মাহমুদ উল্লাহ্‌
বিজনেস করেসপন্ডেন্ট

ফুয়াদ আরেফিন, হেড অব কমার্শিয়াল, দারাজ। ছবি : নাজমুল হাসান

দারাজ ই কমার্সে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্লাটফর্ম। নিজেদের মেধা আর যোগ্যতায় মানুষের আস্থা অর্জন করে নিয়েছে ইতিমধ্যেই। সম্প্রতি কথা হয় এর হেড অব কমার্শিয়াল ফুয়াদ আরেফিন এর সঙ্গে। নিচে তার সঙ্গে কথোপকথনের চুম্বক অংশগুলো পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো।

আজকের পত্রিকা: দারাজের প্রথম দিককার গল্পগুলো কেমন ছিল?

ফুয়াদ: দারাজ শুরু হয় ২০১৫ সালে। আমি যোগ দেই ২০১৫ এর শেষের দিকে। তখন দিনে ৩০/৪০টি অর্ডার আসতো দারাজে। বনানী বাজরের পাশে ছোট একটি স্পেস নিয়ে দারাজ প্রথম শুরু হয়। তখন কর্মী সংখ্যা ছিল মাত্র ৫০/৬০জন। তখন ইকমার্স সেক্টরটাও ডেভেল্পমেন্ট স্টেজে ছিল। এখন যেমন ই-কমার্স বাংলাদেশের মার্কেট অনেক বেশি ম্যাচিউরড। মানুষ এখন অনলাইনে কেনাকাটা করছে।

তখন আমরা অনেক বেশি ফ্যাশন বেজড ফোকাসে ছিলাম। এরপর ২০১৭ তে বিভিন্ন এক্সসোরিজ, মোবাইল ফোন, ইলেক্ট্রনিকস থেকে শুরু করে চাল, ডাল তেল লবন সবই বিক্রি করছি। গত মাসে আমরা প্রথম গাড়ি লঞ্চ করি দারাজে। প্রথম মাস হিসেবেও ১৩টি গাড়ি আমরা বিক্রি করেছি। এটা দারাজের জন্য অবশ্যই অনেক বড় একটি সাফল্য।

আজকের পত্রিকা: কি ধরনের স্ট্রাগলের মধ্য দিয়ে দারাজকে এ পর্যায়ে আসতে হয়েছে?

ফুয়াদ: দারাজকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসতে মার্কেটিংয়ে অনেক শ্রম ও মেধা খরচ করতে হয়েছে আমাদেরকে। বিভিন্ন কোম্পানিকে গিয়ে গিয়ে বুঝাতে হয়েছে দারাজ কি, আমরা নিজেরাই একটি কোম্পানির মার্কেটিং করে প্রোডাক্ট সেল করে সেই কোম্পানির প্রোডাক্টের ব্র্যান্ডিং করছি। আমরা ভাগ্যবান সব বড় বড় কোম্পানিই আমাদের সঙ্গে এসেছে। তাদেরকে আমরা বুঝাতে সক্ষম হয়েছি যে তাদের কোন খরচ হচ্ছে না, আমরা আমাদের খরচেই তাদের প্রোডাক্ট সেল করছি। এভাবে তাদের ও গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করেছি।

প্রথম থেকেই আমরা শুধু মাত্র সেলেই জোর দেইনি, মার্কেটটাকে ডেভেলপ করার কাজও দারাজ করেছে, আমাদের সব সময়ই চেষ্টা ছিল যে, কিভাবে মানুষের আস্থা অর্জন করা যায়, মানুষকে অনলাইনে কেনাকাটায় উদ্বুদ্ধ করা যায়, যার ফল এখন অনেক ই-কমার্স ব্যবসায়ীরাই পাচ্ছে।

আজকের পত্রিকা: মানুষকে ই-কমার্সের সঙ্গে সংযোগ ঘটানোর জন্য আপনারা কি ধরনের পদক্ষেপগুলো নিয়েছেন?

