লক্ষ্মীপুরে বটতলায় ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা

বৈশাখ মানেই বাঙালির প্রাণের উৎসব। নতুন বর্ষকে বরণের পাশাপাশি উৎসবকে পরিপূর্ণতা দেয় বৈশাখী মেলা। এই মেলা বাঙালির শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য। পহেলা বৈশাখ কেন্দ্র করে শহর-গ্রামের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয় এ মেলার। চার’শ বছর পূর্বে মোগল সরাট আকবর এর আমল থেকে বাংলা সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশে এবং পশ্চিম বাংলায় (তৎকালীন পূর্ব বাংলা) বাংলা নববর্ষ আগমন উপলক্ষে নানান উৎসবের আয়োজন চলে আসছে।

১৪ এপ্রিল দিনব্যাপী লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার টুমচর গ্রামের বটতলায় বসেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা। প্রায় দেড় শত বছরের ঐতিহ্য এ মেলাটি। প্রতিবছর এ দিনে গ্রাম বাংলার এতিহ্য ধরে রাখতে আয়োজন করা হয় মেলাটি।

মেলার দায়িত্বে থাকা লিটন হাজারী জানান, প্রায় ১ শ ৫০ বছর পূর্বে ১৩ এপ্রিল বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। মেলাটি লক্ষ্মীপুরের ঐতিহ্য রক্ষা করে আসছে। আগামীতে আরো বড় পরিসরে মেলার আয়োজন করা হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে চন্দ্রতিথি ও বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী প্রতি বছর লক্ষ্মীপুর সদরের সমসেরাবাদ, টুমচর, চন্দ্রগঞ্জ, কালিবাজার, মান্দারী, পশ্চিম লক্ষ্মীপুরে বট গাছের ছায়ার নীচে মেলে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা। তবে সারাদেশে ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ পালন করা হলেও সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা চন্দ্রতিথি এবং পঞ্জিকা অনুযায়ী পশ্চিম বঙ্গের সাথে মিল রেখে বাংলা নববর্ষ পালন ও এ মেলার আয়োজন করে থাকেন ১৫ এপ্রিল। তবে এর সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানান হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা।

লক্ষ্মীপুর পৌর শহরের সমসেরাবাদ গ্রামে রামগতি-লক্ষ্মীপুর সড়কের পাশে বটতলা’র নীচে নববর্ষকে ঘিরে ১৫ এপ্রিল আয়োজন করা হয় বৈশাখী বটতলা মেলা। এ মেলাটি সবসাধারণের মুখে গুলিয়া বাজার নামে খ্যাতি রয়েছে। আবার মাঝে মধ্যে সনাতন ধর্মাম্বীদের বিভিন্ন পূজাও দেয়া হয়।

জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শংকর কুমার মজুমদার জানান, এটি মূলতঃ ব্যবসায়ীদের নতুন বাংলা বছরের পুরাতন হিসেব নিকেস কসিয়ে নতুন বছরের নতুন খাতা অর্থাৎ হাল খাতা খোলার জন্য এ সব উৎসবের প্রচলন।

অপরদিকে বিশিষ্ঠ সাংস্কৃতিক কর্মী জাকির হোসেন ভূঁইয়া আজাদ বলেন, বাংলা সংস্কৃতিতে লালন করার জন্য হৃদয় বাঙ্গালীর শত বছর পূর্বে থেকে নতুন বছরের আগমনে এ সব মেলার আয়োজন করে আসছে। মেলায় সকল ধর্মের লোকেরাই তাদের সন্তানদের নিয়ে নারী পুরুষ মিলে মিশে ”বটতলা” মেলার উৎসবে শামিল হয়। এক সময় গ্রামীণ বৈশাখী মেলা ছিল। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে বৈশাখী মেলা গ্রামের গ-ি পেরিয়ে শহুরে সংস্কৃতিতে স্থান করে নেয়।

সেই সঙ্গে মেলায় আসে কিছু পরিবর্তন। শহরের মানুষের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সহজলভ্য। সেগুলো কেনার জন্য তাদের মেলার উপর নির্ভর করে থাকতে হয় না। তাই শহুরে বৈশাখী মেলাটা হয়ে উঠলো অনেকটাই বিনোদননির্ভর। মেলাকে ঘিরে বিক্রী হয়, মাটির তৈরী বিভিন্ন তৈষজ পত্র হাতি ঘোড়া, বাঘ-ভল্লুক, টিয়া, ময়না, আম,তাল, মাটির ব্যাংক, ফুলদানি, বাঁশ ও কাঠের তৈরী আসবাব পত্র, লোহা লক্কড়ের আরো কত অনেক কিছু। সুলভ মূল্যে পাওয়া যায় সবই। শহুরে মানুষের ব্যস্ততা ও ক্লান্তির ফাঁকে একটুখানি আনন্দ পাওয়ার সুযোগ এনে দিলো এই মেলা।

শহুরে বৈশাখী মেলায় তাই খেলনা, চুড়ি, বাঁশি, বেলুন- সব পাওয়া গেলেও শাকসবজি পাওয়া যায় না। এই মেলা শুধুই আনন্দের স্থান, ক্লান্তি কাটিয়ে নিজেকে চাঙা করে তোলার স্থান।

মো: সোহেল রানা/লক্ষ্মীপুর