সাকিব আল হাসান ও লেখক পবিত্র কুন্ডু। ছবি: সংগৃহীত

কোনো আচরণগত কারণে তার ওপর খুব রাগ হয়েছিল। সে জন্যই হয়তো আমাদের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন অনুজ সাংবাদিকটি আমার কাছে অকপটে বলে ফেলেছিল, ওকে ধরার অনেক চেষ্টা করি। কিন্তু পারি না, এত ভালো খেলে আর এত ধারাবাহিক, ওর যেন পড়তি ফর্ম বলে কিছু নেই! ওকে নিয়ে একটু সমালোচনা করে একটি লেখার পরেরটিতেই হয়তো প্রশংসার ফুল ঝরে পড়তে চায় কলম থেকে।

ওকে ‘ধরা’র অনেক চেষ্টা করেছে আমাদের মহামহিম ক্রিকেট বোর্ডও । ধরেছে। ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, জরিমানা করেছে। কিন্তু সাকিব আল হাসান সাকিব আল হাসানই রয়ে গেছে। ক্রিকেটই তার উদ্ধার, ক্রিকেটই তার অবলম্বন। ক্রিকেটেই শ্বাস, ক্রিকেটেই আশ। বলব না যে সে ক্রিকেটেই জবাব দেয়। জবাব দেওয়ার মধ্যে কেমন যেন হিংসা হিংসা গন্ধ ছড়িয়ে থাকে। সে আসলে ক্রিকেটেই নিজের অস্তিত্বকে গভীরভাবে চিনে নিতে চায়। সে ফিরে আসে, ঘুরে দাঁড়ায় ওই ক্রিকেটেই, ব্যাট হাতে কিংবা হাতে বল ঘুরিয়ে। একবার, বারবার। এই যে কাল যেমন ডাবলিনের একটি ছোট ক্রিকেট মাঠে দেখা গেল। বিশ্বকাপ যাত্রাকালীন দলীয় ফটো সেশনে যে কোনো কারণেই তার অনুপস্থিতি কি সমালোচনার হুলই না ফোটাল সাকিবের গায়ে। তার ওপর স্ত্রী শিশিরের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল। দেশের ক্রিকেটাকাশে ‘বিচার চাই ,বিচার চাই’ ধ্বনি ছড়িয়ে পড়তে দেখলাম। আমি প্রমাদ গুনেছিলাম, এই সমালোচনার বিষ শুষে নিয়ে সাকিব কি ক্রিকেটের বিশ্বসভায় শক্ত পায়ে দাঁড়াতে পারবে! আবার অতীতের মতো আমার এমন বিশ্বাসও হচ্ছিল যে, নিজের জাতটা সে ডোবাবে না।

আয়ারল্যান্ড ‘এ’ দলের সঙ্গে খেলতে গিয়ে সঙ্গীরা যখন আইরিশ বসন্তে গাছ–গাছালির ছিন্ন পাতার মতো উড়ে গেল, কিংবা উড়ে যাওয়ার সাধ হলো তাদের, একজন চলতি হাওয়ার পন্থী হলো না, দাঁড়ালো গিয়ে উল্টো দিকে। সেই একজন সাকিব। আগে বোলিংয়ে সে ভালো করল, ১০ ওভারে ৩০ রান দিয়ে ১ উইকেট। পরে ব্যাট হাতে ৪৩ বলে ৫৪ রান। মোটামুটি কথা, জয়ের আকাঙ্ক্ষাটা সবচেয়ে গভীরভাবে ফুটতে চেয়েছিল তার মধ্যেই। ম্যাচ জিতিয়ে ফেরার সামর্থ্য প্রশ্নাতীত, সেটি সে করে আসতে পারলে হাজার মাইল দূরের নির্জন কক্ষে বসে গভীর রাতে হাততালি দিতাম আমি। সেটি হলো না। জয় সব সময়ই এক ধরনের টনিক, কিন্তু সফর শুরু হলো পরাজয়ে। না হোক, এটি তো একটি প্রস্তুতি ম্যাচই, নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়ার, বাজিয়ে দেখার উপলক্ষ। আশা করি ত্রিদেশীয় সিরিজের আসল লড়াইয়েই ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ। আর এখান থেকেই রসদ সঞ্চয় করে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপে উঠবে ঝলসে । সেখানেও হয়তো দেখবেন সবার আগে থাকা নামটি সাকিব।

এই সাকিবকে আপনি ভালো বাসতে পারেন, ঘৃণা করতে পারেন। সেটি নিতান্তই আপনার বিচার। ভালোবাসায় নিশ্চিতই তার মুখে কিংবা মনে প্রশান্তির হাওয়া বয়। সেটি ফুটে ওঠে মৃদু হাসিতে। আর ঘৃণায়? বলে দিতে হবে না, হৃদয়ে ঘটায় রক্তক্ষরণ। তবে চিরকালের মৃদুভাষী ছেলেটি বুঝতে দেয় না কিছুই। সবকিছু এত সহজভাবে নিতে জানে! মাঝে মাঝে ভাবি, যে লোকালয়ে তার জন্ম, সেখানকার আলো বাতাস সত্যিই কি এমন অভ্রভেদী দৃঢ়তার বীজ বুনতে পারে মানুষের মধ্যে! হবে হয়তো। তবে এটি বুঝি, সাকিব অন্যরকমের এক জাতক।

মিছিলের একজন নয়। সমালোচনার বিষে নীল হতে হতেই প্রশংসার লালিমা ফোটাতে জানে সে। এই বিশ্বকাপ ক্রিকেটেই হয়তো প্রমাণ দেবে। সেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আইপিএলে তাকে খেলতে দেওয়া হয় না, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে খেলে নিজেকে ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ সে পায় না। কোথায় কী প্র্যাকটিস করল, সেই হদিশ আমরা রাখি না। গড্ডলিকা প্রবাহে ভেসে বলে ফেলি, ওর দিন শেষ। বলে ফেলি, অহংকারের পতন হোক। আসলে অহংকারী সে নয়, অন্যরকম। খুব কাছে গিয়ে দেখেছি, ও নিজের মধ্যেই থাকতে ভালোবাসে। সেই একান্ত জগতে আছে শুধু ক্রিকেটের সাধনা। এই সাকিবকে আপনি ভালো না বাসুন, বলতে নিশ্চয়ই আপনার দ্বিধা নেই, সাকিব যেমন ক্রিকেটে বাঁচে, সাকিবেও আশা নিয়ে বেঁচে থাকে অমাদের ক্রিকেট।

লেখক
পবিত্র কুন্ডু, ক্রীড়া সাংবাদিক

আজকের পত্রিকা/এমআরএস/জেবি