সাংবাদিক-এমএআর শায়েল

যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয়, এ সপ্তাহের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা কোনটি? আপনি নিশ্চয়ই চোখ না খোলেই বলে দিবেন স্ত্রীর সামনে স্বামীকে আঘাত, অবশেষে মৃত্যু। আর তাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল শ খানেক লোক। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসল না। এ নিয়ে এরই মধ্যে উত্তাল হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক।

কেননা তথ্য প্রযুক্তির বদৌলতে এ বিষয়টি এমনভাবে ভাইরাল হয়েছে একজন অন্ধও সহজে বলে দিতে পারবে কোন ঘটনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেনো এ হত্যাকাণ্ড ঘটলো? কেনো অকালে একটা প্রাণ নিভে গেলো!

পাঠক, আপনারা দুই ফুল এক মালির কথা শুনেছেন? হ্যাঁ শুনেছেন। দেখেছেনও। সিনেমায়। আবার বাস্তবেও কোনো কোনো জায়গায় এক ফুল দুই মালির দেখা মিলেছে, তবে তাদের সংখ্যা খুবই কম?

অনেকেই এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে চোখে সানগ্লাস পড়ে আছেন। যে যেভাবে পারছেন, হত্যাকাণ্ড নিয়ে তাদের মতামত দিচ্ছেন। বলছিলাম, বরগুনার রিফাত হত্যাকাণ্ডের কথা। অনেকেই বলছেন, রিফাত-আর মিন্নির কাহিনী সেই ‘এক ফুল দুই মালির কাহিনীকেই ইঙ্গিত দেয়’।

সাম্প্রতিক সময়ে এ বিষয়টি নিয়ে তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। সংবাদ মাধ্যমে এক ধরণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে দুই ধরণের বক্তব্য। পেশাগত কারণে হয়তো সাংবাদিকদের অনেক কিছু এড়িয়ে যেতে হয়, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, এখানে কোনোকিছু এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অনেক সময় দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনেক কিছুই গুজব। আবার অনেক সময় দেখা যায়, সত্যিও হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শ্রেণিভেদ নেই। সবাই ওপেন তাদের মতামত দিচ্ছেন। একদল বলছেন, রিফাতের মৃত্যুর পেছনে তার স্ত্রীই পরোক্ষভাবে দায়ি। আরেকদল বলছেন, মাদক ব্যবসার কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তবে পুলিশ বলছে, মাদক ব্যবসা নয়, ব্যক্তিগত কারণেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

পুলিশ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদ মাধ্যমের দৃষ্টিও এখন রিফাতের স্ত্রীর দিকে যেতে শুরু করেছে। যাওয়ার অনেক কারণও আছে। কেননা, রিফাতের স্ত্রী গণমাধ্যমের কাছে বলেছেন, সন্ত্রাসী নয়ন তাকে কলেজে আসা যাওয়ার সময় উত্যক্ত করতো। তিনি ভয়ে উত্যক্তের কথা কাউকে বলেননি। পরে নাকি তার চাচার নিকট বলেছেন। এখানে কতগুলো প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। সন্দেহের তীর তার দিকেই ধাবিত হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, তাকে যদি উত্যক্ত করেই থাকে নয়নসহ তার সহযোগীরা। তবে তিনি আইনের আশ্রয় নিলেন না কেনো?

