কবি ও কবি পত্নীর স্মৃতিবিজরিত তেওতা জমিদার বাড়ি।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও কবি পত্নী প্রমীলা নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজরিত মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতায় স্মৃতি রক্ষার্থে সরকারিভাবে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এবার দেশের ৬টি স্থানে জাতীয়ভাবে নজরুল জন্মজয়ন্তী পালিত হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে তেওতাতেও একযোগে নজরুলের জন্মজয়ন্তী পালনে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

২৫ মে শনিবার দিনের শুরুতে জন্ম দিবসের র‌্যালী, কবি পত্নীর জন্ম ভিটায় কবি ও কবি পত্নীর প্রতিকৃতিতে পুস্পস্তবক অপর্ণ, আলোচনা সভা, রচনা প্রতিযোগীতার পুরুস্কার বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক এস,এম ফেরদৌস। বিশেষ অতিথি থাকবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিরাঞ্জন অধিকারী, নজরুল ইনস্টিটিউটের উপ-পরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন। আলোচনায় অংশ নেবেন স্থানীয় নজরুল গবেষকবৃন্দ।

এদিকে কবির স্মৃতি বিজরিত তেওতাকে ঘিরে দীর্ঘ প্রায় এক যুগ ধরে স্থানীয় এবং সরকারি -বেসরকারিভাবে কবি ও কবি পত্নীর স্মৃতি রক্ষার্থে নানা উদ্যোগ ও কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার তেওতায় জাতীয়ভাবে জাতীয় কবির ১২০তম জন্ম জয়ন্তী উদযাপিত হচ্ছে।

সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তেওতা জমিদার বাড়ি।

এছাড়া কবির স্মৃতি রক্ষার্থে তেওতা জমিদার বাড়ি এলাকায় সৌন্দর্য্য বর্ধনসহ নজরুল ইনস্টিটিউট, যাদুঘর ও পাঠাগার নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।

ইতমধ্যে প্রত্নতত্ত অধিদপ্তরের উদ্যোগে জমিদার বাড়ির নবরত্ন মঠ সংস্কার করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে জমিদার বাড়ির পুকুর পাড়ের ঘাটলা সংস্কারসহ নজরুল-প্রমিলা মঞ্চ নির্মাণ, জমিদার বাড়ির কাঁচা দেওরি সংস্কারসহ দৃষ্টি নন্দন বসার জায়গা তৈরী করা হয়েছে।

জমিদার বাড়ির আঙ্গিনায় পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

এব্যপারে আন্তর্জাতিক নজরুল চর্চা কেন্দ্রের গবেশনা সচিব কৃষিবিদ রফিকুল ইসলাম বলেন, তেওতায় নজরুল স্মৃতি রক্ষার্থে তিনি সাংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করলে ২০১৩ সালে প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর তেওতা জমিদার বাড়ি নবরত্ন মঠ সংস্কারসহ সংরক্ষনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

জানা গেছে, ২০০৮ মানিকগঞ্জ চেম্বার এন্ড কমার্সের তৎকালিন সভাপতি মাহবুব ইসলাম রুনুর উদ্যোগে তেওতা জমিদার বাড়িকে ঘিরে ইকোট্যুরিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রথম বারের মত তেওতায় দু’দিনব্যাপী নজরুল জয়ন্তী পালিত হয়। সেই সাথে স্থানীয় সাংবাদিক বাবুল আকতার মঞ্জুর, জাহাঙ্গীর আলম ভূইয়া, সাইফুল ইসলাম, শাহজাহান বিশ্বাসসহ স্থানীয় উদ্যোমী যুবক ও সাংস্কৃতি কর্মীদের সাথে নিয়ে অনুষ্ঠান সফল করার জন্য সহযোগীতা করা হয়।

পরবর্তীতে ঢাকায় ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনকে সভাপতি ও লেখক সাংবাদিক মোহাম্মদ আসাদকে সাধারণ সম্পাদক করে নজরুল-প্রমিলা পরিষদ নামে জাতীয় সংগঠণ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

