প্রেমিক পুরুষ এরশাদ এবং তার প্রেমিকারা। ছবি : সংগৃহীত

সাবেক রাষ্ট্রপতি ও স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জীবন রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো না। কঠোর রাজনীতি জীবনের বাইরে তার ছিলো এক প্রেমিক মন। যে প্রেমিক মন রোমান্টিকতায় ভরপুর ছিলো। সেই রোমান্টিকতা থেকে তিনি কাব্য চর্চাও করেছেন অনেক। প্রেমিক মনে আঘাত পেয়েছেন, তবু বারবার ফিরে গিয়েছেন ভালোবাসার কাছে।

‘আমার যৌবন আর বেশি দিন নেই। কয়েক বছর পর আমি মধ্যবয়স্ক হয়ে যাব। তাই যতদিন পারি, এই ক্ষণস্থায়ী যৌবনকে উপভোগ করতে চাই।’ কথাগুলো যুক্তরাজ্যে গিয়ে বলেছিলেন ৮২ বছর বয়সের সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। তাঁর এমন বক্তব্য থেকে বুঝা যায় কতটা ‘রোমান্টিক’ও ‘প্রেমিক পুরুষ’ তিনি।

২৬ বছর বয়সী সেনা কর্মকর্তা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৫৬ সালে বিয়ে করেছিলেন কিশোরী রওশনকে। কিশোরীর ডাকনাম ডেইজি। বয়স মাত্র ১৩।

রওশন এরশাদের সঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। ছবি : সংগৃহীত

বিবাহ পরবর্তীকালে দূরে থাকা স্ত্রীকে প্রচুর চিঠি লেখার অভ্যাস ছিলো তার। সেসব চিঠি ছিলো প্রেমের রোমাঞ্চে ভরা। যেন এরশাদ এক রোমিও, তার জুলিয়েটের জন্যে লিখে যাচ্ছে প্রেমগীতি। চিঠিতে তিনি স্ত্রীকে ডাকতেন, ‘হৃদয়ের রানী’, ‘হৃদয়ের ধন’, ‘ওগো মোর জীবন সাথী’, ‘খুশি বউ’, ‘খুশি পাগলী’, ‘সোনা বউ’, ‘খুকু বউ’, ‘ওগো দুষ্টু মেয়ে’, ‘নটি গার্ল’, ‘বিরহিনী’ সহ কত মধুর মধুর নামে। এসব জানলে বোঝা মুশকিল সে আসলে একজন সেনা কর্মকতা নাকি শুধুই প্রেমিক পুরুষ।

এরশাদ চিঠি লেখেন স্ত্রীর কাছে। মধুর মধুর সব সম্বোধনে। চিঠির শেষে নিজের পরিচয়ে লেখেন- ‘পেয়ারা পাগল সাথী’, ‘বড্ড একাকী একজন’, ‘প্রেম-পূজারি’, আমি ‘বিরহী’!

ভারী ভারী ক্ষমতার ওজনকে ছাপিয়ে এরশাদ হয়ে উঠেছিলেন একজন প্রেমিক এবং কবি। শুধু প্রেমিক বললে ভুল হবে এরশাদকে বহুগামী প্রেমিকও বলা যায়।

মেয়েদের সঙ্গে অতি ঘনিষ্ঠ প্রেম নিয়ে এরশাদ নিজেই বলেছেন– ‘আমি কোন মেয়ের কাছে যাই না। মেয়েরাই আমার নিকট আসে। মূলত: আমার চেহারা আর অভিব্যক্তির মধ্যেই এক ধরনের প্রেমিক প্রেমিক ভাব আছে’।

এরশাদ ১৯৯৭ সালে জেল থেকে বের হওয়ার পর সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমি একজনকে ভালোবাসতাম।’ সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, ‘তিনি কি জিনাত মোশাররফ?’ জবাবে এরশাদ বলেন, ‘অফকোর্স, তোমরা আমার ছেলের মত। তার নামটা লিখো না প্লিজ!’