ফুয়াদ: লিস্টিং বাড়ানোর টার্গেট থাকে, সেল বাড়ানোর টার্গেট থাকে তার সঙ্গে আমাদের এই চেষ্টাও ছিল কিভাবে মানুষকে আরো বেশি ই কমার্সের সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়, মানুষজন ইকর্মাসকে চিনবে, আস্থা করবে, কেনাকাটা করবে। মানুষকে এনগেজড করার জন্য আমরা সব সময়ই কিছুনা কিছু অফার রাখি, ফ্রি উপহার রাখি, ডিসকাউন্ট, ফ্রি শিপমেন্ট থাকে, ভাউচার থাকে। এসব দেয়ার কারণ হচ্ছে মানুষ যেন ইকর্মাসের উপর থেকে তাদের আস্থা হারিয়ে না ফেলে সে চেষ্টা সময় থাকে।

আজকের পত্রিকা: দারাজের মালিক কে ছিলেন? এখন তো দারাজকে কিনে নিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে  বড় ই-কর্মাস প্রতিষ্ঠান আলীবাবা?

ফুয়াদ: ২০১৮ ছিল দারাজের জন্য একটি মাইলস্টোন, কারণ এ সময় দারাজ বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আলীবাবা ই-কামর্সের সঙ্গে একীভূত হয়। দারাজ মূলত রকেট ইন্টারনেট নামের জার্মান একটি কোম্পানীর প্রতিষ্ঠান। তারা মূলত ই-কমার্স ভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গেই যুক্ত। ২০১৫ সালে পাঁচটি দেশে রকেট ইন্টারনেট দারাজ প্রতিষ্ঠা করে। মূলত এমাজন যেমন ইন্ডয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের ব্যবসাকে প্রসারিত করেছে, কিন্তু এই দেশে বা পাকিস্তানে এমাজনডটকমের মতো কোন প্লাটফর্ম নেই, তাই ফাকা মাঠে গোল দিতেই এই দেশে দারাজের প্রতিষ্ঠা হয়। এখন দারাজ অনেক ভাল অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশে। দারাজ মূলত এমন একটি প্লাটফর্ম যেখানে কাস্টোমাররা সেলারদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করতে পারেন অনলাইন অর্ডার এর মাধ্যমে।

ফুয়াদ আরেফিন, হেড অব কমার্শিয়াল, দারাজ। ছবি : নাজমুল হাসান

আজকের পত্রিকা: আলীবাবার সঙ্গে যোগ হয়ে দারাজ কিভাবে শুরু করে সেই গল্পটা জানতে চাই

ফুয়াদ: আলীবাবার বেশ কয়েকটি টিম ঢাকায় এসে কাজ করেছে। অ্যাপ ডেভেলপ করেছে। বিভিন্ন ধরেনর প্রশিক্ষণ দিয়েছে। অনেক রাত এক সঙ্গে কাজ করে কাটিয়েছি। এভাবেই আসলে দারাজকে ডেভেলপ করেছে আলীবাবা।

আজকের পত্রিকা: আলীবাবার সঙ্গে একিভূত হওয়ার পর কি ধরণের সুবিধা পাচ্ছে দারাজ?

