রকমারির দেওয়া বেস্টসেলারের তালিকায় মূলধারার কোনো সাহিত্যিকের নাম নেই। ছবি: আজকের পত্রিকা

কোনো রকম অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শেষ হয়েছে অমর একুশে বইমেলা ২০১৯। প্রতিবারের ন্যায় এবারও চার হাজারের বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে। ছিল অগণিত মানুষের ঢল। যদিও প্রকাশকরা বরাবরের মতো হতাশা ব্যক্ত করেছেন, মেলায় দর্শক উপস্থিতির তুলনায় বেচা-বিক্রি ছিল কম।

মেলার পর বেস্টসেলার বইয়ের একটি তালিকা নেট দুনিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটি রকমারির দেওয়া তালিকা। সেখানে দেখা যাচ্ছে, মূলধারার কোনো সাহিত্যিকের নাম নেই। তালিকায় যেসব বই উঠে এসেছে তার বেশিরভাগই মোটিভেশনাল স্পিচ এবং ধর্মকেন্দ্রিক বই। তালিকা দেখে মূলধারার সাহিত্যিকদের পিলে চমকে গিয়েছে। ব্যাপারটা যেন এমন হয়ে গেছে মানব রাজ্যে তেলাপোকার আধিপত্য। কিন্তু এই তালিকা মেনে না-নেওয়ারও কোনো উপায় নেই। কেননা বাংলাদেশে রকমারি ছাড়া খুব সম্ভবত আর কোনো প্রতিষ্ঠান এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করে না।

উপরন্তু একমাসব্যাপী মেলায় ক্রেতাদের ভিড় দর্শন করেও যে কেউ মোটামুটি এই সিদ্ধানেই উপনীত হতে পারবেন যে, রকমারি যা বলছে তা মোটামুটি অথেনটিক। তবে হ্যা, কাজটি যদি বাংলা একাডেমি করত তাহলে এ নিয়ে কেউ হয়তো প্রশ্নও তুলতেন না। কিন্তু বাংলা একাডেমির সেই ইচ্ছা বা সুযোগ আদৗ রয়েছে কি-না সেটা ভেবে দেখবার বিষয়। কথায় বলে, ধারণার ওপারে আকাশ নেই। অর্থাৎ দশটি ধারণা থেকে কখনো কখনো একটি সিদ্ধান্তও হয়ে যেতে পারে। ফলে আলোচনার সুবিধার্থে ধরে নিই সেরকমই একটি সিদ্ধান্ত রকমারির এই তালিকা।

গত ১৫/২০ বছর ধরে বাংলাদেশের চিন্তকদের চিন্তার আকাশে যে মেঘের ঘনঘটা ও গতি-বিধি তাতে রকমারির দেওয়া এই তালিকা সমীচিন বলেই মনে হচ্ছে। আমরা তো এমন একটা দেশই চেয়েছিলাম। হোক তা প্রকাশ্যে কিংবা নীরবে। আপনি কবি-সাহিত্যিক, আপনি চাইবেন আপনার সন্তানটি অবশ্যই পড়বে ইংলিশ মিডিয়ামে। আপনি পাপা আর আপনার স্ত্রীটি হয়ে যাবেন মম। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সপ্তাহে আপনার ক্লাস যদি থাকে চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবে খান বিশেক। আপনি সম্ভাবনাময় তরুণ শিক্ষক, বৃত্তি নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকা যাবেন তো আর ফিরে আসবেন না। আপনি আই স্পেশালিস্ট কিন্তু কখনো বেপর্দা নারীরোগীকে চিকিৎসা সেবা দেবেন না। আপনি পদার্থ বিজ্ঞানী কিন্তু আপনার রোজকার গবেষণার বিষয়বস্তু ধর্মতত্ত্ব। আপনি যদি হয়ে থাকেন সংসদ সদস্য, আপনার এলাকায় থাকবে সহস্র একর জমি, ইন্ডাস্ট্রিজ, টিভি চ্যানেলস। আপনি বাংলাদেশের নাগরিক কিন্তু আপনি নিজ দেশের ইতিহাস তোয়াক্কা তো করবেনই না বরঞ্চ মুক্তিযুদ্ধ আর মহান স্বাধীনতা নিয়ে ধুম্রজাল সৃষ্টিতে ব্যস্ত থাকবেন। নিজের দেশের পরিবর্তে সুনাম গাইবেন ইউরোপ আমেরিকার। রাজনীতির নামে কালোকে শাদা বানাবেন। ধর্মের নামে নানারকম ব্যবসা চালু জারি রাখবেন। মানুষের চোখে ধূলো দিবেন।