তাহলে হয়তো আজকে রিফাতকে অকালে জীবন দিতে হতো না।

একজন পাঠক হিসেবে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, সন্ত্রাসী নয়ন ও রিফাত ফরাজি এমনভাবে নিহত রিফাতকে কুপিয়েছে, মনে হয়েছে রিফাতের প্রতি তার চরম ক্ষোভ ছিলো। আর ক্ষোভের বশেই সে এ কাজটি করেছে। একটা নয়, দুইটা নয়, ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকরা বলছে, নিহত রিফাতের শরীরে ৮টি কুপের চিহ্ন রয়েছে। আর এতেই বুঝা যায়, নয়ন বন্ডসহ খুনিরা নিহত রিফাতের প্রতি ক্ষুব্দ ছিলো। সন্ত্রাসীদের কুপানোর পদ্ধতি দেখে মনে হয়েছে তারা সাইকো কিলার ছিলো। না হয়, পাগলের মতো এতটা জখম করতো না।

এখন প্রশ্ন হলো, নিহত রিফাত ও সন্ত্রাসী নয়ন বন্ডসহ অন্যান্যরা একে অপরের পূর্ব পরিচিত ছিলো। তাদের মধ্যে জানাশুনা ছিলো। তবে কেনো এ হত্যাকাণ্ড?

সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, রিফাতের সঙ্গে দুই মাস আগে পুলিশ লাইন্স সড়কের আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি নামের এক মেয়ের বিয়ে হয়। বিয়ের পর নয়ন নামে এক যুবক মিন্নিকে তার প্রেমিকা দাবি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপত্তিকর পোস্ট দিতে থাকে। সেই সঙ্গে রিফাতের স্ত্রীর সঙ্গে নয়নের পরকীয়া সম্পর্ক আছে বলেও দাবি করে নয়ন। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার নয়নকে নিষেধ করে রিফাত। এরপরও শোনেনি নয়ন। এক পর্যায়ে প্রতিবাদ করে রিফাত। সেই জেরেই তাকে খুন করা হয়।

এদিকে যখন রিফাতের বিচারের দাবিতে সারাদেশে যখন উত্তাল উত্তাল ভাব, এমন অবস্থার মধ্যেই গণমাধ্যমে সামনে আসে এক ভিডিও। যা সম্প্রতি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। যা থেকে আসলে অনেক কিছুই প্রকাশ পায়!

ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, রিফাতের হত্যাকারী নয়ন বন্ডের জন্মদিনে আনন্দ উদযাপন করছেন মিন্নি শরীফ। এই ভিডিওর আগে ছবি ভাইরাল হয়েছিলো। তখন এ নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে অনেক কথা হয়। কেউ কেউ বলেন, এটা রিফাতের সাথে মিন্নির বিয়ের আগের ঘটনা। বিয়ের আগে একটা মেয়ের একটা ছেলের সাথে সম্পর্ক থাকতেই পারে। তাতে অনেকে দোষ দেখছেন না। এখানে প্রশ্ন হলো, বিয়ের আগে সম্পর্ক থাকতেই পারে, কিন্তু বিয়ের পর এ সম্পর্ককে বয়ে বেড়ানো কি দোষের নয়? হয়তোবা মিন্নি বিয়ের পরও তার পুরোনো সম্পর্ক বয়ে বেড়িয়েছেন।

বিষয়টি পরিস্কার হওয়ার আগেই সামনে এলো মিন্নি আর নয়ন বন্ডের কাবিন নামা। এতে দেখা যায়, মিন্নি নয়ন বন্ডের ২য় স্ত্রী। তাদের বিয়ের বিষয়টি কাজি নিজেও স্বীকার করেছেন গণমাধ্যমের কাছে।

নয়ন বন্ডের ও আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির বিয়ের প্রথম স্বাক্ষী রিফাত শরীফ, হত্যাকাণ্ডের দ্বিতীয় আসামি বাকিবুল হাসান রিফাত ওরফে রিফাত ফরাজি। গত বছরের ১৫ অক্টোবর আছরের নামাজের পর তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের দেনমোহর হয়েছিল ৫ লাখ টাকা। তবে দেনমোহরের কোনো নগদ পরিশোধ ছিল না।

