লক্ষ্মীপুরের মৃৎশিল্পীদের তৈরি মাটির হাড়ি। ছবি : সোহেল রানা।

একটা সময় দেশের সব জনপদেই এক বা একাধিক কুমার পাড়া ছিল। কিন্তু বিগত কয়েক দশকে নানান কারণে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে কুমার পাড়াগুলো। দিনে দিনে মৃৎশিল্প হয়েছে আধুনিকায়ন। তার সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে নির্মাণ ব্যয়ও। তেমনই লক্ষ্মীপুরের বিস্তীর্ণ জনপদেও ছিল  বিশাল পাল পাড়া বা কুমার পাড়া। এখন লক্ষ্মীপুরে সেই কুমার পাড়া খুঁজে পাওয়ায় কঠিন। আর লক্ষ্মীপুরের কুমারদের কঠিন বাস্তবতা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন লিখেছেন লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি সোহেল রানা।

বাজারে বেড়েছে বিভিন্ন কোম্পানির প্লাস্টিক সামগ্রীর কদর। আর আধুনিতকার করাল গ্রাসে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। এক সময় লক্ষ্মীপুর জেলার বিস্তীর্ণ জনপদে ছিল বিশাল পাল পাড়া বা কুমার পাড়া। নারী পুরুষ নির্বিশেষে পাল বংশের মানুষেরা মৃৎশিল্পের কাজ করতেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। এখন লক্ষ্মীপুরে সেই কুমার পাড়া খুঁজে পাওয়ায় কঠিন। অবশিষ্ট যে কয়েকটি পরিবার আছে, তাদের জীবন-যাপনে এসেছে দুর্দিন।

বিগত কয়েক দশকে কীভাবে পুরো কুমার পল্লীটি হারিয়ে যেতে বসেছে, তার গল্পটাও কম বেদনাদায়ক নয়। এই শিল্প নিয়ে আঁকড়ে থাকা লক্ষ্মীপুরের মৃৎশিল্পীদের জীবনে নেমে এসেছে দুর্দিন। মৃৎশিল্পীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পূর্ব পুরুষের কাছ থেকে শেখা এই কর্মই কালের আবর্তে যেন মরণ বোঝা হয়ে চেপেছে তাদের ঘাড়ে। কোমলমতি ছেলে-মেয়ে নিয়ে কষ্টে দিনাতিপাতসহ তাদের এ শিল্পের সাথে জড়িতরা চরম দুর্দিন পার করছেন।

এক সময় দেশের নদী বা খাল বিলে বিশাল বিশাল নৌকার বহর দেখা যেত যেখানে মাটির তৈরি নানান ধরনের সামগ্রী স্তূপ করা থাকতো। নৌকাগুলো কোনো না কোনো কুমারপাড়া থেকে মাটির এসব সামগ্রী নিয়ে যেত নানান হাটে-বাজারে। মাটির সামগ্রী পরিবহণে ভেঙে যাওয়ার বিশেষ ঝুঁকি থাকায় নৌপথে পরিবহনও ছিল নিরাপদ। নৌকার সেই বহর এখন আর আগের মত দেখা যায় না। এই পরিবর্তনই বলে দেয় মৃৎশিল্পের ব্যাপক উৎপাদন ও চাহিদায় যে গত কয়েক দশকে ক্রমাগত ভাটা পড়েছে।

মাটির তৈরি গৃহস্থালী সামগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্রে সহজেই ফেটে বা ভেঙে যাবার ঝুঁকি বরাবরই থাকে। ফলে এই পণ্যের চাহিদাও সকল জনপদে প্রতিনিয়ত তৈরি হতো। মৃৎশিল্পের গবেষক ও পর্যবেক্ষকরা মাটির তৈরি সামগ্রী ব্যবহারের পুরনো সংস্কৃতি ও চর্চার ইতিহাস ঘেটে দেখেন এগুলো ভেঙে যাওয়াকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জনপদে মজার মজার ঘটনা তৈরি হতো।

মৃৎশিল্পীদের তৈরি মাটির পণ্য। ছবি : সোহেল রানা।

দিন যতই যাচ্ছে ততই যেন তাদের জীবন ঘিরে আসছে ভয়ানক অন্ধকার। অথচ এক সময় লক্ষ্মীপুরের মৃৎশিল্প কারিগরদের এমন দুরাবস্থা ছিলো না। সবসময়ে মৃৎশিল্পীরা কাজ আর কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করতো। প্রথমে মাটি সংগ্রহ। তারপর সে মাটি দিয়ে খামির তৈরি করা। পরে খাঁছে বসিয়ে ইচ্ছেমতো নানান রকম হাঁড়ি, পাতিল, কলস, বাসন, মাটির ব্যাংক, হান্ডি, বোটগা, শিশুদের নানান রকমের খেলনা থেকে শুরু করে পরিবারের প্রয়োজনীয় নুনের বাটিটি পর্যন্ত মাটি দিয়ে তৈরি হতো।

