এমপি মিলন।

সাবেক সংসদ কলিম উদ্দিন মিলন এর বিরুদ্ধে রাজউকে ফ্ল্যাট বিক্রির নামে একাধিক ব্যাক্তির কাছ থেকে অর্থ আত্মসাত এর অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগে জানা যায়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এ ফ্ল্যাট দেয়ার নামে যুক্তরাজ্য এক প্রবাসীর সাথে প্রতারণা করেন  বিএনপি-জামাত সরকারের সাবেক এমপি কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন।

২০০৩ সালে ওই প্রবাসীর কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা নিয়ে তিনি ফ্ল্যাট দেবেন তো দূরের কথা ১৬ বছর ধরে তার টাকাও ফেরত দিচ্ছেন না। বরং রাজউক থেকে প্লট পাওয়ার পর অন্যত্র তা বিক্রি করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন ওই প্রবাসী।

এ নিয়ে ঢাকা ও সুনামগঞ্জে কয়েকবার সালিশ বৈঠকে মিলন টাকা ফেরতের অঙ্গিকার করেন; তবে তিনি তা রক্ষা করেননি। মিলন বর্তমানে সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি।

সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার গোবিন্দনগর গ্রামের যুক্তরাজ্য প্রবাসী আছাব আলী (মোহাম্মদ ইয়াছিন) বলেন, ১৯৯৮ সালে দেশে আসলে এক আত্মীয়র বাড়িতে মিলনের সাথে তার পরিচয় হয়। এরপর থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে অনেকটা ঘনিষ্টতা অর্জন করেন মিলন।

২০০১ সালের নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক-দোয়ারা) আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর সুবিধা অনুযায়ী রাজউক তার নামে একটি প্লট বরাদ্ধের ব্যবস্থা করে।

খবর পেয়ে ২০০৩ সালে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত আছাব আলীকে ফোন করে মিলন বলেন, তার কাছে কোনো টাকা নেই। রাজউক প্লটের জন্য ২৫ লাখ টাকার প্রয়োজন। তিনি এ টাকা দিলে ডেভেলপারের মাধ্যমে বিল্ডিং নির্মাণ করবেন। আর সেই বিল্ডিংয়ে অংশীদারিত্ব হিসেবে তাকে দুইটি ফ্ল্যাট এবং ২০ লাখ টাকা দেয়া হবে।

এ কথা শোনে আছাব আলী সরল বিশ্বাসে মিলনের জন্য ২৫ লাখ টাকা পাঠিয়ে দেন। এর বছরখানেক পরে তিনি দেশে আসলে উভয় পক্ষের মধ্যে তিনশ টাকার স্ট্যাম্পে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর থেকে মিলন তার নামে রাজউক প্লটের দলিল রেজিস্ট্রি করে দিচ্ছেনা বলে টালবাহানা শুরু করেন। এভাবে আরো প্রায় আট বছর চলে যায়।

২০১২ সালে আছাব আলী দেশে এসে জানতে পারেন ইচ্ছে করেই তিনি প্লটটি রেজিস্ট্রি করছেন না। একপর্যায়ে তিনি মিলনের সাথে বৈঠকে বসে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চান। জবাবে মিলন বলেন, ‘আ’লীগ সরকার এজন্য কাজ হচ্ছেনা।’ পরে আছাব আলী ছাতক বাড়বাড়ি এলাকার মুরুব্বী আরজ মিয়া চৌধুরীর কাছে বিচারপ্রার্থী হলে মিলনের চাচাতো ভাই মনির উদ্দিনের বাসায় এক বৈঠক হয়।

এসময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন একই এলাকার আঙ্গুর মিয়া (বর্তমানে আমেরিকায়), গোবিন্দনগর গ্রামের মুজিবুর রহমান, সিরাজ মিয়াসহ আরো কয়েকজন। এ বৈঠকে মিলন ছয় মাসের মধ্যে নগদ টাকা ও ফ্ল্যাট দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। তবে সেই প্রতিশ্রুতি তিনি রক্ষা করেননি।