বিয়ের কাজী মো. আনিসুর রহমান ভুইয়া বলেন, বিয়ে করার জন্য নয়ন ও মিন্নিসহ ১৫ থেকে ২০ জন লোক আসে আমার অফিসে। এসময় নয়ন ও মিন্নি তাদের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার প্রমাণস্বরূপ এসএসসি পরীক্ষার সার্টিফিকেট নিয়ে আসে। এরপর আমি মেয়ের বাবার সঙ্গে কথা জানতে চাইলে তারা বলে, মেয়ের বাবা আসবে না, আপনি মেয়ের মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর মিন্নির মা পরিচয়ে একজন আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।

তিনি আমাকে বলেন, বিয়ের বিষয়টি আমরাতো জানি। মিন্নির বাবা বিয়েটা এখন মানবে না। আপনি বিয়ে সম্পন্ন করেন। বিয়ের কিছুদিন পর ঠিকই মেনে নেবেন। এরপর আমি পাঁচ লক্ষ টাকা দেনমোহরে নয়ন ও মিন্নির বিয়ে সম্পন্ন করি। এ বিয়ের উকিল ছিলেন শাওন নামের একজন। শাওন ডিকেপি রোডের মো. জালাল আহমেদের ছেলে।

অথচ এর আগে মিন্নি বলেন, আমার বিয়ে হয়েছে একমাত্র রিফাত শরীফের সঙ্গে। এছাড়া আর কখনো কারও সঙ্গে বিয়ে হয়নি। যেহেতু বিয়েই হয়নি, ডিভোর্স হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। রিফাতই আমার স্বামী এবং এটাই সত্য। এখানে প্রশ্ন উঠে, এক মেয়ের কয়বার বিয়ে হয়েছে। আর বিয়ে যদি নাইবা হবে তবে কাবিন নামা আসলো কোথায় থেকে। তবে কি নয়ন বন্ড জালিয়াতির মাধ্যমে কাবিননামা তৈরি করেছে। না। মিন্নি বলছেন, নয়ন নাকি তাকে জোর করে কাবিন নামায় স্বাক্ষর নিয়েছিলো।

প্রশ্ন হলো, জোর করে স্বাক্ষর নিলে তিনি জোর করে বিয়ের বিষয়টি কাউকে জানিয়েছিলেন কি? জানাননি তো!

হয়তোবা তিনি না জানিয়ে নিহত রিফাতের অগোচরে নয়নকে ম্যানেজ করার পন্থা অবলম্বন করছিলেন। নয়ন হয়তো মিন্নিকে চাপ দিচ্ছিল রিফাতকে ছেড়ে তার কাছে চলে যাওয়ার। কিন্তু রিফাতের সাথে যেহেতু মিন্নির বিয়ে সামাজিকভাবে হয়েছে, সেহেতু তাকে মিন্নির পক্ষে ছাড়া সম্ভব নয়, বিধায় মিন্নি আর নয়ন মিলেই পথের কাটা রিফাতকে সরিয়ে দেয়ার প্ল্যান করেছিলেন। আমি সরাসরি মিন্নিকে দায়ি করছি না। একথাগুলো সবই অনুমান নির্ভর।

কেননা, এখন অনেক কথাই সামনে আসবে, আসতে শুরু করেছে, এ প্রশ্নগুলোর উত্তর মিন্নিকেই দিতে হবে। সুষ্ঠু বিচারের জন্য হলেও প্রশাসনের কাছে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে।

মিন্নি গণমাধ্যমের কাছে যেভাবেই বলুন না কেনো? তাতে যায় আসে না কারো। সবার একটাই চাওয়া, খুনের রহস্য উদঘাটনে প্রয়োজনে যদি মিন্নিকেও জিজ্ঞাসাবাদ করতে হয়, তবে তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক। আর অবশ্যই থানায় নিয়ে যথাযথ আইন মেনে। তবেই বেরিয়ে আসবে ইদুরের গর্তে লুকিয়ে রাখা গোপন কথাগুলো।

কেননা, মিন্নি যে তথ্য গোপন করেছেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায়, ৭ জুন নিজের ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাস থেকে। সেখানে তিনি লেখেন, ‘তোরে ভুলে যাওয়ার লাগি আমি ভালোবাসিনি সব ভেঙ্গে যাবে এভাবে ভাবতে পারিনি তুই ছাড়া কে বন্ধু হায় বুঝে আমার মোন তুই বিহনে আর এ ভুবনে আছে কে আপন?’

