প্রাইভেট বা বেসরকারি চাকরির চেয়ে সরকারি চাকরির গুরুত্ব দিনদিন কেন বাড়ছে?

সরকারি চাকরি না হলে কি কেউ না খেয়ে থাকে! বেসরকারি চাকরি কি চাকরি না!  একজন অভিভাবক কেন সরকারি চাকরির প্রতি এত আগ্রহ দেখান তার কারণ কি?

টাকাটাই এখানে মূখ্য নয়।

অনেকে মনে করেন সরকারি চাকরিতে নিরাপত্তা বেশি, চাইলেই কেউ আপনাকে চাকরি থেকে বের করে দিতে পারেন না । সুযোগ সুবিধাও আগের চেয়ে বেশি দেয়া হচ্ছে তাই।

সরকারি চাকরির বাহিরে আরেকটি বড় ভরসা হলো বেসরকারি খাত। সরকারিতে প্রতিযোগিতা বেশি এটা সবার জানা। কিন্তু বর্তমানে বিকাশমান অর্থনীতি ও শিল্পখাতে কারিগরি ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন লোকের চাহিদা বেশি।

এক্ষেত্রে সাধারণ ও প্রচলিত শিক্ষায় শিক্ষিতদের চাহিদা কম থাকায় তাদের বিশাল একটি অংশ বেসরকারিখাতে চাকরিতে প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে, বেকারত্বের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে।

যদিও বিগত কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। কৃষি, শিল্পে লেগেছে আধুনিকতা ও প্রযুক্তির ছোঁয়া।

গার্মেন্ট, ওষুধ শিল্পসহ বেসরকারি নানা ক্ষেত্রে লোকবলের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু বেসরকারি খাতে যে পরিমাণ কারিগরি ও প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন লোকবল প্রয়োজন সেই অনুপাতের শিক্ষার্থী দেশে নেই। সঙ্গত কারণেই সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতদের দিয়ে সে অভাব পূরণ করা যাচ্ছে না।

এক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষাকে আরো বেশি গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি অভিভাবককেও বেসরকারি খাতের গুরত্ব বুঝতে হবে। বদলাতে হবে আগের ধ্যান ধারণা। বুঝতে হবে সরকারি চাকরিও চাকরি আর বেসরকারি চাকরিও চাকরি।

আর সরকারকে বুঝতে হবে সরকারি চাকরির মূল্য বাড়াতে গিয়ে বেসরকারি চাকরিকে যেন কেউ খাটো করে না দেখে। এক্ষত্রে বেসরকারি চাকরিকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পরিকল্পনা নিতে হবে।

এক্ষত্রে বেসরকারি চাকরির মালিকরা যাতে হুট করে ছাটাই না করতে পারেন, চাকরি যেন দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং নির্দিষ্ট সময় পরে বেসরকারি চাকরিজীবিরা যাতে সরকারি চাকরির মত এককালীন কিছু টাকা পান এবং সরকারি চাকুরেদের মত বেসরকারি চাকরিজীবির স্ত্রীর জন্য মাসে মাসে ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে।

বিনিময়ে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের মালিকদের তালিকা করে তাদের প্রধানদের নিয়ে বসতে হবে। কিভাবে সরকারি চাকরি থেকে আগ্রহ কমানো যায় ভাবতে হবে।

অন্যথায় দেশের বেকারত্ব দূর হবে না এবং বেসরকারি খাত থেকে বেকার এবং বেকার ছেলে মেয়েদের আগ্রহ কমে যাবে।

আজকাল বেসরকারি চাকরিও অনেকটা সরকারি চাকরির মতো সোনার হরিণ হয়ে যাচ্ছে। উচ্চ শিক্ষার পরও অনেকে পছন্দ অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছে না।

যতদিন কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকবে আর মানুষ সরকারি চাকরির উপর থেকে যতক্ষণ না নির্ভরতা কমাবে ততদিন বেকার সমস্যা থাকবেই।

বেকারত্বের জন্য কর্মসংস্থান যেমন একটি সমস্যা, তেমনি মানসম্মত কর্মস্থানের অভাবও আরেকটি সমস্যা।

প্রবৃদ্ধির কৌশলে যেভাবে আমরা এগুচ্ছি, সেখানে কর্মসংস্থান কম তৈরি হচ্ছে। আর বেকাররা যে ধরনের কর্মসংস্থান পেতে চায়, সে ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।

সরকারি চাকরি এক ধরনের নিশ্চয়তার বিষয় বলে এর প্রতি আকাঙ্ক্ষা বেড়েছে। যদি ব্যক্তি ও বেসরকারিখাতে অনেক কর্মসংস্থান থাকতো এবং এক ধরনের নিশ্চয়তার বিষয় থাকতো তাহলে সরকারি চাকরির প্রতি এত নজর থাকতো না মানুষের।

সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ালে নাকি পেনশনজনিত অনেক জটিলতা রয়েছে। আসলেই কি তাই? সবকিছু জেনে, বুঝে এবং দেখেও কী কারণে কোনো সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো হলোনা জানা নেই। ৩৫ না হোক, অন্তত ৩২ বছর তো করা যেত। এমন তো নয় যে, দেশে ৫০ লাখ চাকরি আছে, আর বেকার মাত্র ৩০ লাখ!