অন্যদিকে আপনারা দেশের মধ্যবিত্ত সোসাইটি, কবি-সাহিত্যিকদের জণ্ডিসেভোগা ‘বটতলার কবি’ অভিধা দেবেন। আর দেশের সরকার ক্রিকেটারদের প্রণোদনা দেবেন, কেননা, একমাত্র ক্রিকেটের মাধ্যমেই বহির্বিশ্বে দেশের সুনাম অর্জন করা সম্ভব। এইসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ১৮ কোটি মানুষের মতাদর্শ বা ইচ্ছা কোথায় পৌঁছাবে, অনুমমান করা যায় না কি? ফলে সময়ের আবর্তে দেশে যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তাতে মনে হয় আমাদের তারুণ্য সময় নষ্ট না করে সহজে সরাসরি মোটিভেটেড হতে চায়। তারা নিজেরা কিছু ভাবতে চায় না। কেননা তাদের চোখ-কান এবং মস্তিষ্ক জমা দেওয়া আছে অন্তর্জালে।

অন্যদিকে ধর্মীয় আবহ মানবমন বিকাশের মূলমন্ত্র হিসেবে বিবেচ্য। এই পরিস্থিতিতে সাহিত্যের আবেদন কোথায়? কিংবা সাহিত্যের প্রয়োজনইবা কী? আমরা কি এর মধ্য দিয়ে আমাদের পূর্বসূরী সাহিত্যিক-চিন্তকদের স্থানে নতুন প্রজন্মের সাহিত্যিক-চিন্তকদের জায়গা করে দিচ্ছি না? আর এই দেওয়ার মধ্য দিয়ে কি বঙ্কিম-রবিঠাকুর-জীবনানন্দ-বিভূতি-মানিক-তারাশঙ্কর-ইলিয়াসের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন না চটকদার মোটিভেশনাল স্পিকাররা? না, বলছি না, নতুন কোনো রবিঠাকুর বা জীবনানন্দ দাশ তৈরি হবেন না। অবশ্যই হবেন। কিন্তু তাঁরা হবেন গভীর বোধসম্পন্ন প্রাজ্ঞ সাহিত্যিক ও এবং তারুণ্যের রোল মডেল।

আমরা শিল্প-সাহিত্য করি বটে কিন্তু শিল্প কী তা কজনেইবা জানি। গুণীজনেরা বলেন, শিল্প হলো তাই, যা দেখে বা পড়ে পাঠক-শ্রোতার মনে আলোড়ন তোলে, বোধের দুনিয়ায় তাৎক্ষণিক দ্যোতনা সৃষ্টি করে। সেই বিচারে তালিকার ১০ নম্বরে থাকা হালের সেলিব্রেটি লেখক সাদাত হোসাইন মূলধারার সাহিত্যিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। অথচ আমরা সাদাতকে মূলধারার সাহিত্যিক হিসেবে মেনে নিতে পারছি না। যেমনটা নিইনি হুমায়ূন আহমেদকে। এখন প্রশ্ন হলো, জাতির এই নিদানকালে তথাকথিত মূলধারার কোনো সাহিত্যিক কেন এগিয়ে আসছেন না? কেন তারা দিকভ্রান্ত তরীটির হাল ধরছেন না? এখানেই হয়তো আমাদের ব্যর্থতা।

সাহিত্য ভাব জগৎ থেকে আসে বটে কিন্ত তা ভবসংক্রান্ত। আমাদের সাহিত্য তা থেকে বিচ্যুত বলেই তা ছিটকে পড়েছে। এই পরিস্থিতি সামলে উঠতে হয়তো সময় লাগবে। ১৫/২০ বছরে যদি এই পরিস্তিতির সৃষ্টি হয়ে থাকে তবে পূর্বের পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে ৩০/৪০ বছর কি লাগবে না? আমরা বরং অপেক্ষা করি নাকি যন্ত্রণাময় অপেক্ষা ভুলে গিয়ে বুকস্ ছেড়ে শুধুমাত্র ফেসবুকেই আমাদের হ্যাঙ-ওভার চলতে থাকবে?

লেখক: মহিউদ্দীন আহমেদ
নাট্যকার, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক

আজকের পত্রিকা/কেএইচআর/সিফাত