র‍্যাগিং বন্ধে শীঘ্রই ‘র‍্যাগিং বিরোধী আইন’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। ছবি : সংগৃহীত

স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রবেশ করা প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনে একটি সুন্দর ও কাঙ্ক্ষিত অধ্যায়। অনেক স্বপ্ন ও আশা নিয়ে একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে জীবন গড়তে। পরিবারের হাল ধরতে হবে, বড় মানুষ হতে হবে, সফল হতে হবে; এরকম নানা স্বপ্ন থাকে তাদের চোখে। কিন্তু তারা জানে না তাদের সেই স্বপ্নগুলোয় প্রথম বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সিনিয়র ভাই-বোনেরাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখা নতুন শিক্ষার্থীদের প্রথমদিকে পথে-ঘাটে চলতে-ফিরতে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় মুখোমুখি হতে হয় ভয়াবহ র‍্যাগিংয়ের; যা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পরেই এক নেতিবাচক অভিজ্ঞতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় তাদের।কখনো দলবদ্ধভাবে কিংবা কখনো দু-একজন সিনিয়র মিলে জুনিয়রদেরকে নানারকম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করে থাকেন।

একেক বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍্যাগিংয়ের একেক নাম। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍্যাগিংকে বলা হয়ে থাকে ‘মুরগী বানানো’, কোথাও বলা হয় ‘ম্যানার (ব্যবহার) শিখানো’ কিংবা ‘ফাঁপর দেওয়া’। আবার দেশের কিছু নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ‘গেস্ট রুম কালচার’ও চালু আছে; যা কিনা র‍্যাগিংয়ের আরেক মার্জিত নাম। বলা হয়ে থাকে, নবীন শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর উদ্দেশ্যেই এই কালচারের সৃষ্টি। বিষয়টি শুনতে খুব ইতিবাচক হলেও প্রকৃতপক্ষে যা ঘটে তা অত্যন্ত ভয়াবহ, অমানবিক ও নিন্দনীয়। পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর নামে মধ্যরাতে প্রচণ্ড শীতের মধ্যে নবীন শিক্ষার্থীকে হল থেকে বের করে দিয়ে সকালবেলা ঢুকতে দেওয়া অথবা মধ্যরাতে পুকুর থেকে গোসল করে আসতে বাধ্য করা কখনোই সুস্থ কালচার হতে পারে না। গেস্টরুমের নামে শিক্ষার্থীদের যে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়ে থাকে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের অনেকের কাছেই অজানা।

ক্ষেত্রমতে, র‍্যাগিংয়ের ধরন ভিন্ন। কখনো র‍্যাগিং শুধুমাত্র বকাঝকা কিংবা গালিগালাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কখনো আবার মারধর কিংবা জুনিয়রদেরকে সারাক্ষণ তদারকির মধ্যে রেখে ঠিক মত সালাম না দেওয়ার জন্য বকাবকি, কান ধরে উঠবস করানো, কাউকে প্রোপোজ করতে অথবা কোনো নাটকের দৃশ্য অভিনয় করে দেখাতে বাধ্য করার মাধ্যমে সিনিয়ররা জুনিয়রদেরকে র‍্যাগ দিয়ে থাকে। র‍্যাগিংয়ের নামে মাঝে মাঝে সিনিয়রদের দ্বারা জুনিয়রদেরকে ইভটিজিং কিংবা যৌন নিপীড়নের ঘটনাও ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত বড় এবং স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কয়েক বছর আগে একজন ছাত্রকে র‍্যাগিং দেওয়ার নামে বৃষ্টির মধ্যে অনেকক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। এতে সে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। বিষয়টি তখন গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় এসেছিল। এবছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুইজন নবীন শিক্ষার্থীকে র‍্যাগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে কয়েকজন ছাত্র চড়-থাপ্পড় দেয় এবং নিজেরাই এর ভিডিও ধারণ করে, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন সোশাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়। যেখানে দেখা যায়- বড় ভাইয়েরা তাদের জুনিয়রদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক ছাত্র র‍্যাগিংয়ের শিকার হয়ে মানসিকভাবে এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়ে যে, সে তার বাবা এবং চাচাকেও চিনতে পারেনি। র‍্যাগিংয়ের শিকার একজন শিক্ষার্থী শারীরিক এবং মানসিকভাবে ভীষণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে তার স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয়। এমনকি তার পড়াশোনারও ইতি ঘটতে পারে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

র‍্যাগিংয়ের বিচার পাওয়া নিয়েও শঙ্কায় থাকতে হয় নবীন শিক্ষার্থীদের। সিনিয়রদের চাপে তারা অনেক সময়ই মুখ বুজে সহ্য করে নেয় এসব অমানবিক নির্যাতন। আবার কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়াই বন্ধ করে দেয়। দিন দিন র‍্যাগিংয়ের ঘটনা বেড়েই চলছে। র‍্যাগিং এর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হওয়াই এর মূল কারণ। শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও র‍্যাগিং কালচার ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। এই অনৈতিক কালচারের লাগাম এখনই টেনে ধরতে হবে। না হলে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
বিজ্ঞাপন

