সাভারের মৃৎশিল্পী।

সাভারে কালের বিবর্তনের হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার বৈশাখী উৎসবের প্রধান আকর্ষণ গুড়-চিনি ও পানি দিয়ে তৈরী মুকুট, বাতাসা, হাতি-ঘোড়াসহ নানা মিষ্টি জাতীয় খাদ্যদ্রব্য। পুরো সাভার উপজেলার আশুলিয়ার একটি মাত্র গ্রামে তৈরী হয় এসব খাদ্য সমগ্রী। তবে সারাবছর এর চাহিদা না থাকলেও বিভিন্ন বৈশাখী মেলার প্রধান আকর্ষন থাকে এসব খাদ্য। শুধু ঐতিহ্য ধরে রাখতে এসব খাদ্য সামগ্রী তৈরী করা হলেও আজ তা বিলুপ্তির পথে।

সরেজমিনে সাভার উপজেলার শিমুলিয়া ইউপি’র গণকপাড়া এলাকায় গিয়ে জানা যায়, এ গ্রামের ১০/১২টি পরিবার বৈশাখ আসলেই অনেকটা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কারণ দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে পাইকাররা এসে এখান থেকে গুর-চিনি ও পানি দিয়ে তৈরী বাতাসা, হাতি-ঘোড়া ও মকুট কিে নিয়ে যান। সেই সাথে অনেকে আবার বৈশাখী বিভিন্ন মেলায় এসব খাদ্য পন্য নিজেরাই বিক্রি করে থাকেন।

কথা হয় এ গ্রামের বাতাসা কারিগর নগেন চন্দ্র সাহা। তিনি জানান, ‘বংশ পরম্পরায় এবং বাঙ্গালীর ঐতিহ্য ধরে রাখতে ও পেশা টিকিয়ে রাখতে তিনি সারা বছরই বাতাসা তৈরী করে থাকেন। বাতাসা তৈরীতে তিনি গুর-চিনি ও শুধু পানি ব্যবহার করে থাকেন। প্রথমে গুর ও চিনি পানির সাথে মিশিয়ে সেগুলো একটি সিলভারের পাত্রে নিয়ে আগুনে জাল (তাপ) দিতে থাকেন। একপর্যায়ে সেগুলো ‘পাক’ (প্রস্তুত) আসলে টিনের একটি পাত্রে ঢালতে থাকেন। কিছুক্ষণ পরেই হয়ে যায় বাতাসা।’

তিনি জানান, ‘বাতাসাগুলো তৈরী করার পর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে, যেমন- ঢাকা, মানিকগঞ্জ, সাভার, ধামরাই, কালিয়াকৈর, গাজীপুর, মির্জাপুর, সাটুরিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকার এসে এগুলো কিনে নিয়ে যান। প্রতি কেজি বাতাসা পাইকারী ৭০/৮০টাকা দরে বিক্রি করা হয় এবং খুচরা বিক্রি করা হয় ১০০টাকা কেজি দরে। তার সাথে এ কাজে তার স্ত্রী গীতা রাণী সাহাও সহযোগীতা করে থাকেন।’

কথা হয় একই এলাকার আরেক কারিগর রঞ্জিত সাহার সাথে। তিনি জানান, ‘চৈত্রের শেষের দিকে তিনি এ কাজের সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। তিনি চিনি, গুর এবং পানি দিয়ে কাঠের ছাচে দিয়ে তৈরী করেন হাতি, ঘোড়া, মুকুট এবং বাতাসা। আবু তালেব নামের তার একজন কর্মচারী রয়েছে। তিনি উৎপাদনের উপর মজুরী পান। মিষ্টি হাতি, ঘোড়া ও মুকুট তৈরী করতে তিনি প্রথমে চিনি ও পানি এক সাথে চুলায় একটি পাত্রে দিয়ে তাপ (জাল) দিতে থাকেন। পরে সেগুলো নামিয়ে কাঠের ছাচে ঢেলে দেন এবং কিছুক্ষণ পর সেগুলো নামিয়ে ফেলেন। এখানেও বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকার এসে এগুলো কিনে নিয়ে যান। বৈশাখ আসলেই এগুলোর চাহিদা বেশী থাকলেও অন্যান্য সময়ে এগুলো চলে না। তবে গ্রাম বাংলার বিভিন্ন মেলায় এগুলো শোভা পায়।

