সব কিছু যেন এক নিমেষেই শেষ হয়ে গেল। সেদিনের সেই বিকেল বেলার কথা ভেবে আজও বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। উজ্জল সূর্যের মতো জ্বলে ওঠা প্রদীপ যেন এক দমকা হাওয়াতে নিভে গেল।

সেদিনের বিকেলটা ছিল অন্যরকম। সেদিন রংধনুতে ছিলো না কোনো রং, কোকিলের কন্ঠে ছিলো না গান, দীপ্তমান সূর্যটা যেন অস্তমিত হয়েছিলো, ছিলো না কোন বেঁচে থাকার ইচ্ছা। কি হয়েছিলো সেই বিকেলে?

তবে বলছি সেই বিভীষিকাময় বিকেলের গল্প।

দেশ তখনও স্বাধীন হয় নাই।রোজ শকুনের থাবা পরে এই গ্রামে।শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই এক অজানা আতঙ্কে থাকে। বিশেষ করে মেয়েরা প্রতিটি মুহূর্ত ভয় ও আতঙ্কে কাটায়। এই বুঝি শকুনের থাবা পড়লো,এই ভেবে তারা কত সতর্কতাই না অবলম্বন করে।তারা প্রতীক্ষায় থাকে সকালের সোনালি সূর্যের।কিন্তু সূর্য তো সেদিনই অস্তমিত হয়ে গেছে যেদিন বিভীষণের পুনরাবৃত্তি হয়েছে এই বাংলায়।

কুলসুম। একজন কিশোরী। শৈশবের প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে উঠেছে সবেমাত্র।মনে এখন তারুণ্যের জোয়ার,যেন জীবন পেয়েছে গতিময়তা,চলেছে নতুনত্বের খোঁজে।

দেশে অরাজকতা শুরু হওয়ায় বেশ কিছুদিন ধরে স্কুলে যাওয়া বন্ধ। বন্দিজীবন আর ভালো লাগে না। কতদিন নীল আকাশ দেখে না,পুকুর ঘাটে যায় না।ঘরের কোণে থাকতে থাকতে দম বন্ধ হয়ে আসছে।

একদিন বিকেলে হঠাৎ করে শকুনের থাবা পড়লো ওদের বাড়ির ওপর। গ্রামের চেয়ারম্যান ওদেরকে (শকুন) এই বাড়ির সন্ধান দিয়েছে। শকুনদের সর্দার ওর বাবাকে বলল,’ আপগা বেটি কাহাহে? জলদি আযাও।

‘ওর বাবা যেই বলল বাড়িতে নেই, সাথে সাথে বন্দুকের গুলিতে শহীদ করে দিল তাকে। কুলসুম ঘরের ভিতর থেকে চিৎকার দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসল। ওর বাবার বুকের রক্তে ভিজে যাচ্ছিলো উঠান। কুলসুম দেখেই অজ্ঞান হয়ে গেল। তারপর যখন জ্ঞান ফিরলো তখন সে মিলিটারি ক্যাম্পে। মানব হায়েনাদের পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের শিকার একটি পুষ্প যেন অকালেই শুকিয়ে ঝরে পড়লো সেই বিকেলে।

 

-লেখক : মোকছেদুল ইসলাম লিম
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।