ফুয়াদ: আলী বাবার কাছ থেকে প্রতিনিয়ত আমরা ডিরেকশন পাচ্ছি। তাদের অনেক বেশি এক্সপেরিয়েন্স রয়েছে এই ই কমার্স ব্যবসার। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের সঙ্গে শেয়ার করছেন। বিভিন্ন টুলস পেয়েছি, দারাজ অ্যাপ আপগ্রেট করা হয়েছে, এখন আমাদের সাইটে প্রায় ২০ লাখ প্রোডাক্ট রয়েছে। সেইসব প্রোডাক্ট থেকে ফেসবুকে কাস্টোমাররা যেন তাদের চাহিদাসম্পন্ন নিজস্ব প্রোডাক্টটি খুজে পায় সে ব্যবস্থাই আলীবাবা করেছে। ইফিশিয়েন্ট আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্টস এর সাহায্যে প্রোডাক্টটি আপনার কাছে ফেসবুকে অটো ডিসপ্লে করবে, বিষয়টি খুব সহজ নয়। এগুলো আলীবাবার এক্সপার্টিজের কারণে সম্ভব হয়েছে। আলীবাবা বিশ্বের এক নম্বর একটি অনলাইন কোম্পানী, ইকমার্স ব্যবসায় তারা অনেক বেশি এক্সপার্ট। তাদের সেই অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য অবশ্যই ইফেক্টিভ।

আজকের পত্রিকা: আপনাদের ডেলিভারি সিস্টেম কি বা কেমন?

ফুয়াদ: ইতিমধ্যে আমরা দারাজ এক্সপ্রেস (ডেক্স) নামে একটি লজেস্টিক পার্টনার গ্রো করেছি। যারা সারা বাংলাদেশে আমাদের পণ্যকে ডেলিভারি করে। আগে থার্ড পার্টি কুরিয়ারের প্রতি আমরা ডিপেন্ড ছিলাম। তখন বিভিণ্ন সমস্যার মুথে আমাদেরকে পড়তে হতো। এখন দারাজ সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি ডেলিভারি সিস্টেম তৈরি করেছে। ঢাকায় একটি ওয়্যার হাউজ ও দুটি সর্টিং সেন্টার রয়েছে। সম্প্রতি আমরা প্রায় ৪৫ হাজার স্কয়ার ফিট জায়গায় একটি সর্টিং সেন্টার ওপেন করেছি। আর পুরো দেশে ৩২টি জেলায় আমাদের নিজস্ব ডেলিভারি ডেক্স হাব রয়েছে। কত কম সময়ে পণ্য ডেলিভারি করা যায় আমরা সেই চেষ্টাই করি সর্বক্ষণ। এই জন্যই জেলায় জেলায় এই হাব তৈরি করা। এখন ৯০ শতাংশের বেশি পণ্য দারাজ ডেলিভারি করে থাকে এই দারাজ এক্সপ্রেস থেকে। আগামী ২০২০ সালের মধ্যে দেশের ৬৪ জেলায় দারাজ ডেলিভারি হাব কুলবে।

আজকের পত্রিকা: আপনাদের প্রতিদিন সেল কেমন?

ফুয়াদ: এখন আমাদের প্রতিদিন ৭ থেকে ১০ হাজার অর্ডার ডেলিভারি দিতে হয়। যা বাংলাদেশের টোটাল ই কমার্সের ৭০ শতাংশ ব্যবসা। আমাদের বিভিন্ন ব্র্যান্ড মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার সেলার রয়েছে। যারা তাদের প্রোডাক্ট দিয়ে আমাদের সহযোগীতা করছে। বর্তমানে দারাজের ফেসবুক ফলোয়ার ১ কোটি। ফেসবুকে বিভিন্ন টিউটোরিয়াল রয়েছে আমাদের। যেখানে দেখানো হয় একজন সেলার বা একজন কাস্টোমার কি ধরনের সেবা, কিভাবে পেতে পারেন, কি রানিং অফার চলছে এগুলো। প্রতিদিন দারাজের পেজে প্রায় ২ লাখ নতুন ভিজিটররা ভিজিট করেন।

আজকের পত্রিকা: আপনাদের ১১/১১ ক্যাম্পেইন নিয়ে কিছু বলুন?

