সিফাত বিনতে ওয়াহিদ
সিনিয়র সাব-এডিটর

বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য জগতের শিল্পীদের অধিকাংশকেই শেষ বয়সে সরকারি তহবিল থেকে অনুদান নিতে দেখা যায়। অর্থের অভাবে অনেক শিল্পীরাই ঠিকমতো চিকিৎসার ব্যয় না চালাতে পারার কারণে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হোন। কিন্তু এক সময় যারা খ্যাতির শীর্ষে থাকেন, তাদের কেন শেষ বয়সে এসে চিকিৎসার খরচের জন্য হাত পাততে হয়? কেনই বা এক সময় অঢেল অর্থ উপার্জন করলেও জীবনের পড়ন্ত সময় তারা এতটা অর্থ সংকটে পড়েন?

অনেকেই এ সাহায্য নেওয়ার ঘটনাকে শিল্পীদের বেহিসাবি জীবন ব্যবস্থার ফল বলে মনে করেন, কেউ কেউ আবার প্রশ্ন তোলেন যিনি অনুদান নিচ্ছেন, তিনি সত্যিই সেটা নেওয়ার মতো অবস্থায় আছেন কিনা? এ নিয়ে রয়েছে নানা তর্ক-বিতর্ক। সম্প্রতি এ বিতর্ককেই যেন আরেকটু উস্কে দিলো খ্যাতিমান সংগীতশিল্পী এন্ড্রু কিশোরের অনুদান পাওয়ার ঘটনা। শ৮ সেপ্টেম্বর রবিবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে জনপ্রিয় এই শিল্পীকে চিকিৎসার জন্য দশ লাখ টাকার অনুদানের চেক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর পরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা উঠে, এন্ড্রু কিশোরের মতো সামর্থ্যবান মানুষের অনুদান পাওয়াটা কতটা যুক্তিসঙ্গত।

এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে চলছে নানা আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহারকারীরা স্ট্যাটাসের মাধ্যমে জানাচ্ছেন তাদের প্রতিক্রিয়া। সোহেল অতল নামের একজন লিখেছেন, ‘আমি ভাবছি, এন্ড্রু কিশোরের মতো সামর্থ্যবান মানুষের অনুদান নেয়ার পক্ষে বলার মতো প্রতিবন্ধীও দেশে আছে। যে দেশের বেশিরভাগ মানুষের তিনবেলা খাবার জোটাতে রক্ত ঝরে,  সেই গরীব মানুষের টাকা সঠিক বণ্টন হচ্ছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার ১৬ কোটি মানুষেরই আছে। শিল্পীর সংজ্ঞা জানেন? একজন শিল্পী হয়ে উঠতে গেলে চৌদ্দ পুরুষের সাধনা লাগে। জনপ্রিয় পারফর্মার হলেই তাকে শিল্পী বলে দেওয়া যায় না। আর, প্রকৃত শিল্পীরা কখনো মানসিকভাবে দু:স্থ হয় না।’

সায়েম সামাদ নামের একজন লিখেছেন, ‘এন্ড্রু কিশোর সাহায্য আনতে মিরপুরের নিজের বাড়ি থেকে নিজের গাড়িতে গিয়েছিলেন? না ভাড়া করা গাড়িতে গিয়েছিলেন?’

ইমরান পরশ নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘শিল্পীরা এত টাকা কী করেন যে দুঃস্থ সাহায্য লাগে? শিল্পী সম্মানী ১ কোটি হওয়া উচিত। অনেকের প্রিয় কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোর। আমারও ছিলেন। অসংখ্য গান তার। বাংলা চলচ্চিত্রের বেশিরভাগ পুরুষ কণ্ঠের গান তার। ২০১৪ সালের কথা। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমার লেখা একটি গানে কণ্ঠ দেওয়ার জন্য এন্ড্রু কিশোরকে বলা হলে তিনি বললেন ১ লাখ টাকা লাগবে। শুধু ভয়েস দিলে ১ লাখ। বাইরে তার ভিডিও ধারণ করলে আলোচনা সাপেক্ষে।

একটি গান গাইতে ১ লাখ টাকা চান বা পান। তাহলে সাহায্য কেন?  সারাজীবন তো কোটি টাকা কামান। বাড়ি গাড়ি আছে। তবুও এই সামান্য ভিক্ষা (ভিক্ষা বললাম কারণ এটা দুঃস্থ ভাতা) নিতে আত্মসম্মানে কি বাধে না?’

তবে এইসব সমালোচনার বাইরে কিছু ব্যতিক্রমও আছে। কেউ কেউ এই শিল্পীর পক্ষেও আওয়াজ তুলেছেন। টিটপ হালদার নামের একজন এই অনুদানের পক্ষে লিখেছেন, ‘এন্ড্রু কিশোর চিকিৎসার জন্য দশ লাখ টাকা সাহায্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন- বিগত ১২ বছরে এন্ড্রু কিশোরের কয়টি ক্যাসেট/সিডি কিনেছেন!’

এন্ড্রু কিশোরের এই অনুদান নেওয়ার পক্ষে-বিপক্ষে যতই আলোচনা-সমালোচনা হোক না কেন, প্রশ্নটা কিন্তু থেকেই যায়। শিল্পীদের এই অর্থ সংকটের পেছনে মূলত কী কারণ?

শিল্পীরা সাধারণত তাদের ক্যারিয়ারের শুরুতে প্রচুর অর্থ সম্পদ অর্জন করেন। তাদের এই ব্যয়ের পরিমানও তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি থাকে। আর তাছাড়া তারকাসুলভ জীবন যাপন বজায় রাখার জন্য আয়ের যে অংশ তারা ব্যয় করেন, শেষ পর্যন্ত ওই উপার্জন ভবিষ্যতের জন্য ধরে রাখা একজন শিল্পীর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায় হয়তো। অনেকেই আবার বেহিসাবি চলাফেরা, অসচেতন যাপন ব্যবস্থা এবং দু হাতে অর্থ উড়ানোর কারণে ভবিষ্যতের জন্য তাদের কোনো সঞ্চয় ধরে রাখতে পারেন না।

শুধুমাত্র শিল্পীদের ক্ষেত্রেই নয়, যে কোনো মানুষেরই নিজের ভবিষ্যত সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিৎ। অল্প করে হলেও ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয় করে রাখা উচিত। শিল্পীদের উচিত তারকা খ্যাতি থাকতে থাকতেই নিজের পেশার বাইরে গিয়েও উপার্জনের জন্য বিকল্প কিছু গড়ে তোলা। যেন শেষ বয়সে তারা অর্থ সংকটে না পড়েন এবং সাহায্যের জন্য যেন প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হতে না হয়।

আজকের পত্রিকা/সিফাত