খৎনার বিরুদ্ধে আন্দোলনরত কেনিয়াবাসী। ছবি : সংগৃহীত

নারীর খৎনার মানে হলো ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের যৌনাঙ্গের বাইরের অংশটি কেটে ফেলা। অনেক সময় ভগাঙ্কুরের পাশের চামড়া কেটে ফেলা হয়। ইংরেজিতে একে বলা হয় এফিএম বা ফিমেল জেনিটাল মিউটিলেশন।

সম্প্রতি জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের প্রতিটি ২০জন মেয়ে শিশু বা নারীর মধ্যে একজনের খৎনা করা হয়ে থাকে। আর বর্তমানে বিশ্বে এ রকম ২০ কোটি নারী রয়েছেন, যাদের আংশিক অথবা পুরো খৎনা অর্থাৎ যৌনাঙ্গ কেটে ফেলা হয়েছে।

বর্তমানে আফ্রিকার অনেক এলাকায়, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার কিছু অংশে এই রীতি চালু আছে। তবে ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু অভিবাসী সমাজে, উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু গোষ্ঠীর ভিতরও এই প্রবণতা রয়েছে।

কাটারের হাতে থাকা ব্লেডটি দিয়ে বেশ কয়েকটি মেয়ের খৎনা করা হয়েছে। ছবি : সংগৃহীত

ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ২৯টি দেশে ব্যাপকভাবে এই রীতি চালু রয়েছে। যদিও এদের মধ্যে ২৪টি দেশেই খৎনা নিষিদ্ধ। জাতিসংঘ নারীদের এরকম যৌনাঙ্গ কর্তন বন্ধের আহ্বান জানিয়ে প্রতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি ‘জিরো টলারেন্স’ দিবস পালন করে।

অনেক নারী শিশু অবস্থাতেই এ রকম খৎনা করা হয়। অনেক সময় বয়ঃসন্ধির সময় এটি করা হয়। কিন্তু এর ফলে নারীদের শারীরিক এবং মানসিক সমস্যা সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে তাদের সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। খৎনার কারণে নারীদের শারীরিক এবং মানসিক যে ক্ষতি হয়, এর স্বাস্থ্যগত কোনো উপকারিতা নেই। নারীদের জন্য উদ্বেগ এবং তাদের পরবর্তী সম্পর্কের ওপর মারাত্মকভাবে ক্ষতি করে এই বিষয়টি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা জোর করে এটি করা হয়ে থাকে।

খৎনার শিকার একজন নারী বিশারা বলছেন, ‘আরও চারটি মেয়ের সঙ্গে আমার খৎনা করা হয়েছিল। প্রথমে আমার চোখ বেঁধে ফেলা হয়। এরপর আমার দুই হাত পেছনে শক্ত করে বাঁধা হয়। আমার দুই পা দুই দিকে মেলে ধরে যৌনাঙ্গের বাইরের চামড়া দুইটি শক্ত করে পিন জাতীয় কিছু দিয়ে আটকে দেওয়া হয়। কয়েক মিনিট পর আমি তীক্ষ্ণ একটি ব্যথা অনুভব করলাম। আমি চিৎকার করতে লাগলাম, আর্তনাদ করলাম, কিন্তু কেউ আমার কথা শুনলো না। আমি লাথি মেরে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু দানবের মতো কেউ আমার পা চেপে ধরে রাখল। এটি ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। ব্যথা নিরাময়ের জন্য ছিল শুধুমাত্র স্থানীয়ভাবে তৈরি ভেষজ ঔষধ। একটা ছাগলের মতো করে তারা আমার দুই পা টেনে ধরে ক্ষত স্থানে সেই ভেজষ ওষুধ মাখিয়ে দিলো। এরপর বলতে লাগলো, পরের মেয়েটিকে নিয়ে আসো।’

মেয়েদের খৎনা অনেক দেশেই বেআইনি, তবে দক্ষিণ আফ্রিকা, এশিয়া আর মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে এটি করা হয়ে থাকে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের অনেক সম্প্রদায়ের মধ্যেও এটি প্রচলিত আছে।

মেয়েদের চার ধরনের খৎনা:

১. ভগাঙ্কুর এবং আশেপাশের চামড়ার পুরোটাই বা আংশিক কেটে ফেলা

২. ভগাঙ্কুর, যৌনাঙ্গের বাইরের বা ভেতরের চামড়া অপসারণ করে ফেলা

৩. যৌনাঙ্গের বাইরের এবং ভেতরের চামড়া কেটে এমনভাবে পুনঃস্থাপন করা, যাতে শুধুমাত্র মূত্র ত্যাগের জন্য ছোট একটি ফাঁকা থাকে। এতে অনেক সময় নারীদের নানা সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। অনেক সময় এই ফাঁকা জায়গাটি এত ছোট হয়ে থাকে যে, যৌন মিলনের জন্য পরবর্তীতে আবার কেটে বড় করতে হয়। অনেক সময় সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

৪. ওপরের তিনটির বাইরে ভগাঙ্কুরের বা যৌনাঙ্গের সবরকম কাটা ছেড়া বা ক্ষত তৈরি করা।

সামাজিক রীতি, ধর্ম, পরিছন্নতার বিষয়ে ভুল ধারণা, কৌমার্য রক্ষার একটি ধারণা, নারীদের বিয়ের উপযোগী করে তোলা এবং পুরুষের যৌন আনন্দ বৃদ্ধি করার মতো বিষয়গুলো নারীদের খৎনার পেছনে কারণ হিসেবে কাজ করে। অনেক সময় বিয়ের পূর্বশর্ত হিসেবেও দেখা হয় এটিকে। এ ধরনের রীতিতে অভ্যস্ত সমাজগুলোর মানুষেরা মনে করেন, যেসব নারীদের খৎনা করা হয়নি, তারা অস্বাস্থ্যকর, অপরিছন্ন বা গুরুত্বহীন।

আজকের পত্রিকা/বিএফকে/সিফাত/জেবি