জিনাতের সঙ্গে এরশাদের পরকীয়া কাহিনী ছিলেন অনেকের মুখে মুখে। তার নামের সঙ্গে মিল রেখে জিনাত মোশাররফ নতুন নাম গ্রহণ করেছিলেন জিনাত হুসেইন। তার সঙ্গে পরকীয়া নিয়ে দৈনিক সংবাদের সাংবাদিক রাশেদ আহমদের কাছে খোলামেলা সাক্ষাৎকার দেন এরশাদ। এতে ঘর ভাঙ্গে জিনাতের। ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় সাবেক মন্ত্রী মোশারফের সঙ্গে। আওয়ামীলীগ ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করলে এরশাদের ইচ্ছায় সংরক্ষিত আসনে মহিলা সংসদ সদস্য হন জিনাত। জিনাত মোশাররফ বর্তমানে স্থায়ীভাবে লন্ডনে বসবাস করছেন। এরশাদের সাথে এখন আর তার যোগাযোগ নেই।

কণ্ঠশিল্পী শাকিলা জাফর বা শাকিলা শর্মা ছিলেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আরেকজন আলোচিত প্রেমিকা। ক্ষমতায় থাকাকালে একপর্যায়ে বিটিভির পর্দা দখলে থাকত তার। এরশাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান শুরু হত তার গান দিয়ে। ১৯৮৩ সালে বিটিভির ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানে ‘তুলা রাশির মেয়ে’ গানটির মাধ্যমে শাকিলার পরিচিতি ঘটে দর্শক, শ্রোতাদের সঙ্গে। এরশাদ সরকারের পতনের পর তিনি বেশ কয়েকবছর আত্মগোপনে ছিলেন। শাকিলা শর্মা প্রথমে মান্না জাফরকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তার নামের সাথে “জাফর” যুক্ত হয়।

শাকিলা জাফরের সঙ্গেও প্রেম ছিলো এরশাদের। ছবি : সংগৃহীত

সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামালের মেয়ে নাশিদ কামাল ছিলো এরশাদের আরেক প্রেমিকা। এরশাদের সাথে সম্পর্কের অবনতির পর ক্যাপ্টেন মুসাকে বিয়ে করেন তিনি। তবে বিয়েটি টেকেনি। মুসা ও নাশিদ কামালের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। নর্থ সাউথ ইউনির্ভিসিটিতে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি টিভি উপস্থাপিকা হিসেবেও কাজ করেন।

নাশিদ কামাল। ছবি : সংগৃহীত

এরশাদের প্রেমজীবন ছিলো ব্যাপক বিস্তৃত ও আলোচিত। লন্ডনের সুন্দরী মেরির সঙ্গেও তার প্রেম ছিলো। ২০১৫ সালে এক সন্তানের জননী মেরি লন্ডনে মারা গেছেন। ক্ষমতাসীন থাকার সময় ১৯৮৬ সালে তৎকালীন জনপ্রিয় সাপ্তাহিক পত্রিকা যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান তার সাপ্তাহিকের মাধ্যমে এরশাদের মেরিকে বিয়ে করার বিষয়টি সবিস্তারে সামনে নিয়ে আসেন। তাদের বিয়ের তথ্য প্রমাণসহ প্রকাশিত সংবাদের কারণে সাংবাদিক শফিক রেহমানকে প্রায় চার মাস জেলও খাটতে হয়েছিলো।

এছাড়া প্রয়াত চিত্রনায়ক সালমান শাহ’র মা নীলা চৌধুরীও ছিলেন এরশাদের আলোচিত পরকীয়ার তালিকায় ছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