এর উদ্যোগে জাতীয় পর্যায়ে নজরুল স্মৃতি রক্ষার্থে ব্যপক যোগাযোগ ও দাবী-দাওয়া পেশ এবং কবি পতœীর জন্ম ভিটা তেওতায় কবি ও কবি পত্নীর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী ধারাবাহিকভাবে পালন করা হচ্ছে। এরপর থেকে নজরুল-প্রমীলার স্মৃতি বিজরিত তেওতা জমিদার বাড়ী ঘিরে স্থানীয় নজরুল ভক্তরা সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করে। স্থানীয় ‘নজরুল-প্রমীলা ইনস্টিটিউট’, তেওতা নজরুল-প্রমীলা সাংস্কৃতিক গোষ্টি, শিবালয় নজরুল-প্রমীলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ, তেওতা জমিদার বাড়ি কেন্দ্রীয় পাঠাগার, নজরুল পরিষদ কেন্দ্রীয় নামে বিভিন্ন সংগঠন তেওতায় নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে।

ইতোপূর্বে কবি পরিবারের সদস্য নাতি সুবর্ণ কাজী, নাতনী খিল খিল কাজী, মিষ্টি কাজী, ভাতিজা আজাহার, পুত্রবধুসহ ভারতের বিভিন্ন কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী এবং ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন, নজরুল গবেষক এমিরেটাস ড. রফিকুল ইসলাম তেওতায় আসেন।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৭তম জন্মবার্ষিকীতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলা একাডেমি মহা পরিচালক অধ্যাপক ড. শামসুজ্জামান খান। ।

২০১৫ সালের ৪, ৫ ও ৬ ডিসেম্বর নজরুল ইনস্টিটিউট তেওতা জমিদারবাড়ি প্রাঙ্গনে জাতীয় নজরুল সন্মেলনের আয়োজন করে। এতে সংস্কৃতিমন্ত্রী, সচিব, নজরুল ইনস্টিটিউট মহা পরিচালক, নজরুল গবেষক, শিল্পি-সাহিত্যিকসহ হাজার-হাজার দর্শক শ্রোতা উপস্থিত হন। এ সন্মেলন ঘিরে গণ্যমাণ্য ব্যক্তিবর্গ তেওতা জমিদার বাড়ীর প্রায় ১০ একর জায়গায় নজরুল চর্চা কেন্দ্র, স্মৃতি জাদুঘর, রেস্ট হাউজ নির্মাণের প্রয়োজনীতা অনুভব ও প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করায় প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর এ রাজবাড়ির দখল বুঝে নিয়ে সংস্কার কাজ শুরু করেছে।

সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তেওতা জমিদার বাড়ি।

স্থানীয় প্রমিলা-নজরুল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠির সভাপতি অজয় কুমার চক্রবর্ত্তী জানান, তেওতা জমিদার বাড়ি সংলগ্ন পূর্ব পাশে ছিল প্রমিলার নজরুলের পৈত্রিক বাড়ি। যা সিএস রেকডে প্রমানিত। সিএস পর্সায় প্রমিলার বাবা বসন্ত কুমার সেন গুপ্ত, জেঠি মা ও কাকা ইন্দ্র কুমার সেন গুপ্তের নাম পাওয়া যায়।

কবি নজরুল বিয়ের আগে ১৯২২ সালে কবি প্রমিলার কাকাতো ভাই ধীরেন্দ্র কুমার সেন গুপ্তের সাথে দুর্গা ও দোল উৎসবে দু’বার আসেন কবি পত্নী প্রমিলার জন্ম ভিটা মানিকগঞ্জের শিবালয়ের তেওতায়। এরপর ১৯২৬ সালে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে পূর্ববঙ্গ সফরে এসে তেওতায় আসেন নজরুল।

প্রমীলার পিতা বসন্ত কুমার সেনগুপ্ত ত্রিপুরা রাজ্যের জমিদারের অধীনে চাকরী করতেন। পিতার অকাল মৃত্যুতে মাতা বিধাবা গিরিবালাকে সাথে নিয়ে প্রমীলা কুমিল্লার কান্দিরপাড় বড় কাকা জগৎ কুমার সেনগুপ্তর বাড়িতে আশ্রয় নেন। তেওতায় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন প্রমীলা।

তাঁর কনিষ্ঠ কাকা ঈন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত কুমিল্লা কোর্ট ইনস্পেক্টর পদে চাকরী করতেন। তাঁর পুত্র বিরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের সাথে কবি নজরুলের ঘনিষ্টতা ও বন্ধুত্ব ছিল। সে সূত্রে নজরুলের সাথে প্রমীলার পরিচয় ঘটে। তেওতা এলাকায় বেড়াতে এসে কবি নজরুল কবিতা, গান, ছড়াসহ বহু সাহিত্য রচনা করেছেন।

