানোর তথ্য পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) কৃষ্ণপদ রায় আজকের পত্রিকাকে বলেন, হিজবুত তাহরীর একটি নিষিদ্ধ সংগঠন। কোনোভাবেই তাদের তৎপরতা চালানো অধিকার নেই। এই বিষয়ে আমরা সজাগ রয়েছি। এই সংগঠনটি পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে তাদের প্রচারণার পোস্টার লাগিয়ে থাকে। আমরা কোথাও তাদের পোস্টার দেখলে তা ধ্বংস করে ফেলি। যারা ওইসব পোস্টার লাগিয়েছে তাদের বের করে গ্রেফতারের পরবর্তী আইনে আনার চেষ্টা করি। এই বিষয়ে সর্বদা আমাদের গোয়েন্দা নজরদারী চলছে।

বিভিন্ন সময়ে আমরা হিজবুত তাহরীরের বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেফতারও করেছি, যে প্রক্রিয়া এখনো অব্যহত রয়েছে।

এই সংগঠনের যারা আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে যায় তাদের বিষয়ে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করছে ও নজর রাখছে। তাদের উপর নিয়মিত ফলোআপ চলছে।

জানা যায়, ২০০০ সালের দিকে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে হিযবুত তাহরীর। প্রথমে ক্ষুদ্র পরিসরে কার্যক্রম শুরু করলেও ধীরে ধীরে তা বাড়াতে থাকে। তাদের টার্গেট ছিলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। এমনকি মাদরাসাও। শিক্ষার্থীদের দলে টানতে বিভিন্ন প্রলোভন দেখায় তারা। ধর্মীয় নানা বিষয় বোঝানোর চেষ্টা করে। সে কারণে অনেকেই তাদের দলে ভিড়ে। মেধাবী, দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের টার্গেট করে এগিয়ে যায় তারা। এক পর্যায়ে এ সংগঠন প্রসার লাভ করে।

এটি একটি উগ্র সংগঠনে পরিণত হয়। এ কারণে ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর নিষিদ্ধ করা হয় এ সংগঠনকে। এরপর তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। নিষিদ্ধ হওয়ার পর তাদের কর্মকাণ্ড ঝিমিয়ে পড়ে।

নিষিদ্ধ হওয়ার পর বছর খানেক তাদের কর্মকাণ্ড বন্ধ ছিলো। এরপর আবারো খুবই গোপনে তৎপরতা শুরু করে। কোনো কোনো সময় প্রকাশ্যেও আসে তারা। অভিযান চালিয়ে পুলিশ হিযবুত তাহরীরের একটি খসড়া সংবিধান উদ্ধার করে যাতে বাংলাদেশকে ইসলামী খিলাফতভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ ছিলো।

নিষিদ্ধ ঘোষণার পর প্রকাশ্য কর্মসূচি পালন থেকে বিরত থাকা হিযবুত তাহরীর বিভিন্ন সময় ঝটিকা মিছিল ও প্রচারপত্র বিতরণ করে নিজেদের অবস্থান ও কর্মকাণ্ডর কথা জানান দেয়।

সূত্র জানা যায়, ২০১৫ সাল পর্যন্ত হিযবুত তাহরীর কর্মীরা নগরীতে গোপনে সক্রিয় ছিলো। কয়েক মিনিটের ঝটিকা মিছিল, গভীর রাতে পোস্টার লাগানো, গণমাধ্যমের কার্যালয়ে গিয়ে লিফলেট ও প্রেস রিলিজ পৌঁছানোর কাজ তারা নিয়মিত করতো।

এরই প্রেক্ষিতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থান নেয়। সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে। র‌্যাব, গোয়েন্দা ও থানা পুলিশের অভিযানে কাবু হয়ে যায় তারা। এক পর্যায়ে কর্মকাণ্ড প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারে নির্যাতন অত্যাচারে রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে আসার পর হিযবুত তাহরীর ফের সক্রিয় হয়ে উঠে। এ সময় তারা তাদের প্রতি সহানুভুতি জানিয়ে পোস্টার লাগানো ও লিফলেট বিতরণ করার চেষ্টা করে। ওই সময় তাদের বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তখন আবারো বন্ধ হয়ে যায় তাদের তৎপরতা।

