হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ছবি: সংগৃহীত

সাবেক রাষ্ট্রপতি, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ইন্তেকাল করেছেন। ১৪ জুলাই রবিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। ৯০ বছর বয়সী এরশাদ রক্তে সংক্রমণসহ লিভার জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ২২ জুন সিএমএইচে ভর্তি করা হয় তাকে। এর আগেও তিনি একাধিকবার দেশ-বিদেশে চিকিৎসা নেন।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ- বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক অদ্ভুত রহস্যময় চরিত্র, অনেকক্ষেত্রে ঘৃণিতও। রাজনীতির মতো সিরিয়াস একটি ফিল্ডে একজন সাবেক রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে এত হাস্যরসাত্মক কৌতুকের সৃষ্টি এর আগে বাংলাদেশে কখনো হয়েছে বলে জানা নেই। এরশাদ মানেই যেন হাসির পাত্র! অথচ তাঁর ছিল দীর্ঘ এক বর্ণাঢ্য জীবন।

সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত…রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো অলঙ্কিত না কলঙ্কিত করেছিলেন এরশাদ, সেসব বিচার-বিশ্লেষণ হয়তো তাঁর মৃত্যুর পর খুব নগণ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা ছাড়াও আরও বেশ কিছু অবদান তিনি রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় রেখেছেন। জেনে নেওয়া যাক রাষ্ট্রপতি এরশাদের ধর্মীয় অবদান সম্পর্কে-

ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশকে নতুন পরিচয়ে আত্ম-প্রকাশ করেছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ। দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে স্থান করে দিয়েছিলেন তাঁর শাসনামলে। এরশাদের আমলে বাংলাদেশে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার বিষয়টি খুব সহজ ছিলো না। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে যে সংবিধান রচিত হয়েছিল, সেখানে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ‘ইসলাম’ উল্লেখ ছিলো না।

মূলত এরশাদের একক ভূমিকাতেই ১৯৮৮ সালের ৫ জুন ৪র্থ জাতীয় সংসদে ৮ম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। ওই সংশোধনীতে সংবিধানের ২ নম্বর অনুচ্ছেদের ২-এর (ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়- ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে অন্যান্য ধর্মও প্রজাতন্ত্রে শান্তিতে পালন করা যাইবে।’

৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে স্বীকৃতি পাওয়া ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ আজও বিদ্যমান। যা প্রয়াত সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অবদান। ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণার মাধ্যমে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিমদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার পর ওই বছরই এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ‘স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটির পক্ষে কয়েকজন নাগরিক রিট আবেদন করেন। দীর্ঘদিন মামলাটি আদালতে বিভিন্ন উত্তাপ ছড়ালেও ২০১৬ সালের ২৮ মার্চ মহামান্য আদালত রিটটি খারিজ করে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাখেন।

ঐতিহাসিক এ রায়ে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ধর্মীয় আবেগের প্রতি লক্ষ রাখা হয়েছে। তাই দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মহামান্য আদালতের এ রায়কে সশ্রদ্ধ স্বাগত জানিয়েছে। ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার সিদ্ধান্ত দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চাহিদার ভিত্তিতেই নিতে হয়েছিল।

২০১৬ সালে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ সংসদীয় কমিটির সঙ্গে এক বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের জানিয়েছেলেন, তাঁর দল সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে বাদ দিতে চায় না। গণভবনে ওই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে থাকবে, এবং তার দল আওয়ামী লীগ সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম বা বিসমিল্লাহির রাহমানির রহিম বাদ দিতে চায় না। সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুসারে এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম।

এছাড়া স্বাধীনতার পর থেকে দেশের সাপ্তাহিক ছুটি ছিল রবিবার। মুসলমানদের বিশেষ ইবাদতের দিন শুক্রবারে কোনো ছুটি ছিলো না। যার কারণে জুমার নামাজে ভোগান্তিতে পড়তে হতো কর্মজীবিদের। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের উদ্যোগেই সাপ্তাহিক ছুটি রবিবারের পরিবর্তে শুক্রবার করা হয়।

রেডিও-টেলিভিশনে নামাজের আগে আজান সম্প্রচারের কোনো ব্যবস্থা বাংলাদেশে ছিলো না। এরশাদের নির্দেশেই রেডিও এবং টেলিভিশনে সর্বপ্রথম আজান সম্প্রচার চালু হয়েছিল। সে ধারাবাহিকতায় এখনও নামাজের আগে দেশের রাষ্ট্রীয় রেডিও-টেলিভিশনে আজান দেয়া হয়।

দেশের সর্বসাধারণের ধর্মীয় আবেগের প্রতি সম্মান জানিয়ে মসজিদ-মন্দিরের পানি ও বিদ্যুৎ বিল মওফুক করা ছিল এরশাদের অন্যতম জনপ্রিয় পদক্ষেপ। ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোর বিদ্যুৎ ও পানির বিল রাষ্ট্রীয়ভাবে বহন করার সিদ্ধান্ত এরশাদকে হিন্দু-মুসলিম সবার কাছেই জনপ্রিয় করে তোলে।

এছাড়া ইবতেদায়ী মাদ্রাসার স্বীকৃতি, সরকারি যাকাত বোর্ড ও যাকাত তহবিল গঠন, আলীয়া মাদ্রাসাগুলো এমপিও ভুক্ত করা ছাড়াও ইসলাম ও মুসলমানদের খেদমতে নানা অবদান রেখেছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

আজকের পত্রিকা/সিফাত