আমাদের দেশে প্রায় ৬৫ লাখ লোক বিভিন্ন মানুসিক অসুখে ভুগে আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছে। ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর সকল মানুষ সুখী হবার দৌড়ে ব্যস্ত। কেউ অধিক অর্থ উপার্জন, কেউ বিলাসবহুল জীবন যাপন আবার কেউ কোনো এক লাবণ্যময়ীকে পাওয়ার মধ্যে সুখ খুঁজে পায়। সুখের বিপরীত অসুখ। অসুখ শুধু শরীরের নয়, মনেরও হয়। সুখকে বুঝতে চাইলে অসুখকেও জানতে হয়। এটা পরিচিত কথা। এক কবির কাছে অসুখের কারণ জানতে চাইলে সে বলেছিলেন, ‘অর্থ নয়, সে তার সারাজীবনে একজন মানুষ উপার্জন করতে পারেনি’। অর্থাৎ কেউ কেউ মানুষ অর্জন করাটাকেই সুখের সংজ্ঞা ভাবছে। সুখগুলো পাখির ডানায় হাওয়ার জাপটায় বদলে নিচ্ছে নিজের অবস্থান। মানুষ ছুটছে সেই মরীচিকার পেছনে। অশান্তি, কলহ, দুঃখ সবকিছুকে মুক্তিবেগে উড়িয়ে দিতে চাচ্ছে সুনীল আকাশে। কেউ পারছে, তো কেউ পারছে না। মানুষ পারাটাকেই মুখ্য ভেবে নিচ্ছে যখন তখনই তারা অসুখী হওয়ার একটা প্রতিযোগিতা শুরু করে দিচ্ছে। যেমন আপনাকে ছয় ডিজিটের স্যালারি পেতেই হবে। না পেলেই আপনি অসুখী। ফলে আপনি দৌড়াচ্ছেন, আপনার জীবন দৌড়াচ্ছে ১ ডিজিট, ২ ডিজিট, ৩ ডিজিট করে… ৬ ডিজিটের দিকে। ৬ ডিজিটে গিয়ে দেখলেন সুখ নেই। তাহলে সুখ কোথায়?

যারা তথাকথিত বুদ্ধিমান তারা সুখকে আপেক্ষিক ভাবতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। সুখী মানুষগুলোর ছবি ভাবতে গেলেই দুঃখী মানুষগুলোর ছবিকেও একপাশে আলাদা করে দাঁড় করাতে হয়। আমি ব্যক্তিজীবনে অনেক মানুষকে দেখেছি, যারা দুঃখকে উদযাপন করে সুখে আছে। বিষয়টা প্রাথমিক ধাপে একটু মাথার উপর দিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এর কিছু সাধারণ ও অতি পরিচিত উদাহরণ আমাদের চারপাশেই দেখা যায়। ধরুন, আপনি একজন সাধারণ চাকরিজীবী বা বেকার কিংবা অন্য কোনো পেশার মানুষ। আপনার অবসরের সঙ্গী হচ্ছে গান। আপনি গান শুনছেন বিভিন্ন কথার, বিভিন্ন সুরের। দুঃখের গান-ই আপনাকে হয়তো বেশি টানছে। আপনাকে আপন করে নিচ্ছে। আপনি গান শুনতে শুনতে হারিয়ে যাচ্ছেন, স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ছেন কিংবা সুপ্ত দুঃখ ও বোধের জায়গাকে জাগিয়ে তুলছেন। অথচ আপনি দুঃখী নন। এই দুঃখের গানেই আপনি অতিশয় সুখী। দুঃখকে উদপযাপন করেই আপনি সুখী হচ্ছেন। বরং ওই গান ছাড়াই আপনার জীবন ঐ মুহূর্তের জন্য আবেদনহীন হয়ে পড়তে পারে। জীবনের আবেদন ফুরিয়ে গেলে মানুষের মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতা দেখা যায়। এক পরিসংখ্যান বলে, আমাদের দেশে প্রায় ৬৫ লাখ লোক বিভিন্ন মানসিক অসুখে ভুগে আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছে। অথচ আমরা কেউ-ই এই ব্যাপারে পর্যাপ্ত  সচেতন নই।

শেষপর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়, সুখী মানুষগুলো দেখতে ঠিক কী রকম? তাদের বৈশিষ্ট্যগুলো কেমন? তারা অসুখী মানুষগুলো থেকে কোন ক্ষেত্রে আলাদা? সুখ তো নিজেই নিজের ভেতর এক প্যারাডক্স হয়ে আছে। তাহলে এই প্যারাডক্স কীভাবে জয় করবে মানুষ? তা কি আদৌ সম্ভব? আপনি যদি নিজেকে অসুখী ভেবে এই মুহূর্তে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তাহলে আপনার জন্য শুধু এটুকু বলা যায় যে, সুখী হওয়া সম্ভব! পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখী মানুষ হচ্ছে শিশু এবং বোকারা। তাদের বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই আছে সুখী হবার কৌশল। শিশু এবং বোকা উভয়ই আমাদের জটিল পৃথিবীর মানুষগুলো থেকে অনেক বেশি সুখী। এর কারণ অনুসন্ধান করে পাওয়া যায় একটি শব্দ তা হচ্ছে ‘প্রবাহ’। আপনি যদি আপনার সকল অনুভূতিকে যতটা সম্ভব স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রবাহিত হতে দেন, আপনার সরল ও সৎ অনুভূতিগুলোকে বারবার মস্তিষ্ক দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ না করেন, তাহলে আপনিও শিশুদের মতো সুখী হতে পারবেন। কান্না, দুঃখ, অশান্তিকেও জীবনের অংশ ভেবে মেনে নিতে পারবেন। শিশুরা প্রাকৃতিক ভাবেই একটা নির্দিষ্ট বয়স অব্দি মানুষের দ্বারা সবচেয়ে কম প্রভাবিত থাকে। তাই তাদের অনুভূতির প্রবাহ বাধার সম্মুখিন হয় সবচেয়ে কম। ফলে তারা সহজেই সুখে থাকতে পারে। খুব ছোটো ছোটো কারণে অবলীলায় হাসতে পারে। তরুণ, মধ্যবয়স্ক কিংবা বৃদ্ধ অনেকেই প্রেম করেন। এই প্রেম করার পর দেখা যায়, তারা শিশু হয়ে গেছেন। শিশুদের মতো নিজেকে ছেড়ে দিয়েছেন নিজ নিজ প্রিয়জনের কাছে। এই প্রবাহতে তারা সুখী হচ্ছেন। তাদের ভেতরের দৈন্দন্দিন জটিলতা কমে যাচ্ছে। প্রেম মূলত মানুষ শিশু হয়ে বাঁচার জন্যেই করে। যখনই এটাকে ম্যাচুরিটি, বিবেকবোধ, দায়িত্ব এসব শব্দ দ্বারা আঘাত করা হয়, প্রেম তার সহজাত শিশুসুলভ পরিবেশ হারিয়ে জটিলতার সম্মুখিন হতে থাকে।

সবশেষে সুখের প্যারাডক্সকে এভাবে ভাবা যায়, সুখী মানুষগুলো দেখতে দুঃখী মানুষের মতো আবার দুঃখী মানুষগুলোর চেহারাও সুখী মানুষের মতো হতে পারে। অথচ দেখতে যেমনই হোক, তারা স্ব-স্ব অবস্থানে সুখী হয়ে বাঁচতে পারে। শুধু প্রবাহকে মেনে নিতে হবে। হাসি কিংবা কান্না কোনোটাকেই বাধা দেয়া যাবে না।