বইগ্রামের প্রত্যেকটা বাড়ির দেয়াল বই দিয়ে ঠাসা। ছবি: সংগৃহীত

বই পড়তে ভালোবাসেন? অবসরে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে আস্ত একটা বই গোগ্রাসে গেলার মধ্যে যে আনন্দ আছে সেটা আর কোনও কিছুতেই তেমনভাবে পাওয়া যায় না। অথবা দক্ষিণের বারান্দায় বসে বই পড়তে পড়তে কখনও যদি আপনার বইপ্রেমী মনে ভাবনা জাগে যে আপনার বাড়ি বা গোটা পাড়াটাই যদি হতো একটা লাইব্রেরি, তাহলে কেমন হতো? অনেকটা ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ এর স্বপ্নের দেশে চলে যাওয়ার মতো, তাই না! বাস্তবে এমন জায়গা কিন্তু সত্যিই আছে। যেখানে একটা আস্ত গ্রামই বদলে গেছে লাইব্রেরিতে। যে দিকে দু’চোখ যাবে শুধু বই আর বই। মানুষের থেকে সেখানে বইয়ের সংখ্যা বেশি। চলুন জেনেনি এমনই এক বই-গ্রামের গল্প।

সে গ্রামটি ভারতের মহাবালেশ্বর ও পঞ্চগনির মাঝে সাতারা জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম। নাম তার ভিলার। পাহাড়ের কোল ঘেঁষা ভিলার ২০১৭ সালের আগে ছিল নিতান্তই ছাপোষা একটা হিল স্টেশন। স্ট্রবেরি চাষের জন্য ভিলারের নাম জানতেন পর্যটকেরা। তাজা স্ট্রবেরি ক্ষেত দেখতে মাঝে সাঝে ভিন রাজ্যের লোকের আনাগোনা হতো এখানে। বদলটা আসে ২০১৭ সালের পর থেকে। সরকারি উদ্যোগে ভিলার গ্রাম বদলে যায়। এখন এই বইগ্রামের কথা লোকের মুখে মুখে ফেরে। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের ভিড়ে এই গ্রাম এখন গোটা বিশ্বের কাছে পরিচিত। আগন্তুকরা বলেন বইপ্রেমীদের গ্রাম, সরকারি ভাষায় ‘দ্য ভিলেজ অব বুকস’ আর স্থানীয়দের কাছে ‘পুস্তকাঞ্চ গাব’, মারাঠি ভাষায় যার অর্থ বইয়ের গ্রাম।

এই গ্রামের সবাই বইয়ের পাগল। ছবি: সংগৃহীত

বইয়ের গ্রাম, মানে এক গ্রাম বই। বাড়ির ভিতরে, বাইরে, রাস্তা-ঘাটে, দোকান-বাজারে, গাছের নিচে যেন বইয়ের মেলা। বাড়ির দালানকে ঘিরে তৈরি হয়েছে লাইব্রেরি। পথ চলতে দু’পাশের দেয়ালে থরে থরে সাজানো বই। বাজারের বাঁক ঘোরার মুখে কাঁচের আলমারিতে, পথের ধারে ঝুপড়ি দোকানের চালার পাশে সাজানো বই। বই ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারেন না এই গ্রামের মানুষ। বই পড়াতেই আনন্দ, বইময় জীবন। বইয়ের সঙ্গেই বন্ধুত্ব, বই সেখানে অর্ধেক আকাশ। এমন বইপাগল গ্রামের বইয়ের চাহিদা মেটাতে উদ্যোগী হয়েছে খোদ রাজ্য সরকার। বইয়ের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে ভিলারের পর্যটনকেন্দ্র। একচালের ছোট বাড়ি থেকে অট্টালিকা— বই প্রীতিতে কোনও ভেদাভেদ নেই সেখানে। শীতের নরম রোদের মতোই বই প্রেমে মজে সে গ্রামের বাসিন্দারা। অন্ধ সংস্কার আর বিভেদের কালো ধোঁয়া সেখানে নাক গলাতে ভয় পায়।

