হবিগঞ্জে অতিথি পাখি শিকার

আসি আসি করে চলে এলো শীত। প্রতি বছর শীতকাল এলেই আমাদের আশপাশের জলাশয়, বিল, হাওর, পুকুর ভরে যায় নানা রঙ-বেরঙের নাম না জানা পাখিতে। এসব পাখিকে অতিথিপরায়ন বাঙালী আদর করে নাম দিয়েছে অতিথি পাখি। শীত আসার সাথে সাথে আমাদের দেশে আসছে অতিথি পাখিরা। মূলত সাইবেরিয়া থেকে ঝাকে ঝাকে ওদের আগমন।

আমরা যাকে অতিথি পাখি বলে চিনি, সেই পাখিকে ইংরেজিতে বলে মাইগ্রেটরি বার্ড। শুদ্ধ বাংলায় যার মানে দাঁড়ায় পরিযায়ী পাখি। অর্থাৎ যেসব পাখি বছরের নিদিষ্ট একটা সময় নিজের দেশ বা নিজের এলাকা ছেড়ে বিশেষ প্রয়োজনে অন্য কোন দেশে বা এলাকায় চলে যায় এবং কিছুদিন পর আবার নিজের এলাকায় ফিরে আসে তাদেরকেই সাধারত পরিযায়ি পাখি বলে। তবে পর্যটকদের মতো মনের সুখে কিন্তু তারা পৃথিবীকে জানার জন্যে ঘুরতে বের হয় না। তবু প্রতি বছর ওরা পৃথিবীর এক জায়গা থেকে উড়ে উড়ে চলে যায় আরেক জায়গায়। এর প্রধান কারণ হলো শীত। তীব্র শীতের কবল থেকে রক্ষা পেতেই ওদের এই ঘুরে বেড়ানো।

পৃথিবীতে প্রায় ৫ লাখ প্রজাতির পাখি আছে। এসব পাখিদের মধ্যে অনেক প্রজাতিই বছরের একটি নিদিষ্ট সময় অন্য দেশে চলে যায়। শুধু ইউরোপ আর এশিয়ায় আছে প্রায় ৬০০ প্রজাতির পরিযায়ি পাখি। এসব পাখির মধ্যে প্রায় ১৫০ প্রজাতির পাখি আমাদের দেশে প্রতি বছর বেড়াতে আসে। কিছু কিছু পাখি তাই প্রতি বছর ২২ হাজার মাইল পথ অনায়াসে পাড়ি দিয়ে চলে যায় দূরদেশে। উত্তর মেরু অ লের এক জাতীয় সামুদ্রিক শঙ্খচিল প্রতিবছর এই দূরুত্ব অতিক্রম করে দক্ষিণ দিকে চলে আসে।

বরফ শুভ্র হিমালয় এবং হিমালয়ের ওপাশ থেকেই বেশীর ভাগ অতিথি পাখির আগমন ঘটে। এসব পাখিরা হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত তিব্বতের লাদাখ থেকে সেন্ট্রাল এশিয়ান ইন্ডিয়ান ফ্লাইওয়ে দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এছাড়া ইউরোপ, দুরপ্রাচ্য (যেমন সাইবেরিয়া) থেকেও এসব পাখি আমাদের দেশে আসে। আর কয়েকমাস বাংলাদেশী বা বাঙালিদের সঙ্গে কাটিয়ে মার্চ-এপ্রিলের দিকে আবার ফিরে যায় নিজের দেশে।

এসব পাখিদের মধ্যে বাংলাদেশের অতি পরিচিতি অতিথি পাখি নর্দান পিনটেইল। এছাড়া স্বচ্ছ পানির বালি হাঁস, খয়রা চকাচকি, কার্লিউ, বুনো হাঁস, ছোট সারস পাখি, বড় সারস পাখি, হেরন, নিশাচর হেরন, ডুবুরি পাখি, কাদাখোঁচা, গায়ক রেন পাখি, রাজসরালি, টিকিহাঁস, পাতিকুট, খরচা চকাচকি, মরচে রঙভুতিহাঁস, কালামাথা, গাঙচিল, সরালি, কালোকুট, গ্যাডওয়াল, পিনটেইল, নরদাম সুবেলার, কমন পোচার্ড, বিলুপ্ত প্রায় প্যালাস ফিস ঈগল (বুলুয়া) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও নানা রং আর কন্ঠ বৈচিত্রের পাখিদের মধ্যে রয়েছে ধুসর ও গোলাপী রাজহাঁস, বালি হাঁস, লেঞ্জা, চিতি, সরালি, পাতিহাঁস, বুটিহাঁস, বৈকাল, নীলশীর পিয়াং, চীনা, পান্তামুখি, রাঙ্গামুড়ি, কালোহাঁস, রাজহাঁস, পেড়িভুতি, চখাচখি, গিরিয়া, খঞ্জনা, পাতারি, জলপিপি, পানি মুরগি, নর্থ গিরিয়া, পাতিবাটান, কমনচিল, কটনচিল প্রভৃতি।

এ দিকে আর এক শ্রেণীর সুযোগ সন্ধানী পাখি শিকারীরা যেন মেতে উঠেছে শিকার উৎসবে। অসচেতন মানুষও শিকারীদের কাছ থেকে পাখিগুলো আনন্দের সাথে কিনে নিচ্ছেন। পাখি শিকার করা আইনত অপরাধ জেনেও কিছু মানুষ ও শিকারীরা এ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে হবিগঞ্জ-লাখাই রোডের কোর্ট ষ্টেশন পুলিশ ফাড়ি সংলগ্ন এলাকায় একঝাঁক বক পাখি বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রী করেছে এক শিকারী। পাখি শিকার করা আইনত অপরাধ শিকারীকে প্রশ্ন করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলে, সবাইত পাখি শিকার করে নিজেরা খায়, বাজারে বিক্রি করে, আমি করলে দোষ কি।

ব্যবসায়ী মাসুক মিয়া বলেন, শুধু আইন করে পাখি শিকার বন্ধ করা যাবে না। আগে জনসাধারণকে বোঝাতে হবে পাখি আমাদের সম্পদ, গাছের সুন্দর, হাওরের সুন্দর।

একই এলাকার ব্যবসায়ী ইকবাল আহমেদ বলেন, অতিথি পাখিরা শুধু আমাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, তারা বেচেঁ থাকলে আমাদের প্রকৃতিতে অনেক কিছুই পায়। যেমন- পাখি ফল খেয়ে দেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বীজ ছড়িয়ে দিচ্ছে। ওই বীজ থেকে গাছ হচ্ছে। আর এ গাছ থেকে অক্সিজেনসহ আমরা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছি।

সচেতন মহল মনে করেন, অতিথি পাখির এই আসা-যাওয়া আমাদের দেশের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গেছে। এসব পাখি দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অনবদ্য ভূমিকা রাখে। এটা আমাদের দেশের অর্থনীতির জন্য মঙ্গলদায়ক। কিন্তু আমাদের দেশে এক শ্রেণির মানুষ আছে, যারা লোভের বশে এসব পাখি শিকার করে থাকে। এসব পাখি শিকারির হাত থেকে রক্ষা করতে ‘অতিথি পাখি আইন’ করা হয়েছে। শুধু আইন করলে যে সব কাজ শেষ হয়ে যায়, তা-ও নয়, বরং এর সঠিক ও কার্যকর প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে বাস্তবায়ন। আসুন, সচেতন হই, গড়ে তুলি অতিথি পাখির জন্য নিরাপদ আশ্রয়।

এম এ আজিজ সেলিম/হবিগঞ্জ