প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তনে প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের কাছ থেকে সনদ নিচ্ছেন এক শিক্ষার্থী

স্কুল গুলোতে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষা বাদ দিয়ে মূল্যায়নের দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। বেসরকারি প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন বক্তৃতায় তিনি একথা বলেন।

রবিবার সকালে চট্টগ্রামের নেভি কনভেনশন সেন্টারে দ্বিতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও স্বামীর অসুস্থতার কারণে তিনি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেননি।

শিক্ষামন্ত্রীর স্থলে রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি হিসেবে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. কাজী শহীদুল্লাহ।

বিশেষ অতিথি ছিলেন শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী এমপি। স্বাগত বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রফেসর ড. অনুপম সেন।

সমাবর্তনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইউজিসির সদস্য ড. সাজ্জাদ হোসেন, বিশ্ববিদ্যালয়টির বোর্ড অব ট্রাস্টিজ মেম্বার প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, হাসিনা মহিউদ্দিন, নাট্য ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ, কবি ও সাংবাদিক অরুণ দাশগুপ্ত, সাবেক সংসদ সদস্য সাবিহা মুসা, রেমন্ড আরেং, বোরহানুল হাসান চৌধুরী, সিন্ডিকেট মেম্বার প্রফেসর ড. মোহিত উল আলম, আমন্ত্রিত অতিথি চিত্রনায়ক ফেরদৌস, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রফেসর শিরীণ আখতার ও সিভাসুর উপাচার্য প্রফেসর ড. গৌতম বুদ্ধ দাশ প্রমুখ।

এতে বিশ্ববিদ্যালয়টির ৬টি অনুষদের ১০টি বিভাগের ১৪টি প্রোগ্রামের মোট ১ হাজার ১১২ জন গ্র্যাজুয়েটকে সনদ দেওয়া হয়। এর মধ্যে স্নাতক পর্যায়ে ৮১৬ জন এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ২৯৬ জন শিক্ষার্থী শিক্ষা সমাপনী সনদ গ্রহণ করেন। আর একাডেমিক পর্যায়ে কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ১১ শিক্ষার্থীকে অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়।

বর্তমান প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া সমীচীন হবে উল্লেখ করে সমাবর্তন বক্তৃতায় বেশ কয়েকটি প্রস্তাবনা তুলে ধরেন ড. ফরাস উদ্দিন। প্রস্তাবনায় তিনি বলেন, কোন কোন বিষয়ে কী পদ্ধতিতে পাঠদান করা হবে তা নির্ধারণ করা উচিত। জ্ঞান অর্জনে যাতে সফলতা ও গভীরতা অর্জিত হয় সেরকম পাঠদান পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে।

সহজ ও আর্কষণীয় ভাষায় পাঠ্যপুস্তক রচনার জন্য নিরপেক্ষ বিচারকমণ্ডলীর সমন্বয়ে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পাঠ্যবই নির্বাচন করা যেতে পারে। তবে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনা ও হোমওয়ার্কের বোঝা যথাসম্ভব কমিয়ে জ্ঞান আহরণের আনন্দবহ আগ্রহ সৃষ্টি সহায়ক পঠনসূচি নির্ধারণ করাই সমীচীন হবে। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট স্কুলে এর মূল্যায়নের দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে।

শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সামাজিক সমস্যা সমাধানের উপায় হিসেবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে পশ্চিমা উন্নত বিশ্বের মতো স্থানীয় পাড়া মহল্লা ভিত্তিক ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হবে। স্কুলের ইউনিফর্ম থাকবে, প্রয়োজনে শুধু স্কুল বাসে ছাত্র-ছাত্রীরা যাতায়াত করবে। মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে ও সর্বনাশা পথে পা বাড়ানোর বিরুদ্ধে আদর্শিক সংগ্রাম এখানেই শুরু হতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দেশের কর্পোরেট সেক্টর অর্থাৎ চাকুরিদাতাগণ এবং উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ অর্থাৎ মানবসম্পদ সৃষ্টিকারীগণ যৌথভাবে সিলেবাস প্রণয়ন করবেন। যুক্তরাষ্ট্রের আদলে কো-অপ শিক্ষা ধারায় গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্পোরেট সংস্থায় পালাক্রমে তাত্ত্বিক বিদ্যা অর্জন ও বাস্তবতার ভিত্তিতে এর প্রয়োগ যোগ্যতা যাচাই করা এবং ক্ষেত্র বিশেষে উভয় সংস্থার প্রয়োজনানুগ পরিবর্তনের ব্যবস্থা করা। শীতকালে এক সেমিস্টার নয় ক্রেডিটের ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য সকল ছাত্র-ছাত্রী গ্রামে কিষাণ-কিষাণীর সাথে থাকবে। তারা কৃষি কাজে, সম্পদ জরিপে, প্রযুক্তি প্রসারে, জন্ম নিবন্ধনে, স্যানিটারি পরিবেশ সচেতনতা সৃষ্টিতে, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ে জ্ঞানের আদান-প্রদান করা এবং কৃষি ভিত্তিক অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র শিল্প ইউনিট প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে।