এই অপসংস্কৃতি বন্ধ না হওয়ার পেছনে শিক্ষার্থীরাই প্রত্যক্ষভাবে দায়ী। নিজেরা র‍্যাগিংয়ের শিকার হয়ে পরের বছর জুনিয়রদের র‍্যাগ দেওয়ার মানসিকতাই এর প্রধাণ কারণ। এছাড়া শিক্ষার্থীরা অনেকে র‍্যাগিংকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি এক্সট্রা কো কারিকুলার কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে দেখে। কেউ আবার বিষয়টিকে বিনোদনের অংশ হিসেবেও নেয়। ‘জুনিয়রদের পাখা গজাচ্ছে এবং সেই পাখা কেটে দিতে র‍্যাগিং প্রয়োজন’- সিনিয়রদের মাঝে এরকম মনোভাবও র‍্যাগিং সংস্কৃতি বন্ধ না হওয়ার একটি কারণ।

র‍্যাগিং কালচার বন্ধ করতে শিক্ষার্থীদের মানসিকতার পরিবর্তন ও উন্নতি প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত। আমাদের পাশের দেশ ভারতে এন্টি র‍্যাগিং টোল ফ্রি কল সেবা চালু করেছে সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। ফলে অনেক শিক্ষার্থী র‍্যাগিং এর শিকার হয়ে সেই নাম্বারে কল করে র‍্যাগিং থেকে সুরক্ষা পাচ্ছে। আমাদের দেশেও এরকম একটি টোল ফ্রি সার্ভিস চালু করা যেতে পারে। এছাড়া র‍্যাগিং বন্ধে ভারতে এন্টি র‍্যাগিং আইনও তৈরি করা হয়েছে অনেক আগে। আমাদের দেশে শিক্ষা আইনে এরকম কোনো আইন এখনও যুক্ত হয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক র‍্যাগিংয়ে সঠিক বিচার পাচ্ছে না ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। শুধুমাত্র যেসকল র‍্যাগিংয়ের ঘটনা সোশাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয় সেগুলোই সবার নজরে আসে। আর শুধু সেগুলোরই তদন্ত হয় এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে র‍্যাগিংয়ের অনেক ঘটনা ঘটছে; যেগুলো সবার চোখে পড়ছে না। র‍্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে আইন তৈরি হলে শিক্ষার্থীরা র‍্যাগিং প্রতিরোধে সোচ্চার হবে এবং প্রতিকারও পাবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি এন্টি র‍্যাগিং কমিটিও গঠন করা উচিত। এই কমিটি র‍্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের সচেতন করবেন এবং যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। র‍্যাগিং বন্ধ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন প্রণীত একটি র‍্যাগিং বিরোধী নীতিমালা থাকা দরকার, যা সকল বিশ্ববিদ্যালয় অনুসরণ করতে বাধ্য থাকবে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একজন শিক্ষার্থীর সুখ-দুঃখে সিনিয়ররাই এগিয়ে আসে। কিন্তু র‍্যাগিং কালচার এভাবে চলতে থাকলে শিক্ষার্থীরা সিনিয়রদের কাছে কোনো সাহায্য সহযোগিতার জন্য যাবে না। সিনিয়র-জুনিয়রের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্নেহের সম্পর্ক দেখা যাবে না ক্যাম্পাসে। শুধু তাই নয়, র‍্যাগিং সংস্কৃতি বন্ধ করা না গেলে একসময় এই অপসংস্কৃতি বিভিন্ন স্কুল-কলেজেও ছড়িয়ে পড়বে। স্কুল-কলেজ থেকেই শিক্ষার্থীদের র‍্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে সচেতন করতে হবে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীদের র‍্যাগিংয়ের কুফল সম্পর্কে জানাতে হবে, শেখাতে হবে।

র‍্যাগিং কালচার বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। যে করেই হোক এই অপসংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীদের মাঝে পারস্পরিক সম্মান বৃদ্ধি করতে হবে। সিনিয়রদের উচিত জুনিয়রদেরকে সুন্দর করে ক্যাম্পাসে বরণ করে নেওয়া। ম্যানার শেখানোর নামে তাদেরকে শারীরিক কিংবা মানসিকভাবে নির্যাতন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা বন্ধ করতে না পারলে অনেক শিক্ষার্থীকেই অকালে বন্ধ করে দিতে হতে পারে পড়াশোনা। কিংবা কাউকে মানসিক ট্রমা নিয়ে কাটাতে হতে পারে সারাজীবন। তাই র‍্যাগিং বন্ধে শীঘ্রই ‘র‍্যাগিং বিরোধী আইন’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরী। বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিবেচনায় নেবে বলেই আশা করি।

লেখক : ফাতিন হাসনাত রহমান