সমবয়সী শিক্ষক আবুবকর সিদ্দিকের মেয়ে বিদিশাকে প্রেম করে বিয়ে করেন এরশাদ। অবশ্য বিদিশার সঙ্গেও তার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। বিভিন্ন আলোচনা সমালোচনার মধ্যে দিয়ে বিদিশার সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়। সেসময় এমন অভিযোগ উঠে যে দুই বউকে কাজে লাগিয়ে এরশাদ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। রওশন রাখছিলেন ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে, আর বিদিশা রাখছিলেন তখনকার জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে। বিদিশা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে লন্ডনে বৈঠকও করেন। এরপর বিএনপি সরকার থেকে এরশাদকে চাপ দেয়া হয়, তার দ্বিতীয় বউ বিদিশাকে তালাক দিতে।

এরশাদের দ্বিতীয় স্ত্রী বিদিশা। ছবি : সংগৃহীত

তখন এরশাদের দেয়া চুরির মামলায় জেলে যান বিদিশা, মুক্তিও পান। গত ১০ বছর ধরে দেশে অবস্থান করছেন তিনি। এরশাদের সঙ্গে দাম্পত্য জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘শত্রুব সঙ্গে বসবাস’ নামে একটা বইও লিখেছেন বিদিশা। এছাড়ার ‘স্বৈরাচারের প্রেমপত্র’ নামেও তার একটি বই রয়েছে।

বিদিশার লেখা বই। ছবি : সংগৃহীত

এসবের মাঝে গত বছর দুই আগে আবারো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ক্যান্ডালে জড়ান এরশাদ। সাথী নামের এক আইনজীবীর সাথে ৮৮ বছর বয়সী এরশাদের ঘনিষ্ট ছবি ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুক টুইটারে। অনেকে মন্তব্য করেন সাথী এরশাদের নতুন বান্ধবী। তবে নিজের প্রথম প্রেমিকার কথা এরশাদ নিজেই প্রকাশ করেন!

প্রথম প্রেমিকার কথা জানাতে গিয়ে আত্মজীবনীতে ‘সেই চিঠি: ভালো লাগার প্রথম অনুভূতি’ অধ্যায়ে এরশাদ বলেছেন, ওই সময় রংপুরের কারমাইকেল কলেজে বিএ শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি। তার নিজের ভাষায়, ‘আমার নিচের ক্লাসের একটি মেয়ে একদিন আমাকে একটি চিঠি লেখে। প্রতিদিন ও ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে কলেজে আসত’।

এরশাদ জানিয়েছেন, প্রায় ৬৬ বছর আগের সেই সময়ে ছেলেমেয়ের মধ্যে কথা বলার রেওয়াজ ছিল না। চিঠির আদান-প্রদান ছিলো অনেক দূরের ব্যাপার। বই দেওয়া-নেওয়া চলত। এরশাদের প্রথম প্রেমিকা চিঠিটি বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে দিয়েছিলেন। সাধারণ খামে করে দেওয়া চিঠির ভাঁজে ভাঁজে ছড়ানো ছিলো গোলাপের পাঁপড়ি ও বকুল ফুল। এরশাদ লিখেছেন, ‘তরুণ বয়সে কোনো মেয়ের কাছ থেকে চিঠি পেলে হৃদয়ে যে কিরকম অনুভূতি ঢেউ খেলে যেতে পারে, তা কেবল ওই সৌভাগ্যের মুহূর্তটি যাদের জীবনে এসেছে, তারাই অনুভব করতে পারেন, অন্যেরা নয়।’

এছাড়া তৎকালীন সময়ে এফডিসির অনেক চিত্রনায়িকার সঙ্গেও তার প্রেম ছিলো বলে ধারণা করে অনেকে। এসবের মাঝে অনেক সত্য মিথ্যা থাকতে পারে। সবকিছুর ইতি টেনে দেখলে দেখা যায়, জীবদ্দশায় এরশাদ ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবন ছিলো আলোচিত এবং সমালোচিত যা বহু মানুষের কাছে আগ্রহের বিষয় হয়ে থাকবে।

আজকের পত্রিকা/কেএইচআর/