সর্বোপরি যোগ্য সংবেদনশীল ও নীতিবান দেশপ্রেমিক শিক্ষক সৃষ্টিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিক মনোযোগ করা এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়নে জাতীয় মানদণ্ড নির্ধারণ করে তার নিরিখে সকল বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রোগ্রামকে যোগ্যতা অর্জনের স্বীকৃতিপত্রের ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই গভর্নর বলেন, বলা হয়ে থাকে, বিদ্যালয়ে ক্লাসরুমের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং উন্নত সময় ও পরিস্থিতি উপযোগী পাঠ্যপুস্তক রচনার কাজ কঠিন হলেও আয়াসসাধ্য। আর যোগ্য ও নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক সৃষ্টি ও ক্রমাগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তার হালনাগাদ করার কাজ খুবই দুরূহ হলেও অত্যাবশ্যক। সে কারণে একদিকে যেমন গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষার সর্বাধুনিক ও সর্বোচ্চ উচ্চতায় যাওয়ার বিপুল প্রয়াস নিতে হবে, তেমনি শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দের কৃপণতা পরিত্যাগ করতে হবে। শিক্ষাকে নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের শক্তিশালী বাহন হিসেবে গড়ে তোলা ছাড়া উপায় নাই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

‘ডিগ্রি অর্জন শুধুমাত্র সার্টিফিকেট অর্জন নয়, বরং শিক্ষার্থীদের সাধনা, চর্চা ও পরিশ্রমের ফসল’ মন্তব্য করে ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. কাজী শহীদুল্লাহ সমাবর্তনে বলেন, আমরা পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাস করছি। তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমাদের টিকে থাকতে হলে শিক্ষার মান উন্নত করতে হবে। শিক্ষার মান যত উন্নত হবে, অর্থনীতি তত উন্নত হবে। শিক্ষার মান উন্নত করতে হলে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে, গবেষণাখাতকে সচল করতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় যোগ্য মানবসম্পদ সৃষ্টির মাধ্যমে বৈশ্বিক ও জাতীয় সমস্যা সমাধান করতে পারে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই লক্ষ্যে ভূমিকা রাখছে। প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি তাদের অন্যতম।

তিনি আরও বলেন, শুধু জ্ঞান চর্চা করলে হবে না, জ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগ ঘটাতে হবে। যুগোপযোগী শিক্ষা দিয়ে তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ জনগোষ্ঠীতে রূপান্তর করতে না পারলে বাংলাদেশ ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের ও ২০৪১ সালে উচ্চ আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত করা কঠিন হবে।

তিনি বলেন, আমরা সহজে কোনো পরিবর্তন গ্রহণ করতে চাই না। কিন্তু সময়ের সাথে পরিবর্তণ গ্রহণ করতে না পারলে আমাদের পিছিয়ে পড়তে হবে। সমাবর্তনে ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের চাকুরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শ দিয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, চাকুরির পেছনে না ছুটে অন্যকে চাকুরি দেয়ার মত সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তাই শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হতে উদ্যোগী হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের জন্য আজ উৎসবের দিন উল্লেখ করে বক্তব্যে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানাবো একটি অ্যালামনাই এসোসিয়েশন করার। যার মাধ্যমে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো তারাও যেন অ্যালামনাই হিসেবে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরিতে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির সাথে যুক্ত থাকেন এবং ভূমিকা রাখেন। জ্ঞান সৃষ্টি এবং উচ্চ শিক্ষায় গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কেই এগিয়ে আসতে হবে মন্তব্য করে শিক্ষা উপমন্ত্রী বলেন, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অবদান রাখছে।

আবার অনেকগুলো রাখছে না। সময় এসেছে যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানসৃষ্টিতে অবদান রাখছে না, তাদের দিকে নজর দেওয়ার। যারা শুধু বাণিজ্যিক চিন্তা-ভাবনায় বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করছে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।

বেসরকারি বিশ্ববদ্যালয়কে শুধু বাণিজ্যের পথ থেকে সরে আসার তাগিদ দিয়ে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাতে শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য না করে সেজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পরপরই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ পাস করে। এ আইনটি না হলে বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গতানুগতিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে থাকতো। এখন আইনটির ফলে বাণিজ্যিক মানসিকতা অনেকটাই কমেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সমাবর্তনে ডিগ্রিপ্রাপ্ত গ্র্যাজুয়েটদের চিন্তা-চেতনায় ভিন্নতা থাকলেও দেশের স্বার্থে এক থাকার আহ্বান জানান শিক্ষা উপমন্ত্রী।

স্বাগত বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে স্মরণ করে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. অনুপম সেন বলেন, মহিউদ্দিন চৌধুরী মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ ছিলেন। শিক্ষার জন্য আজীবন নিজেকে উৎসর্গ করে গেছেন। প্রাইমারি থেকে শুরু করে অসংখ্য স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে আরো প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থী এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণ করছে।

ড. সেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষাদান করে না, নতুন জ্ঞানও সৃষ্টি করে। প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি সেই লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে।

পাশ্চাত্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে। প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিও বেসরকারি। বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও জাতীয় সংস্কৃতিতে ভূমিকা রাখতে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি উচ্চমান সম্পন্ন নাগরিক তৈরি করছে। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে জ্ঞান সৃষ্টি করতে হলে গবেষণাতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকেও প্রাধান্য দিতে হবে। সেজন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকেও এমফিল ও পিএইচডি গবেষণার সুযোগ দেয়ার দাবি জানান তিনি।

সমাবর্তন অনুষ্ঠান শেষে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সারেগামাপা খ্যাত সঙ্গীতশিল্পী নোবেল গান পরিবেশন করেন।

মেজবাহ খালেদ/চট্টগ্রাম