হাতে তৈরি কুটির শিল্প নিয়ে বাজারে এক ব্যবসায়ী। ছবি : সোহেল রানা।

হাতে তৈরি শিল্পকে সাধারণত বলা হয়ে থাকে কুটির শিল্প। এক সময় এই কুটির শিল্প নিয়ে দেশের মানুষের গর্ব ছিলো। কিন্তু ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প। পর্যাপ্ত অর্থের অভাব, প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব, জীবনযাত্রার মানবৃদ্ধি, মূল্যায়নের অভাব ও ন্যায্যমুল্যের অভাব থাকায় এই শিল্প বিলুপ্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এর সাথে সংশ্লিষ্ট শিল্পীরা। তাদের বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে প্রতিবেদনটি লিখেছেন লক্ষ্মীপুর সোহেল রানা।

শখ ছাড়া এখন কেউ আর হাতে তৈরি কুটির শিল্প তৈরি করেন না। বর্তমানে বাঁশ-ডুলি ও বেতের তৈরি পণ্যের আর কদর নেই বললেই চলে। সে কারণে পুরনো ঐতিহ্য হারাতে বসেছে কুটির শিল্পটি।

একটা সময় ছিলো লক্ষ্মীপুরের গ্রামীণ জনপদের মানুষ গৃহস্থালি, কৃষি ও ব্যবসা ক্ষেত্রে বেত ও বাঁশের তৈরি সরঞ্জামাদি ব্যবহার করতেন। জেলার প্রায় ৮ শতাধিক পরিবারের সহস্রাধিক নারী-পুরুষ এ পেশার সঙ্গে জড়িত থেকে জীবিকা নির্বাহ করতেন। মানুষ বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালত সবখানেই ব্যবহার করতো বাঁশ-ডুলি ও বেতের তৈরি আসবাবপত্র। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই। সময়ের বিবর্তনে বদলে গেছে অনেক কিছুই। তারপরও লক্ষ্মীপুর সদর, কমলনগর, রামগতি, রায়পুর ও রামগঞ্জ উপজেলার গুটি কয়েক মানুষ জীবন ও জীবিকার তাগিদে বাঁশ আর বেতের শিল্পকে এখনো আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।

বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে লক্ষ্মীপুরে বাঁশ-ডুলি ও বেত শিল্পের তৈরি মনকাড়া বিভিন্ন জিনিসের জায়গা দখল করেছে স্বল্প দামের প্লাস্টিক ও লোহার তৈরি পণ্য। তাই বাঁশ ও বেতের তৈরি মনকাড়া সেই পণ্যগুলো এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে।

অভাবের তাড়নায় এই শিল্পের কারিগররা দীর্ঘদিনের বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশার দিকে ছুটছেন। তবে শত অভাব অনটনের মধ্যেও হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার আজও পৈত্রিক এই পেশাটি ধরে রেখেছেন। জানা যায়, সদর উপজেলার তেওয়ারীগঞ্জ ইউনিয়ন ১০-১৫টি পরিবার ও কমলনগর, রামগতি, রায়পুর উপজেলা বেশ কয়েকটি পরিবারই বর্তমানে এই শিল্পটি ধরে রেখেছেন।

কেউ কুলা, চালুন, হাতপাখা, ডোল, কেউবা ঢালা, বেড়, খাড়ি, খলই, টোপা, খাঁচা, বুরোং, হেঙ্গা, পাইড়ে, সিলিং, দরমাসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করেন। তবে এসব পণ্যের চাহিদা বাড়ে বছরে কার্তিক-অগ্রহায়ন ও চৈত্র-বৈশাখ মাসে। তখন কাজের চাপ থাকে বেশি। তাই গভীর রাত পর্যন্তও কাজ করেন তারা। এসব তৈরি বা বুননের কাজে পুরুষের অপেক্ষা মেয়েরাই বেশি পারদর্শী হয়ে থাকেন।

পুরুষদের পাশাপাশি সংসারের কাজ শেষ করে নারী কারিগররাই বাঁশ দিয়ে এইসব পণ্য বেশি তৈরি করে থাকেন বলে জানা গেছে। তবে দিন দিন বিভিন্ন জিনিসপত্রের মূল্য যেভাবে বাড়ছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে না এই শিল্পের তৈরি বিভিন্ন পণ্যের মূল্য। যার কারণে কারিগররা জীবন সংসারে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন।

হাতে তৈরি কুটির শিল্পের পণ্য তৈরিতে ব্যস্ত এক কারিগর। ছবি : সোহেল রানা।

একটা সময় বাঁশ ও বেত থেকে তৈরি বাচ্চাদের দোলনা, পাখা, ঝাড়, টোপা, মাছ ধরার পলি, খলিশানসহ বিভিন্ন প্রকার আসবাবপত্র গ্রামাঞ্চলের সর্বত্র বিস্তার ছিলো। আগে যে বাঁশ ৫০ থেকে ১০০ টাকায় পাওয়া যেতো সেই বাঁশ বর্তমান বাজারে কিনতে হচ্ছে পাঁচশ থেকে ছয়শ টাকায়। কিন্তু সেই তুলনায় পণ্যের মূল্য বাড়েনি। নেই কোনো সরকারি সুযোগ সুবিধাও। ফলে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন এই পেশার লোকজন।

কমলনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ বাজারের কারিগর জয়নাল আবেদীন আজকের পত্রিকাকে জানান, ‘এই গ্রামের হাতে গোনা কয়েকজন লোক আজও এ কাজে নিয়োজিত আছেন। এখন মানুষ ঘরের চালের নিচে দেওয়ার জন্য ডুলির বা বাঁশের বেড়া বানিয়ে থাকেন। সকল খরচ বাদ দিয়ে প্রতিটি পণ্য থেকে ২শ টাকা করে লাভ থাকেন। এ হিসেবে প্রতিদিন ২-৩শ টাকা আয় হয়। তাই এই কম লাভ দিয়ে পরিবার চালানো কষ্টের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিন আজকের পত্রিকাকে জানান, ‘কাঁচামালের অভাব ও বেশি দামের কারণে বাঁশের তৈরি করা জিনিসপত্র বিক্রি করে ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না। এ কারণে গ্রামের অনেকেই এ পেশা থেকে সরে গেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘হাজিরহাট, তেওয়ারীগঞ্জ, উদারহাটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে টুকরী, টোপা, খাঁচাসহ বাঁশের তৈরি পণ্য ক্রয় করে এনে বিক্রি করেন। প্রতিদিন ১-৩ হাজার টাকা বিক্রি হয়। এর মধ্যে ২-২৫০ টাকা খরচ হয়। সব কিছু গিয়ে তেমন লাভ থাকে না বলে জানান।’

শাকচর ইউপি চেয়ারম্যান তাফাজ্জল হোসেন চৌধুরী টিটু আজকের পত্রিকাকে জানান, ‘কৃষি প্রধান বাংলাদেশে প্রতিটি কৃষক পরিবারের অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী হলো এইসব জিনিস। কৃষি শস্য সংরক্ষণ এবং প্রতিদিন ব্যবহার্য এসবের বিকল্প কখনোই প্লাস্টিক সামগ্রী হতে পারে না।’ পরিবেশবান্ধব এ কুটির শিল্পটিকে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ গ্রহণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

আজকের পত্রিকা/এমএআরএস/আ.স্ব/