এখানে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে। প্রথমত কে সেই বন্ধু। যে বন্ধুকে মিন্নি ভালোবাসতেন। সে কি তবে নয়ন নাকি অন্য কেউ? এ বিষয়টিও অনুসন্ধান করে দেখা উচিত।

অনেকে হয়তো বলতে পারেন, যে আইডি থেকে এ স্ট্যাটাস দেয়া হয়েছে, এটা মিন্নির নয়। কেননা, গত দুইদিনে মিন্নির নামে অসংখ্য ফেসবুক আইডি খোলা হয়েছে। এ বিষয়টিও প্রশাসনের আইসিটি বিভাগ খতিয়ে দেখতে পারে।

কেউ কেউ বলছেন, খুনিদের একজনের সাথে রিফাতের স্ত্রী মিন্নির প্রেম ছিল। রিফাত তাকে বিয়ে করেছে বলেই তাকে খুন হতে হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, খুনের সময় স্বামীকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন মিন্নি। কিন্তু পারেননি। একজন নারী হয়ে তিনি এর চাইতে আর কতটুকু বেশিই করতে পারতেন।

আবার অনেকেই তার এই এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে নাটক আখ্যা দিতেও ছাড়ছেন না। অনেকের প্রশ্ন, নয়ন বন্ডের মতো সন্ত্রাসী এমন নির্মমভাবে রিফাতকে কুপালো, মিন্নিকেতো একটা চড় থাপ্পরও দিলো না কেনো? এখানে আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো, নয়ন কেনো মিন্নিকে আঘাত করলো না, সেটি জানতে হলেতো আগে নয়নকে গ্রেফতার হতে হবে। এর আগে জানা যাবে না।

রইলো বাকী গোপন প্রেমের কথা। প্রেম আবার কি? গতকালতো সামনে এলো প্রেম নয়, বিয়েই হয়েছিলো। এ প্রশ্নের কি সমাধান হবে? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলেও আমাদেরকে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। নয়ন ও রিফাত ফরাজি ধরা না পড়লে এসব প্রশ্নসহ অনেক প্রশ্নের উত্তরই অজানা থেকে যাবে।

বুদ্ধিজীবিদের অনেকেই রিফাতের ক্ষেত্রে প্রাক্তন প্রেম বা পরকীয়াকে খুনের কারণ হিসাবে জাস্টিফাই করতে ইচ্ছুক নন।

যে যাই বলুক, কারণ ছাড়া কোনো ঘটনা ঘটে না। কোনো একটা কারণতো অবশ্যই আছে। এ কারণ প্রেমও হতে পারে আবার ব্যক্তিগত অন্য কারণও হতে পারে।

যখন এ লেখাটি লিখছিলাম, তখন কিছুক্ষণের জন্য আরমান আলিফের গাওয়া সেই গানটা বার বার মনে পড়ছিলো, মাইয়ারে ও মাইয়ারে তুই অপরাধীরে, আমার যত্ন গড়া ভালোবাসা দে ফিরাইয়া দে। যখন শেষ করছিলাম, তখন আবার এর উল্টো পিঠের গানটা মনে পড়ছিলো, পোলারে ও পোলারে তুই অপরাধীরে।

যাইহোক, পোলা-মাইয়া যেই অপরাধী হোক না কেনো, আমাদের দেশে পুলিশ বাহিনী আছে, আশা করি, তারা আসল অপরাধী খুঁজে বের করবে। আর সামনে আসবে, লুকিয়ে থাকা, কিংবা লুকিয়ে রাখা অপরাধের কারণগুলো। সেই প্রত্যাশাই করছি।