ব্যয়ের সর্বোচ্চ রেকর্ড রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প । ছবি : সংগৃহীত

অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে রেলওয়ে এবার প্রতি কিলোমিটারে খরচ ধরা হয়েছে ৭১ কোটি টাকা। যা পার্শ্ববর্তী যে কোনো প্রকল্পের চেয়ে ১০ থেকে ১২ গুণ বেশি। রেলওয়ের একটি সূত্র জানায়, বর্তমানে ৩টি ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ চলমান। তার মধ্যে রয়েছে ঈশ্বরদী থেকে পাবনার ঢালারচর পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এ রুটের মোট দৈর্ঘ্য ৭৮ দশমিক ৮০ কিলোমিটার। ফলে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় পড়ছে মাত্র ৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

মধুখালী থেকে কামারখালী হয়ে মাগুরা শহর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প চলমান আছে। ৩৩৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা ব্যয়ে এ রুটের মোট দৈর্ঘ্য ২৩ দশমিক ৯০ কিলোমিটার। ফলে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় পড়ছে ১৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এ ছাড়া ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে বিদ্যমান মিটার গেজ রেললাইনের সমান্তরাল ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ’ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে ১৮৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে। এ রুটের দৈর্ঘ্য ২১ দশমিক ৫৩ কিলোমিটার। ফলে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় হয়েছে মাত্র ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

অথচ আখাউড়া-সিলেট প্রকল্পের ব্যয় সমজাতীয় প্রকল্পের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এ প্রকল্পের আওতায় ২৩৯ দশমিক ১৪ কিলোমিটার ট্র্যাক নির্মাণ করা হবে। এরমধ্যে ১৭৬ দশমিক ২৪ কিলোমিটার মেইন লাইন এবং ৬২ দশমিক ৯০ কিলোমিটার লুপ লাইন। ৪৯টি মেজর ব্রিজ, ২২টি সিগন্যালিং স্টেশন, ২০০ একর ভূমি অধিগ্রহণ, ১৭ হাজার বর্গ মিটার আবাসিক ভবন, ব্যারাক ও ডরমেটরির কাজ করা হবে।

ডুয়েল গেজ রেললাইনে একটি ইঞ্জিন। ছবি : সংগৃহীত

এমন কি উপমহাদেশের রেলপথ নির্মাণ ব্যয়ের ইতিহাসে এটি সর্বোচ্চ। অকল্পনীয় এ ব্যয়ের দায় নেবেন না রেলমন্ত্রী। আর রেলওয়ের মহাপরিচালক বলছেন, ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ না। রেলপথ নির্মাণ জরুরি। দায়িত্বশীলদের এমন মন্তব্যে হতাশ বিশেষজ্ঞরা। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর আগে রেল মন্ত্রণালয় প্রস্তাবিত ‘আখাউড়া থেকে সিলেট সেকশনের মিটার গেজ রেললাইনকে ডুয়েল গেজে রূপান্তর’ প্রকল্পটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। অতি খরচ বলে দীর্ঘদিন ফাইলবন্দি ছিল।

অবশেষে গত ৯ এপ্রিল একনেক বৈঠকে ১৬ হাজার ১০৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকার প্রকল্পটি পাস হয়। এ প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।

প্রকল্পটি পাস হওয়ার পর সংসদে এর ব্যাখ্যা চেয়েছেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম। তিনি বলেছেন, যেখানে ভারতে প্রতি কিলোমিটার রেলপথ (সমতলে) ৪-৫ কোটি, পাকিস্তানে ৫-৭ কোটি খরচ হয় সেখানে আমাদের দেশে বিদেশি ঋণ নিয়ে এক কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ৭১ কোটি টাকারও বেশি খরচ কিভাবে সম্ভব? এ ধরনের অস্বাভাবিক খরচের প্রকল্পগুলো মনিটরিং করতে তিনি রেলমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

ব্যয়ের সর্বোচ্চ রেকর্ড রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প । ছবি : সংগৃহীত

এ বিষয়ে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেয়ার আগেই প্রকল্পটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় এবং টিপিপি/ ডিপিপি তৈরি হয়। সে কারণে এ বিষয়ে আমি বিশেষ কিছু জানি না। তবে আমি যখন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে এসেছি, এখন আর কোনো প্রকার দুর্নীতি হতে দেব না।

এ বিষয়ে রেলপথ সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী বলেন, ‘স্থায়ী কমিটির সভায় তোলা হলেও ডিজি না থাকায় প্রকল্পটির বিষয়ে মন্ত্রী সবিস্তর জানাতে পারেননি।

রেলওয়ের মহাপরিচালক কাজী মো. রফিকুল আলম বলেন, এ প্রকল্পটি নিয়ে চায়না এবং আমরা বেশ কয়েকবার বৈঠক করি, এলাকা পরিদর্শন করে নির্ধারিত করেছি। সরকার যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছে সেভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে গেলে প্রতি কিলোমিটার ৭০-৭১ কোটি টাকা খরচ হবে’।

এ বিষয়ে তেল, গ্যাস, বন্দর, বিদ্যুৎ, রেল রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব প্রফেসর আনু মোহম্মদ বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার লুটপাট করে যাচ্ছে। এটা দীর্ঘদিনের অভিযোগ। এখানে যারা প্রকল্প পরিকল্পনা করে, তারাই বাস্তবায়ন করে’।

আজকের পত্রিকা/আর.বি/