ঘরের দেয়াল জুড়ে বইয়ের বাস। ছবি: সংগৃহীত

গ্রামবাসীরা বাড়ি, স্কুল, দোকান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি দফতরসহ বেছে নেওয়া হয় গ্রামের ভিতর ২৫টা জায়গা। সেখানেই তৈরি হয় ছোট ছোট গ্রন্থাগার। কোনও বাড়ির ভিতরে আবার কোনও বাইরের বাইরের দেয়ালেই সাজিয়ে দেওয়া হয় বই দিয়ে। শুরুটা হয়েছিল মারাঠি ভাষার ১৫ হাজার বই দিয়ে। বর্তমানে মারাঠি ভাষায় বইয়ের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। তা ছাড়াও বই-গ্রামে হিন্দি ও ইংরাজি সাহিত্যেরও দেখা মিলবে।

মারাঠি শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, ভিলারের মানুষজনের বইয়ের প্রতি আগ্রহ দেখে এমন একটা বইগ্রাম বানানোর পরিকল্পনা করে সরকার। পাশাপাশি, মারাঠি ভাষার বিকাশ ও পর্যটক টানাও লক্ষ্য ছিল। রাজ্য মারাঠি বিকাশ সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গ্রামের ভিতরেই তৈরি হয় ২৫ রকমের গ্রন্থাগার। কোথাও শুধুই আত্মজীবনী, আবার কোথাও সাহিত্য-দর্শনের ছড়াছড়ি, কোনও বাড়ির দেওয়ালে সাজানো রঙ বেরঙের শিশু ও কিশোর সাহিত্য, আবার কোথাও ধর্মশাস্ত্র, ইতিহাস, লোকসাহিত্য, পরিবেশ-বিজ্ঞানবিষয়ক বই।

বইয়ের পাশাপাশি ভিলারে আরও একটা জিনিস নজর কাড়ে, সেটা হলো দেয়াললিখন। সরকারের তরফেই ৭৫ জন শিল্পীকে দিয়ে গ্রামের ভিতর নানা জায়গায় তৈরি হয়েছে লেখকদের অবয়ব। মজার কার্টুন, ল্যান্ডস্কেপ, সংস্কৃতির ভাবনা-সহ নানা বিষয় নিয়ে দেওয়ালে তুলির টান দিয়েছেন শিল্পীরা। এক ঝলক দেখলে মনে হবে গ্রাম তো নয় যেন বইয়ের বাগান, তাতে নানা রঙের প্রজাপতি উড়ছে।

বইগ্রামে গাছেও বই দেখা যায়। ছবি: সংগৃহীত

বই-গ্রামের সব বই পাওয়া যাবে এক্কেবারে বিনামূল্যে। রাস্তায় রাস্তায় চেয়ার, টেবিল, রঙিন ছাতা পেতে দেওয়া হয়েছে। মনের মতো বই বেছে নিয়ে পড়তে শুরু করলেই হলো। যতক্ষণ খুশি বই পড়া যাবে, কেউ মানা করবে না। তবে পড়া হয়ে গেলে সঠিক জায়গায় বই ফেরত দিয়ে যেতে হবে পাঠকদের। এটাই নিয়ম। প্রতিটি গ্রন্থাগারের তদারকি করেন একজন। যার নাম গৌরব ধর্মাধিকারি। বললেন, ‘কম্পিউটারে প্রতিটি বইয়ের ক্যাটালগ করা আছে। বইয়ের উপর ট্যাগ দিয়ে রাখা আছে, যাতে সেগুলি হারিয়ে না যায়। অনেক দুষ্প্রাপ্য বই আছে গ্রন্থাগারগুলিতে, তাই এই বিশেষ ব্যবস্থা। বর্ষার সময় বইগুলো প্লাস্টিকে মুড়িয়ে রাখা হয় যাতে নষ্ট না হয়ে যায়। প্রতিটি বইকে যত্নে রাখার চেষ্টা করি আমরা।’

সূর্যবংশী নামে এই গ্রামের বাসিন্দা বলেন, ‘আগে স্ট্রবেরির ক্ষেত দেখতে ভিলারে আসতেন লোকজন। এখন বই পড়তে আসেন। এখানকার সেরা আকর্ষণ এইসব বইয়ের লাইব্রেরি। পঞ্চগণি থেকে কাতারে কাতারে লোক আসেন বই পড়তে। পরিবার নিয়ে আপাতত এখানেই থেকে গেছি আমি।’