রঞ্জিত চন্দ্র সাহার কারখানার কারিগর আবু তালেব জানান, ‘তিনি ৩/৪ বছর ধরে গণকপাড়া এলাকায় কারিগর হিসেবে কাজ করেন। তবে এ পেশার সাথে তিনি ১৭/১৮ বছর ধরে জড়িত। এর আগে রাজধানীর যাত্রাবাড়ি এলাকায় একটি কারখানায় কাজ করতেন।

এখন এলাকাতেই কাজ করছেন। তিনি উৎপাদনের উপর ভিত্তি করে মজুরী পান। এক বস্তায় ৫০ কেজি বাতাসা ধরে। এক বস্তা বাতাসা তৈরী করলে তিনি ৩০০ টাকা মজুরী পান। দিনে তিনি দুই বস্তার মত বাতাসা তৈরী করে থাকেন।

তিনি জানান, এক বস্তা বাতাসা তৈরী করতে ৮/১০ কেজি আখের গুর, চিনি ৩০কেজি এবং সাথে পানিতো লাগবেই। এক মণ বাতাসা তৈরীতে ৭০০ টাকার মত খরচ হয় এবং বিক্রি হয় ৩হাজার টাকা।

কথা হয় ওই এলাকার নিমকি তৈরীর কারিগর জীবন চন্দ্র দাসের সাথে। তিনি জানান, ‘২৫ বছর ধরে তিনি নিমকি তৈরী এবং সেগুলো বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করে থাকেন। তার সাথে ছেলে রাম প্রসাদ দাস তাকে সাহায্য করে থাকে। দিনে তিনি ১৫ কেজি নিমকি তৈরী করেন।

নিমকির চাহিদা শুধু বৈশাখ মাসেই নয়। বৈশাখ ছাড়াও তিনি সারা বছরই এ কাজ করে থাকেন। নিমকি তৈরীতে তিনি ময়দা, তৈল এবং কালোজিরা ব্যবহার করে থাকেন। তিনি পাইকারী বিক্রি করেন না। বিভিন্ন হাট-বাজার ও মেলায় (গোহাইলবাড়ি, বেনুপুর, কালামপুর, ধামসোনা মেলা, বুড়ির মেলা, পাগলাবাড়ি মেলাসহ) বিভিন্ন স্তানে এগুলো খুচরা বিক্রি করে থাকেন।’

শিমুলিয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি রবিউল ইসলাম রবি জানান, ‘গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য বৈশাখী মেলায় এসব খাদ্যসমাগ্রী পাওয়া যায়। ছোটদের থেকে শুরু করে সব বয়সের কাছেই এগুলো প্রিয়। কালের বিবর্তনে এগুলো এখন বিলুপ্তির পথে। তবে সাভারের শিমুলিয়া ইউপি’র গণকপাড়ার সাহা পরিবারের লোকজন এ পেশা ধরে রেখেছে। আমি তাদের সাধুবাদ জানাই।’

ঢাকা কলেজ এর রসায়ন বিভাগের প্রভাষক আসলাম হোসেন জানান, গ্রাম বাংলার আবহমান ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে শিমুলিয়ার একটি ঐতিহ্য হচ্ছে বৈশাখী মেলার খেলনা, মুকুট ও হাতি-ঘোড়া। কিন্তু আধুনিকতার ছোয়ায় এ ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করলে এগুলো হয়তো অদূর ভবিষ্যতে হারিয়েই যাবে।’

তুহিন আহামেদ, সাভার