লক্ষ্মীপুর জেলায় কামার আর কুমারদের খুঁজে পাওয়া এখন মুশকিল। সদর উপজেলার তেওয়ারীগঞ্জ ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের কুমার বাড়িতে এক সময় ২৪ পরিবারের প্রায় ১৩০জন কুমার মৃৎশিল্পের সাথে জড়িত ছিল। বর্তমানে মাত্র ৪টি পরিবারের ১৮ জন কুমার পূর্ব পুরুষের ঐতিহ্য পেশায় কাজ করছেন।

বাংলা নববর্ষকে ঘিরে পুরো চৈত্র মাসজুড়ে দেশের বিভিন্ন জেলার সাথে মিল রেখে লক্ষ্মীপুরেও আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলা। ঘরে ঘরে চলে উৎসব আয়োজন। এ মেলাকে ঘিরে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ তাদের কিছু বাড়তি আয় করে নেয় নিজ নিজ কারিগরি দক্ষতা দিয়ে।

৮০ দশকে গ্রাম বাংলার বিশেষ করে বৃহত্তর নোয়াখালী জুড়ে ১৬ আনাই মাটির জিনিসপত্র ব্যবহার করা হতো। তৎকালীন সময়ে বিয়ে, কুলখানি, কাঙালিভোজ, মসজিদের শিরনী থেকে শুরু করে সবপ্রকার সামাজিক অনুষ্ঠানেও এই মাটির জিনিসপত্রের ব্যবহার হতো।

মৃৎশিল্পীদের তৈরি মাটির পণ্য। ছবি : সোহেল রানা।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার তেওয়ারীগঞ্জ ইউনিয়নের কুমার বাড়ির মৃৎশিল্পীরাও ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন বৈশাখী মেলাকে সামনে রেখে। মাটি দিয়ে তারা তৈরি করছেন নানা রকমের সামগ্রী। তারপর রঙ দিয়ে করে তুলছেন আকর্ষণীয়। মৃৎশিল্পী রুদ্র কুমার পাল আজকের পত্রিকাকে জানান, ‘বছরের অন্য সময়ে মাটির সামগ্রীর চাহিদা বেশি না থাকলেও বৈশাখ মাসে চাহিদা অনেকটাই বেড়ে যায়।’

বৈশাখে নতুন বছর উদযাপন ও বৈশাখী মেলার কারণে জেলার মৃৎশিল্পীদের ব্যস্ততাও বেশি থাকে বলে জানান রুদ্র কুমার পাল। লক্ষ্মীপুরের কুমার বাড়িগুলোতে দেখা যায়, চাকা ঘুরিয়ে মাটি প্রক্রিয়াকরণ করে নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে ফুলদানি, মাটির ব্যাংক, পুতুল এবং খেলনা গরু, ঘোড়া, হাতি ও পাখিসহ নানা বাহারি দ্রব্যসামগ্রী।

বৈশাখী মেলাগুলোতে বিশেষ এলাকাজুড়ে সাজানো এসব মাটির তৈরি সামগ্রীর দৃষ্টিনন্দন পসরা ছোট-বড় সব বয়সের মানুষকেই সমানভাবে আকৃষ্ট করে। বৈশাখে মাটির তৈরি এসব তৈজসপত্র বিক্রিও হয় ভালো হয় বলেও জানায় মৃৎশিল্পীরা। সেকারণে পুরুষের পাশাপাশি পালবাড়িগুলোর নারী সদস্যরাও ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন এসব দ্রব্যসামগ্রী তৈরিতে।

মাটির তৈরি বিভিন্ন খেলনা সামগ্রী মেলায় পাঠানোর জন্য এখন চলছে রোদে শুকানোর কাজ। রুদ্র পাল আজকের পত্রিাকে বলেন, ‘এখন এ শিল্পের চাহিদা অনেকটা মেলাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত দাম দিয়ে মাটি কিনে এসব সামগ্রী তৈরি করা হলেও অন্য সময়ে সে অনুযায়ী মূল্য পাওয়া যায় না।’

দেশের প্রবীণ ও নবীন কুমারদের কাছ থেকে জানা যায় এক সময় তারা যত ধরনের মাটির সামগ্রী বানাতেন তার অনেক কিছুই গত কয়েক দশক ধরে আর তেমন ব্যাপকভাবে বানানোর প্রয়োজন পড়ে না। বরং পরিবর্তিত বাস্তবতায় নতুন নতুন নানান সামগ্রী তৈরি করছেন নতুন প্রজন্মের মৃৎশিল্পীরা। 

