সরেজমিনে তদন্ত করছে দুদক।

দুদকের অনুসন্ধানে মিলেছে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা। কিন্তু নিজেদের রক্ষায় তদবিরসহ বিভিন্ন স্থানে দৌড়ঝাপ শুরু করেছে ঠিকাদারী প্রতিষ্টান দেশ উন্নয়ন লিমিটেড ও গণপূর্ত বিভাগ।

তবে আগামী ২৮ মে আবারো ভবনের বিভিন্ন অংশে অনুসন্ধান চালাবে দুদক, এমন তথ্য জানা গেছে হবিগঞ্জ জেলা দুর্নীতি দমন অফিস সূত্রে।

হবিগঞ্জ সদর হাসপাতাল নির্মাণে অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের পর নিজেদের রক্ষা করতে ৩ ইঞ্চির ভিট লেভেল গাথুনির ভেতরের অংশে আরো ১০ ইঞ্চি দেয়াল নির্মাণ করেছে প্রতিষ্টানটি।

স্থানীয় সাংবাদিক আবু হাসিব খান চৌধুরী পাবেল এর দেখানো স্থানে অভিযান চালিয়েই পাওয়া যায় এই অনিয়মের চিত্র। তবে এই অনিয়মকেও শতভাগ স্বচ্ছ কাজ হয়েছে বলে দাবি করেছেন গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সা’দ মোহাম্মদ আন্দালিব ও ঠিকাদারী প্রতিষ্টানের প্রকল্প ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুর রহমান হাবিব।

জানা যায়, ২০১৪ সালে হবিগঞ্জ শহরের নিউ ফিল্ড মাঠে জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত সভাবেশে জেলা সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য এ্যাডভোকেট মোঃ আবু জাহির হবিগঞ্জের অবহেলিত জনসাধারনের উন্নত চিকিৎসার জন্য ১শ শয্যার আধুনিক সদর হাসপাতালটিকে ২শ ৫০ শয্যায় উন্নীত করে একটি মেডিক্যাল কলেজ ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান প্রধানমন্ত্রীর কাছে।

তাঁর দাবির প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উভয় দাবি মেনে নিয়ে হাসপাতালটিকে ২শ ৫০ শয্যায় উন্নীত করে মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের ঘোষণা দেন।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর দ্রুত অনুমোদন পেয়ে ২শ ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ। আর এই হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণের জন্য হবিগঞ্জ গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে চট্টগ্রামের ঠিকাদারী প্রতিষ্টান দেশ উন্নয়ন লিঃ ২০১৫ সালের শুরুর দিকে ১৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২শ ৫০ শয্যা বিশিষ্ট ৬ তলা ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু করে। ওই ভবনের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ।

ইতোমধ্যে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী এটি উদ্বোধনও করেছেন।

ঠিকাদারী প্রতিষ্টান যথা সময়ে নির্মাণ কাজ শেষ না করতে পারায় ভবনটি উদ্বোধনের পুর্বে বেশ কয়েক বার তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছিল। আর এই সুযোগে তড়িগড়ী করে কাজ করার ফলে দূর্নীতির মাত্রাও আরো বেড়ে যায়।

২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালের ভবন নির্মাণ কাজের দুর্নীতির বিষয়ে ২য় দফা তদন্ত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

১৫ মে মঙ্গলবার ফের ভবনটিতে অনুসন্ধান চালায় দুদক। সেই সাথে বেশ কিছু স্থানে ভবন ভেঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। আর ওই পরীক্ষাতেই বেরিয়ে আসে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ভবনের মূল ভিট লেভেল দেয়ালে ১০ ইঞ্চির স্থলে ৩ ইঞ্চি কাজ করার অনিয়মটি।

তবে তদন্তে রহস্যজনকভাবে বেরিয়ে আসে ঠিকাদারী প্রতিষ্টানটি ১০ ইঞ্চির স্থলে ১৫ ইঞ্চি দেয়াল নির্মাণ করার বিষয়টি।

এখানেও সাধারণ মানুষের মাঝে নতুন করে প্রশ্ন জাগে, কোনো স্বার্থে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দেশ উন্নয়ন লিঃ ৫ ইঞ্চি দেয়াল বেশি নির্মাণ করেছে।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করে বলেন, ভবনটির নির্মাণ কাজ চলাকালীন সময়ে হবিগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সা’দ মোহাম্মদ আন্দালিব, তৎকালীন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মুকুল চন্দ্র দাস, উপ-সহাকারী প্রকৌশলী গোলাম মস্তোফাসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রায় প্রতিদিন পরিদর্শন করলেও তাদের চোঁখে একেবারেই ধরা পরেনি বিষয়টি। তাঁরা যেনো দেখেও না দেখার ভান করতেন।

স্থানীয়দের দাবি, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সা’দ মোহাম্মদ আন্দালিব, তৎকালীন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মুকুল চন্দ্র দাস, উপ-সহাকারী প্রকৌশলী গোলাম মস্তোফাসহ সংশ্লিষ্টদের ব্যাপারে তদন্ত চালালেই বেরিয়ে আসবে তারা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কি পরিমাণ অবৈধ সুযোগ-সুবিধা তারা নিয়েছেন।

সরেজমিনে তদন্ত করছে দুদক।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ৩০ মে স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়। এর প্রেক্ষিতেই দুদকের প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে তদন্তে নামে দুদক।

এরই ধারাবাহিকতায় ৭ মে মঙ্গলবার দুপুরে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক হবিগঞ্জের উপ-পরিচালক অজয় কুমার সাহার নেতৃত্বে প্রথম দফা তদন্ত শুরু করেন কর্মকর্তারা। এ সময় ভবনটির চার পাশে ঘুরে দেখেন তারা।

তখন ভবনের বিভিন্ন দিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেন কর্মকর্তারা।

এ জন্য একজন নিরপেক্ষ প্রকৌশলীকে আনা হয় তদন্তে গঠিত কমিটির পক্ষ থেকে।

আর এই তদন্তে সহযোগিতা করার জন্য স্থানীয় সাংবাদিক দৈনিক মানবকণ্ঠ ও ঢাকা টাইমস টোয়েন্টি ফোর ডটকমের হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি আবু হাসিব খান চৌধুরী পাবেলকে লিখিতভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

গত ২ ও ৫ মে হবিগঞ্জ দুর্নীতি দমন কমিশনের উপ-পরিচালক অজয় কুমার সাহার স্বাক্ষরিত পত্রে বলা হয়, ‘ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দেশ উন্নয়ন লিঃ কর্তৃক ২৫০ শয্যা হবিগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতালের নতুন ভবন (বর্তমানে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ) হাসপাতাল হবিগঞ্জ এর নির্মাণ কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রকাশিত রিপোর্টের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে অনুসন্ধান কাজ চলমান রয়েছে।

দুদকের উপ-পরিচালক অজয় কুমার সাহা বলেন, আমাদের তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত আছে।

আজকের পত্রিকা/ফয়ছল ইসলাম/হবিগঞ্জ/এমএআরএস