নজরুলের লেখা ‘ছোট হিটলার’ কবিতায় পুত্র সব্যসাচি (ডাকনাম সানি) ও পুত্র অনিরুদ্ধের (নিনি) জবানিতে তেওতায় ‘ওদের মামার বাড়ি’ এমন কথা উল্লেখ রয়েছে। এ সময় কবি অনেক কালজয়ী কবিতা, জনপ্রিয় গান, ছড়া, হামদ-নাত, সাহিত্য ইত্যাদি ।

তেওতায় জাতীয় কবি নজরুলের বহু স্মৃতি রয়েছে। যেমন ছোট হিটলার কবিতা, হারা ছেলের চিঠিসহ অসংখ্য গান লিখেন তিনি। নজরুল জমিদার বাড়ির পুকুরে সাঁতার কেটেছেন এবং পুকুর পারে ও বকুল তলায় বসে অনেক গান ও কবিতা রচন করেছেন। বিপ্লবী চেতনার অধিকারী কিরণশংকর রায় চৌধুরী রাজনৈতিক কারনে ও বলিষ্ঠ লিখনীর দ্বারা পরিচিত হয়ে উঠা কবি নজরুলকে খুব স্নেহ ও ভালবাসতেন।

সূত্রে প্রকাশ, তেওতার জমিদার পরিবারের সূচনা খুবই নাটকীয়। রায়েরা জাতিতে জয়দাশ বংশীয় বৈদ্য। আগের পদবী ছিল দাশগুপ্ত। দাশগুপ্ত পরিবারেরই এক ছেলে পঞ্চানন। তাঁর বাবার নাম আনন্দীরাম দাশগুপ্ত। খুব কম বয়সেই পঞ্চানন পিতৃহীন হন। তাই পঞ্চাননকে দিনাজপুরের এক তামাক ব্যবসায়ীর আড়তে কাজ নিতে হয়। বয়স কম হলে কি হবে? পঞ্চানন ছিলেন অত্যন্ত বিষয়বুদ্ধি সম্পন্ন এবং সৎ ও কর্মঠ। একবার তামাকের দাম পরে গেলে পঞ্চানন নিজের আংটি বন্ধক রেখে তামাক কেনেন। পরে দাম উঠলে সে তামাক চরা দামে বেচে ভাল লাভ করেন। সে লাভের টাকা পঞ্চানন আড়তের মালিকের হাতে তুলে দেন।

মালিক তাকে প্রশ্ন করলে পঞ্চানন বলেন, তিনি নিজের আংটি বন্ধক রেখে এ তামাক কিনেছিলেন। পঞ্চাননের সততায় খুশি হয়ে আড়ত মালিক লাভের ঐ টাকা তাকেই রাখতে বলেন। এখান থেকেই পঞ্চাননের উত্থান শুরু। পঞ্চানন ধিরে-ধিরে নিজের অধ্যাবসায় ও বুদ্ধি বলে প্রচুর ধন-সম্পদ আয় করেন ও দিনাজপুরেই আটটি জমিদারী মহল ক্রয় করেন। এরপর থেকে তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি।

প্রচুর সম্পদের মালিক হয়ে নিজ গ্রাম তেওতায় ফিরে আসেন পঞ্চানন। একে একে সেখানে জমিদারী ক্রয় করেন। অন্যান্য স্থানেও জমিদারী ক্রয় করতে থাকেন। এ সময় বিত্তবান পঞ্চননকে লোকে পাঁচু সরকার বলে ডাকতে শুরু করেন। পঞ্চাননের জন্মস্থান সঠিক জানা না গেলেও অনুমান ১৭৪০ থেকে ৪৩ সালের মধ্যে তার জন্ম । তিনি প্রায় ৯০ বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগেই ১৮৩০ সালে মুর্শিদাবাদের নায়েব তাঁকে ‘চৌধুরী’ খেতাব দেন। তাঁর এক ছেলে ছিল নাম কালিশংকর। পঞ্চাননের মৃত্যুর আগেই মাত্র ৩০ বছর বয়সে দু’নাবালক পুত্র ও স্ত্রী রেখে তিনি গত হন।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর ১৯৫০ সালে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্থান বর্তমান বাংলাদেশে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের আগেই তেওতা জমিদার বাড়ির উল্ল্যেখযোগ্য সদস্যরা কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে এ বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

শাহজাহান বিশ্বাস/মানিকগঞ্জ/এমএআরএস