ফুয়াদ: দারাজের আজকের উঠে আসার পেছনে সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে আলীবাবার ১১/১১ ক্যাম্পেইন। গত বছরের সেই একদিনের ক্যাম্পেইনে ১ লাখ ৪০ হাজার অর্ডার পাই আমরা যা আমাদের দ্রুত উপরে উঠতে সাহায্য করেছে। সেই ক্যাম্পেইনে আমরা বিভিন্ন ধরনের অফার, ছাড় ও অনেক বেশি পরিমান ডিসকাউন্ট দিয়েছিলাম। যা মানুষজনের কাছে আমাদেরকে দ্রুত পৌছে দেয়।

ই কমার্স ব্যবসার অনেক ধরনের কাজ থাকে, মার্কেট রিসার্স থেকে শুরু করে, ব্র্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ, সেলারদের সঙ্গে যোগাযোগ, কাস্টোর সেটিস্ফাই থেকে শুরু করে মার্কেট ডেভেলাপ করা। মানুষজনের আস্থা তৈরি করা।

আজকের পত্রিকা: অন্যান্য ই কমার্স ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে দারাজের মূল পার্থক্য কোথায়?

ফুয়াদ: দারাজে একটি ডিজিটাল ক্যাটাগরি আছে, যেখানে মোবাইল ফ্লেক্সি থেকে শুরু করে বাস প্লেনের টিকেটও আপনি পাবেন। সেখানে বিভিন্ন প্যাকেজ পাওয়া যায় সেই ক্যাটাগরিতে আমরা গত মাসে প্রথম গাড়ি লউঞ্চ করি।এবং ভালো সাড়া পাই। প্রায় ১৩টি গাড়ি প্রথম মাসেই আমরা সেল করি। মা দিবসে নন্দিনী ক্যাম্পেইন করছি যেখানে নারীদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা থাকবে, নারী উদ্যোক্তাদের জন্যও সেখানে সুযোগ সুবিধা দিচ্ছি আমরা।

আজকের পত্রিকা: ই-কমার্সের বিজনেস প্রসেস সম্পর্কে কিছু বলুন? এই ব্যবসায় কি ধরনের সমস্যা আপনাদেরকে ফেস করতে হয়?

ফুয়াদ: বিভিন্ন পণ্য অর্ডার আসলে সেই কোম্পানির সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করি, তারা পণ্যটি আমাদের এখানে পাঠালে সেটির কোয়ালিটি ঠিক আছে কিনা তা যাচাই করে দারাজ, এরপর দারাজের প্যাকেটে সেটিকে ডেলিভারি করা হয়। একটি পণ্য গ্রাহকদের কাছে পৌছাতে দারাজ সময় নেয় ৩ থেকে ৫ দিনেরও কম। আরো কম সময়ে কিভাবে পাঠানো যায় সেসব নিয়ে সচেষ্ট থাকি আমরা। কিন্তু পণ্যটি যদি কোন কোম্পানী আমাদের কাছে পাঠাতে দেরি করে, সেক্ষেত্রে সময় আরো বেশি লাগে। এইসব জায়গাগুলো নিয়ে আমরা সবচেয়ে বেশি কাজ করছি।

আজকের পত্রিকা: ই-কমার্সের ভবিষ্যত কেমন?

ফুয়াদ: পুরো দেশের এখনও ৯০ শতাংশ মানুষ অনলাইন কেনাকাটার বাইরে রয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মানুষজন বেশি কেনাকাটর সঙ্গে যুক্ত। এই দুই বিভাগের বাইরের মানুষজন ইন্টারনেট ও মোবাইল ব্যবহার করে। তাদেরকেও অনলাইনে কেনাকাটায় অভ্যস্ত করানোর সুযোগ রয়েছে। তাই বলবো দেশে এই ব্যাবসার এখনও অনেক ক্ষেত্র ওপেন রয়েছে, আমরা এর কিছুই ইখনেও পূরণ করতে পারিনি। যেখানে নতুনরা এসে কাজ করতে পারে।

আজকের পত্রিকা: আপনার মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

ফুয়াদ: আপনাকে ও আজকের পত্রিকাকেও অনেক ধন্যবাদ।

আজকের পত্রিকা/এমইউ/ এমএইচএস