বয়স হলে কাজের গতিও কমে যায়। চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়াতে জটিলতা থাকলে অবসরেরও একটা নির্দিষ্ট বয়সসীমা কেন করা হয় না?

বগুড়া-৭ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রেজাউল করিম (বাবলু) সংসদে প্রস্তাবটি এনেছিলেন। কণ্ঠভোটে তার প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়।

রেজাউল করিম তার বক্তব্যে বলেছেন, ‘বিশ্বের ১৯২টি দেশের মধ্যে ১৫৫টি দেশে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৫৫ বছর, কোথাও কোথাও ৫৯ বছর পর্যন্ত। দেশে এখন শিক্ষিত বেকার ২৮ লাখের বেশি।

শিক্ষিত বেকার পরিবারের জন্য বোঝা। শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের জন্য আন্দোলন করেছিল। এখন চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর জন্য আন্দোলন করছে। চাকরি না পেয়ে অনেক যুবক মাদকসেবন, ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ বছর করা উচিত হবে।’

রেজাউল করিমের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন সংসদে বলেছেন, বর্তমানে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ ও অবসরের যে বয়সসীমা, সব দিক বিবেচনায় সেটাকে সরকার যৌক্তিক বলে মনে করছে। স্বাধীনতার পর প্রেক্ষাপট বিবেচনায় চাকরিতে প্রবেশে বয়সসীমা ২৫ থেকে ২৭ ও পরবর্তী সময়ে ৩০ করা হয়। এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট নেই। ২৩ বছর বয়সে শিক্ষার্থীরা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পাচ্ছেন। ছয়-সাত বছর চাকরির প্রস্তুতির জন্য সময় পাচ্ছেন। তা ছাড়া চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ করা হলে পেনশন-সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হবে।

এসব বিবেচনায় নিয়ে প্রতিমন্ত্রী স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রেজাউল করিমকে তার প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করবেন না বলে সংসদকে জানান। পরে প্রস্তাবটি কণ্ঠভোটে দেওয়া হয়। কণ্ঠভোটে তার প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়।

এদিকে অনেক পরিবার বসতভিটা বিক্রি করে ছেলেমেয়েকে পড়ালেখা করিয়েছেন।  অথচ রাষ্ট্র বলে দিল, তোমার বয়স ৩০, অতএব তুমি বাতিল! ডিগ্রির কোনো মূল্য নেই। ৩০ বছর হলে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করা যাবে না, এটা অমানবিক নয় কি? তাহলে এই বেকাররা কী করবে? কোথায় যাবে? তাদের বিকল্প কী? তারা কি রাষ্ট্রের নাগরিক নয়? রাষ্ট্র তাদের কোনো দায়িত্ব নেবে না? চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়িয়ে অবসরের বয়স কমিয়ে ৫৫ বছর করলে ক্ষতি কী? এতে দ্বিগুণ মানুষের কর্মসংস্থান হত।

কেউ সারা জীবন চাকরি করবে, আর কেউ বেকার থাকবে! এক দেশে তো দুই আইন চলতে পারে না। চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর দরকার নেই। আর যারা চাকরিতে আছেন, তাদের বেতন দফায় দফায় বাড়ানোই চলতে থাকুক।

আমাদের দেশের যে ট্যাডিশন সরকারি চাকরি না হলে বেসরকারি চাকরিজীবির নিকট অনেকে মেয়ে বিয়ে দিতে চান না। এখন নাকি স্বামী -স্ত্রী দুইজনকেই চাকরি করতে হবে সরকারি। এমন পরিস্থিতি হয়েছে। অননেকে মনে করেন ছেলে বড় অফিসার না হউক অন্তত পিয়ন হলেও হয়। কারণ সরকারি পিয়নের নাকি অনেক দাম।প্রশ্ন হল, যারা সরকারি চাকরি করেন না, তারা কি জীবন ধারণ করেন না, ভাল জায়গায় বিয়ে করেন না? উত্তর একটাই। করেন তবে নিজের স্বপ্ন অনুযায়ী নয়

মেনে নিলাম এইবার ৩৫ তো দূর ৩২ বছর করা হল না, আগামি ৫ বছর পর ২০২৫ সালে যদি ৩২ বছরও করা হয়, তবে ২০২০ সালে যারা ৩২ বছর দাবি করেছিলেন তাদের কি হবে? সময় এসেছে হয় সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো হউক না হয় বেসরকারি খাতকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেয়া হউক। যাতে ভবিষ্যত নিশ্চয়তা থাকে।

  • 32
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    32
    Shares