এরপর থেকে বিষয়টি সমাধানের জন্য আছাব আলী একাধিকবার দেশে এলেও মিলন শুধু আশ্বাসই দিয়ে যান। এরইমধ্যে ছাতক উপজেলা বিএনপির সভাপতি (বর্তমানে মৃত) মোস্তাক আহমদের উদ্যোগে যুক্তরাজ্য প্রবাসী জুনেদুর রহমানের বাসায় একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন নজির আহমদ (বর্তমানে মৃত), মিলনের বন্ধু সুয়েব আহমদ, মেম্বার নুর আলম, সিরাজ মিয়া, শামীম আলম, মিলনের মামা বকুল মাস্টার প্রমূখ।

তারা সবাই বিষয়টি যাতে আর দীর্ঘ না হয় সেজন্য সিদ্ধান্ত নেন আছাব আলীকে দ্বিতীয় তলায় একটি ফ্ল্যাট ও নগদ ২০ লাখ টাকা দেয়া হবে। মিলনও তাকে এ সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার অনুরোধ করেন। মুরুব্বীদের এ সিদ্ধান্ত আছাব আলী মেনে নিলেও মিলন সেই আগের মতোই। ফলে নিরূপয় হয়ে মিলনের ‘ভাওতাবাজীর’ কাহিনী আছাব আলী ঢাকায় বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনকে অবগত করেন। তার কাছেও মিলন বিষয়টি দ্রুত সমাধান করার আশ্বাস দিয়েও করেননি। ২০১৮ সালে আছাব আলী আরো একবার দেশে এসে মিলনের সাথে সাক্ষাত করেন।

এপর্যায়ে ছাতকের সুহিতপুর গ্রামের বিএনপি নেতা রুহুল আমিন আছাব আলীকে জানান, তাকে সম্মান দেখিয়ে আরো ক’দিন সময় দেয়ার জন্য। সবশেষে মিলনের ছলচাতুরিতে রুহুলও ব্যর্থ হন বিষয়টি সমাধানে।

এদিকে, ২০১৮ সালের শেষের দিকে আছাব আলী জানতে পারেন কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন তার সাথে সম্পূর্ণ প্রতারণা করেছেন। কারণ সরকার তাকে প্লট রেজিষ্ট্রি করে দিচ্ছেনা এটি সঠিক নয়। তার নামে প্লট রেজিষ্ট্রি হয় এবং তা পরে তিনি বিক্রিও করে দেন। রাজউক উত্তরা জোনাল অফিসের উপ-পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি)-২ এর কার্যালয়ের (তাং-০৪/০১/২০১৬ ইং) এক চিঠি থেকে জানা যায়, মিলনকে সম্প্রসারিত উত্তরা (৩য়) পর্ব আবাসিক এলাকার ১৬/সি নং সেক্টরের ০৩/এ সড়কের ৫ কাঠা আয়তনের ৮ নম্বর প্লটটি দেয়া হয়। প্লট পাওয়ার পরে তিনি ডা: মো: মাহফুজুর রহমান নামের একজনকে আম-মোক্তার নিযুক্ত করেন। এরপর ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর মিলনের পক্ষ থেকে অন্য একজনের নামে প্লটটির দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করার জন্য রাজউকে আবেদন করা হয়।

আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ৪ জানুয়ারি চাঁদপুর সদরের পালপাড়া হরদয়াল রোডের শুভাশীষ কুমার পালের নামে তা রেজিস্ট্রি করার অনুমতি দেয় রাজউক।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে উল্লেখিত দুই বৈঠকে উপস্থিত মুরুব্বী সিরাজ মিয়া বলেন, ‘কয়েক বছর আগে আমরা অনেকেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম। সেখানে মিলন সাহেব বলেছিলেন আছাব আলী সাহেবের সাথে তার ব্যবসায়ীক লেনদেন আছে এবং উত্তরায় ভবন নির্মাণের পর দু’তলায় একটি ফ্ল্যাট দেবেন। তবে এখন কি হয়েছে আ জানি না।’

যোগাযোগ করা হলে কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘আছাব আলী সাহেবের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক। এখনও যোগাযোগ আছে। আমি তাকে টাকা ফেরত দিয়েছি। তিনি আরও টাকা দাবি করেছেন। আমি তাও দেবো।’ এতো বছর ধরে প্রবাসীকে ঘুরানোর কারণ সম্পর্কে মিলন বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো যাচ্ছে না। তাই এমনটি হচ্ছে।’