মাটির পণ্য তৈরি করছেন মৃৎশিল্পী দিপক কুমার পাল। ছবি : সোহেল রানা।

কুমার কুমদ চন্দ্র পাল ও তার স্ত্রী কাঞ্চন রাণী পাল আজকের পত্রিকাকে জানান, ‘আগে মাটির তৈরি জিনিসপত্রের ব্যাপক চাহিদা থাকায় ১৬ আনাই মাটির জিনিসপত্র তৈরি করতাম। তখন এই জিনিসগুলো বানাতে যে মাটি লাগতো তা আমাদের এই অঞ্চলে পাওয়া যেত। এখন আর মাটি এই জেলায় পাওয়া যায় না। তাই এখন মাটি আনতে হয় নোয়াখালীর চৌশুহনীর জমিদার হাট এলাকা থেকে। এতে আমাদের খরচ আগের তুলনায় অনেক বেশি। আগে ১ পিকআপ এঁটেল মাটি পাওয়া যেত ৫-৬ হাজার টাকায়। বর্তমানে ১০-১২ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে মাটি।’

তারা আজকের পত্রিকাকে আরও বলেন, ‘আমাদের টাকা-পয়সা না থাকায় এখন আর তেমন মাটির পণ্য তৈরি করি না। এখন মাত্র ৪ পরিবার এ পেশায় জড়িত রয়েছি।’

কুমার দিপক কুমার পাল ও তার স্ত্রী বিউটি রাণী পাল আজকের পত্রিকাকে জানান, ‘বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির প্লাস্টিকের কদর বাড়ায় আমরা এখন বানাচ্ছি মাত্র ১-২ রকম জিনিস। কালের আর্বতনে আর আধুনিকতার কারণে আমরা মৃৎশিল্পীরা যে স্বপ্ন দেখেছি, সেই স্বপ্নগুলো যেন স্বপ্নই থেকে গেল। আর সেই থেকে আমাদের মৃৎশিল্পীদের পরিবারে দুর্দিন শুরু হয়েছে। আগে কাজের মধ্যে ব্যস্ত থাকতাম কিন্তু এখন যে কাজ তা অতিসামান্য যা দিয়ে আমাদের জীবন চলাই দুষ্কর।’

কালের আবর্তে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের তৈরি পণ্য হারিয়ে গেলেও এখনো বাঁচিয়ে রেখেছেন লক্ষ্মীপুরের মৃৎশিল্পীরা। এ শিল্প যখন হারিয়ে যাচ্ছে আধুনিক পণ্যের কাছে, তখনই তারা নিজস্ব উদ্যোগ নিয়ে তৈরি করছেন নিপুণ সৌন্দর্যের এক অপরিহার্য পণ্য।

মাটির পণ্য তৈরি করছেন মৃৎশিল্পী নারী । ছবি : সোহেল রানা।

৮৫ বছর বয়সী শিপু রাণী পাল মনে করেন, ‘বর্তমান যুগে মৃৎশিল্পের পুনর্জাগরণ কিংবা এ পেশায় তাদের সুদিন ফিরে আর আসবে না।’ তবুও পূর্ব পুরুষের হাতে শিক্ষা নেয়া ওই শিল্পকেই আঁকড়ে ধরে মরতে চান তিনি।

কুমার জনার্ধন পাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘অর্থের অভাবে এ পেশা থেকে দিন দিন সবাই সরে যাচ্ছে। দেশের অন্যান্য জেলায় কুমারদের জন্য সরকার ভাতা দিচ্ছে। কিন্তু লক্ষ্মীপুরের কুমাররা কোনো সাহায্য সহযোগিতা পাচ্ছে না। দেশের ঐতিহ্য রক্ষায় সরকার কিছু সাহায্য সহযোগিতা করলে এ পেশাটাকে আঁকড়ে রাখা যেত। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’

মৃৎশিল্প এক সময় এতটাই অপরিহার্য ছিল যে ঘরে ঘরে নিত্য ব্যবহারে প্রায় সকল গৃহস্থালি সামগ্রীর জন্য নির্ভর করতে হত কুমারদের ওপর। রান্না-খাওয়াসহ নানান কাজে মাটির তৈরি জিনিসের ওপর ছিল গ্রাম এমনকি শহরের মানুষেরও নির্ভরতা। বিবর্তনের ধারায় সেই চিত্র পাল্টাতে থাকে। মাটির বদলে কাঁসা, পিতল, এলুমিনিয়াম, প্লাস্টিক ও স্টেইনলেস স্টিল দখল করে নেয়। তারপরও গ্রামে শহরে মৃৎশিল্প টিকে আছে নানান নতুন আয়োজনে। আর ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের দিকে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন লক্ষ্মীপুরের মৃৎশিল্পীরা।

আজকের পত্রিকা/এমএআরএস/জেবি/আ.স্ব

বৈশাখ নিয়ে আরও সংবাদ পড়তে ক্লিক করুন