নওশাদ হাসান হিমু। ছবি : সংগৃহীত

পুরো নাম নওশাদ হাসান। তিনি বরিশালের উজিরপুর থানার বাবর গ্রামের সরদার আবুল হোসেনের ছেলে। আর বন্ধু-শুভানুধ্যায়ীদের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘হিমালয় হিমু’ নামে। তিনি সাভারের রানা প্লাজা ধসে দুর্ঘটনার পর অক্লান্ত উদ্ধার তৎপরতার জন্য সবার পরিচিত ছিলেন। কিন্তু অজানা কারণে তিনি আত্মহনন করলেন।

নিজের শরীরে কেরোসিন দিয়ে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যার করেছেন রানা প্লাজার এক উদ্ধার কর্মী নওশাদ হাসান হিমু (২৭) । তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

২৪ এপ্রিল বুধবার রাত ৯টার দিকে বিরুলিয়ার শ্যামপুর এলাকায় আবদুল হক মোল্লার বাড়িতে একা ভাড়া বাসায় আত্মহত্যা করেন হিমু। হিমু তার ‘হিমালয় হিমু ফেসবুক অ্যাকাউন্টে আত্মহননের আগে বেশ কয়েকটি পোস্ট দেন। তার মধ্যে তিনটি পোস্ট ছিল #কোন মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়, #আগুন সর্বগ্রাসি তাই ভালোবাসি, #ছোট কাল হৈতেই আগুন আমার অনেক পছন্দ। তবে ২২ এপ্রিল তিনি তার ফেসবুকে পোস্টে লিখেছিলেন, #প্রতিদিন মনে মনে শ’খানেক মানুষ খুন করি, #আত্মহত্যাকারী যদি কাপুরুষ হয় তাইলে যারা স্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে তারা বোকাচোদা

নওশাদ হাসান হিমুর এ পোস্টে কাজী আকাশ লিখেছিলেন, ‘আর এইটা ক্যামন কন্টেক্সট তৈরি করলা হিমু ভাই? ‘আত্মহত্যাকারী যদি কাপুরুষ হয়’ তাইলে ক্যানো ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করে থাক্লে’ বোকাচোদা হবে ক্যানো? আর কাজী আকাশের মন্তব্যে হিমু লিখেছিলেন, ‘নিয়তি মেনে নিয়ে যারা এক্ট করে তাদেরকে যে দৃষ্টিতে কাপুরুষ বলা হয় সেই দৃষ্টিতে এই কন্টেক্সট তৈরি করছি।’ তখন বোঝা যায়নি তার মনে মনে আসলে কী ঘটছিল।

নওশাদ হাসান হিমুর আত্মহননের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান ও আলোকচিত্রী তাসলিমা আখতার আজকের পত্রিকাকে বলেন, রানা প্লাজার উদ্ধারের সময়ের ট্রমা থেকে হিমু বের হতে পারেননি। ও ডিপ্রেশনে ছিলো। আর আত্মহননের দিনটিও সে বেছে নিয়েছে রানা প্লাজা ধসে পড়ার দিন।

তিনি আরও বলেন, ‘হিমু উদ্ধার কর্মী হিসেবে কাজ করার পর থেকেই ট্রমায় আক্রান্ত হন। রাতে ঘুমাতে পারতেন না। মাংস খেতে পারতেন না। গন্ধ পেতেন লাশের। তাই এটা বলতেই হবে এতো বছরেও সে ট্রমা থেকে বের হতে পারেনি। তাই হয়তো সে সেই দিনটিকেই বেছে নিয়েছে।’

সাভারের বিরুলিয়া এলাকায় আবুল হকের বাড়ির একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন নওশাদ হাসান হিমু। রানা প্লাজার উদ্ধার কর্মী নামের সংগঠনের সহ-সভাপতি খন্দকার হসিবুর রহমান লেবু বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘হিমু তাদের উদ্ধার কর্মী ছিলেন।’

স্থানীয়রা জানায়, হিমু (২৭) রানা প্লাজার উদ্ধার কর্মী ছিলেন। বিরুলিয়া এলাকায় একটি কক্ষে সে একাই ভাড়া থাকতেন। তবে রানা প্লাজার ভবন ধসের সময় সে উদ্ধার কর্মী হিসেবে কাজ করছিলেন।

তার মৃত্যুর খবরে অ্যাক্টিভিস্ট কল্লোল মোস্তফা ফেসবুকে লেখেন, ‘কীভাবে সম্ভব! কেন এ রকম করল হিমু? রানা প্লাজার উদ্ধার তৎপরতায় যে মানুষগুলোকে সত্যিকারের হিরো মনে হয়েছিলো, হিমু ছিল তার মধ্যে অগ্রগামী। এত সিরিয়াস ও ডেডিকেটেড ছিল! ধ্বংসস্তূপের যে গভীরতায় কেউ ঢুকতে সাহস করতো না, হিমু অবলীলায় সেখানে চলে যেত আহত-নিহত মানুষদের উদ্ধার করতে। হি ওয়াজ রিয়েলি মাই হিরো। …ভীষণ কষ্ট লাগছে হিমুর মতো প্রাণবন্ত একটা ছেলে গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করছে শুনে। খুব খারাপ লাগছে।’

সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আজগর আলী বলেন, ‘আমরা স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করি। যতটুকু জেনেছি হিমু কারও সঙ্গে তেমন মিশতেন না। এছাড়া তিনি তার বাবা-মায়ের সঙ্গেও থাকতেন না। আমরা তার মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছি।’

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তবে কীভাবে তার মৃত্যু হলো তা আমরা ময়নাতদন্তের পর জানা যাবে বলে জানায় থানা পুলিশ। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সম্পূর্ণ  হবে ময়নাতদন্ত।

আজকের পত্রিকা/এমএইচএস/আ.স্ব/জেবি