২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করলে ফের তৎপর হয়ে উঠে তারা। এছাড়াও চলতি বছর ২০১৯ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, ডাকসু নির্বাচনের বিরুদ্ধে প্রচারণায় নেমেছিলো নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরীর। তাদের পোস্টারে ক্যাম্পাস সয়লাব হয়েছিলো। এতে ক্ষোভ জানিয়েছিলো ক্যাম্পাসে সক্রিয় সকল সংগঠন। এর পেছনে প্রশাসনের অবহেলাকেই দায়ী করছিলো তারা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলেছিলো, জঙ্গিদের খুঁজে বের করা হবে।

জানা গেছে, হিজবুত তাহরিরের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিশেষ নজর রাখছে পুলিশের বিশেষায়িত জঙ্গি দমন ইউনিট সিটিটিসি এবং র‌্যাব।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চশিক্ষিত অনেক তরুণ হিজবুত তাহরিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তারাই মূলত মাঠ পর্যায়ে প্রচারণা চালাচ্ছে। তাছাড়া প্রযুক্তিতে দক্ষ অনেক তরুণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালায়। প্রচারণায় ক্ষমতাসীন সরকারকে হটিয়ে ‘খিলাফায় রাশিদাহ’ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানাচ্ছে সংগঠনটি। গণতন্ত্রবিরোধী বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষকে দলে টানতেই মূলত এই কৌশলে প্রচার চালাচ্ছে তারা।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, হিজবুত তাহরীর রাজধানী ঢাকায় বেশি সক্রিয়। পাঠচক্রের মাধ্যমে শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের তরুণ-তরুণীদের টার্গেট করে দলে টানছে। কর্মী সংগ্রহ এবং ‘মগজধোলাই’ চলছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, গত ৫ বছরে হিজবুত তাহরীরের দুই শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

বাংলাদেশে ২০০০ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর দিকে ওই সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক এই সংগঠনের নেতৃত্ব দেন। উচ্চশিক্ষিত, মেধাবী ও উচ্চবিত্ত তরুণ-তরুণীদের টার্গেট করে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে হিজবুত তাহরীর।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রথমদিকে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা না থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিজবুত তাহরীরকে গুরুত্ব দেয়নি। পরে প্রকাশ্যে মিছিল-মিটিং ও সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড শুরু করলে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে হিজবুত তাহরিরকে নিষিদ্ধ করা হয়।

ইতিহাস
মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৫৩ সালে হিজবুত তাহরীর প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলামী খিলাফত হচ্ছে সে ব্যবস্থা যা পৃথিবীতে ইসলামী শরীয়াহ’র বাস্তবায়ন করে থাকে এবং ‘দাওয়াত ও যুদ্ধের’ মাধ্যমে ইসলামকে পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতার নিকট উপস্থাপন করে থাকে। হিযবুত তাহরীর মনে করে- মুসলিম বিশ্বের সকল সমস্যার মূলে রয়েছে উম্মাহর মধ্যে খিলাফত ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং খিলাফত ব্যবস্থাই হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও শক্তির প্রতীক।

ফিলিস্তিনের জেরুজালেমের শরীয়াহ আদালতের বিচারপতি শায়খ তাকী-উদ্দিন আন-নাবহানী কর্তৃক ১৯৫৩ সালে এ দলের প্রতিষ্ঠা হয়। শায়খ তাকী-উদ্দিন আন-নাবহানী মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় হতে শিক্ষিত একজন স্বয়ংসম্পূর্ন ইসলামী গবেষক (মুজতাহিদ মুতলাক) ছিলেন। প্রতিষ্ঠার পর মধ্যপ্রাচ্য হতে এ দল ধীরে ধীরে আফ্রিকা, ইউরোপ, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। (তথ্যসূত্র-উইকিপিডিয়া)

আজকের পত্রিকা/কেএফ