“রূপ যদি চাও যাওনা কেন মাছরাঙার কাছে,
অমন খাসা রঙের বাহার আর কি কারো আছে?”

বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক সুকুমার রায়ের কবিতায় মাছরাঙার চিরায়ত রূপ ও রঙের অসাধারণ প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। আসলেই রঙের বৈচিত্র্যময়তায় বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর ও পরিচিত পাখি মাছরাঙা। এর শরীরের বিভিন্ন রঙের বৈচিত্র্য পাখিপ্রেমীসহ সবাইকে মুগ্ধ করে রাখে।

নির্জন দুপুরে পুকুর কিংবা কোন জলাশয়ের আশেপাশে ছোট গাছের চিকন ডাল বা বাঁশের খুঁটির উপর স্থির অপেক্ষায় থাকে চোখ ধাধানো উজ্জ্বল রঙের মাছরাঙা।

জলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে যখন শিকারের আশায় চুপ করে বসে থাকে তখন দূর থেকে দেখে মনে হয় শিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা কোনো চিত্রকর্ম।

পানির নিচে শিকার দেখার জন্য মাছরাঙার চোখ বিশেষভাবে অভিযোজিত। এই বিশেষ ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে মাছের অবস্থান টের পাওয়ার সাথে সাথে তীর গতিতে পানির নিচে মাছের উপর মাথা নিচু করে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মাছ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাছরাঙা তাকে ধরে ফেলে।

কিছুক্ষণ পর দেখা যায় পাখিটার ঠোঁটের ফাঁকে ছোট্ট একটি মাছ ঝটপট করছে। এরপর কয়েকবার আছাড় মারে তারপর শূন্যে ছুড়ে দিয়ে মাথার দিক থেকে গিলে ফেলে। এরা অনেক ধরনের প্রাণী শিকার করে, তবে তার বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে মাছ। অন্যান্য শিকারের মধ্যে রয়েছে পোকামাকড়, ব্যাঙ, সরীসৃপ, ইত্যাদি। এখনো গ্রামবাংলায় অসাধারণ সুন্দর মাছরাঙার বুদ্ধিদীপ্ত এমন শিকারের দৃশ্য দেখা যায়।

সারা পৃথিবীতে প্রায় ৯০ প্রজাতির মাছরাঙা দেখা যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১২ প্রজাতির মাছরাঙ্গার অস্তিত্ব রয়েছে। যেমনঃ- ছোট নীল মাছরাঙা, সাদা বুক মাছরাঙা, লাল মাছরাঙা, ছিট/পাকড়া মাছরাঙা, মেঘ হও মাছরাঙা, সবুজ মাছরাঙা, কালো মাছরাঙা, বাদামী মাছরাঙা, দারুচিনি মাছরাঙা, নীল কানের মাছরাঙা, সাদা গলা মাছরাঙা, বুনো মাছরাঙা। এদের প্রায় সবারই দেহের তুলনায় মাথা বড়, লম্বা, ধারালো ও চোখা চঞ্চু, খাটো পা ও খাটো লেজ রয়েছে। বেশিরভাগ মাছরাঙার দেহ উজ্জ্বল রঙের আর স্ত্রী-পুরুষে সামান্য ভিন্নতা দেখা যায়।

মাছরাঙা সাধারণত জলের ধারে ও বনে বসবাস করে। মাটির ঢালে, উইয়ের ঢিবিতে অন্য পাখির খোঁড়া গর্ত, কিংবা গাছের পঁচা-গুড়ির ফোকরো বাসা করতে ভালোবাসে এরা। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি উভয়েই ঠোঁট দিয়ে মাটি বা পচা কাঠ আলগা করে গর্ত খোঁড়ে এবং পায়ের সাহায্যে মাটি বা কাঠের গুঁড়া গর্তের বাইরে ছুঁড়ে ফেলে বাসা তৈরি করে থাকে।

এদের প্রজনন মৌসুম শুরু হয় বর্ষার শেষে কিংবা শরৎকালে। এসময় এরা জোড় বেঁধে একত্রে থাকে। এরা একসাথে ৫ থেকে ৭ টি ডিম পাড়ে। ডিমগুলো দেখতে চকচকে সাদা। বাবা ও মা পাখি উভয়ই ডিমগুলিতে দিনের বেলা তা দেয়। তবে রাতের বেলায় শুধু মা পাখি ডিমগুলিতে তা দেয়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে ১৯ থেকে ২০ দিন সময় লাগে। বাচ্চারা আরো ২৪ থেকে ২৫ দিন বাসায় থাকে। বাসা তৈরি থেকে বাচ্চার যত্ন নেয়া পর্যন্ত সব কাজই বাবা-মা মিলে করে।

গ্রিক পুরাণের সেই কিংবদন্তী হ্যালসিওন পাখি বা মাছরাঙা বৈশ্বিকভাবে বিপদগ্রস্ত বলে বিবেচিত। বন উজাড় করার ফলে বনের মাছরাঙাগুলোর আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আগের দিনে বিল, হাওর বা বাওড়ের ধারে কিংবা পুকুর পাড়ে মাছরাঙা পাখির মাছ ধরার আকর্ষণীয় দৃশ্য হরহামেশাই নজরে পড়তো। কিন্তু জলাভূমি কমে আসায় এই রঙ চঙে সুন্দর পাখিটির ভবিষ্যৎ মারাত্নক হুমকির মুখে পড়েছে।

ফলে আমাদের চারপাশে অবাধে বিচরণ করা এই সুন্দর পাখিটির বিভিন্ন প্রজাতির সংখ্যা দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। প্রকৃত সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে অদূর ভবিষ্যতে অন্য অনেক পাখির মতো মাছরাঙাও হয়তো আমাদের প্রকৃতির মাঝ থেকে হারিয়ে যাবে।

নীল মাছরাঙা একা কিংবা একজোড়া এক জায়গায় বসবাস করে। মাছরাঙা খাদ্য সংগ্রহের ব্যাপারে একটা নির্দিষ্ট নীতি মেনে চলে। ওরা খাদ্য সংগ্রহের জন্য নিজের নিজের নির্দিষ্ট এলাকা ঠিক করে নেয়। সেখানে অন্য মাছরাঙার প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ। এই পাখির শিকার ধরার স্টাইলটিও বেশ অদ্ভুত।

পানির ওপর ঝুঁকে পড়া কোনো চিকন ডাল বা পানিতে পুঁতে রাখা বাঁশ-খুঁটির ওপর বসে নিচে মাছের গতিবিধির দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখে। দূর থেকে দেখে মনে হয় যেন ধ্যানমগ্ন ঋষি। তাক সই হলেই ঋষির ধ্যান ভেঙে যায়। ঝুপ করে তীব্র গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে মাছটিকে ধরে ফেলে।

মাছ আকারে বড় হলে ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরে গাছের ডালের ওপর আছরে মারে। তারপর গিলে ফেলে। এই পাখি কখনো কখনো পানির ২/৩ মিটার ওপরে এক জায়গায় ডানা নাড়িয়ে শূন্যে ভেসে থেকে শিকারকে লক্ষ্য করে। নীল মাছরাঙা চিচি-চিচি-চিচি শব্দে জলাশয়ের ধার ধরে উড়ে চলে। ওদের প্রিয় খাবার ছোট মাছ, জলজ পোকা-মাকড় এবং ব্যাঙাচি।

বর্ষা আসার ঠিক আগে আগে নীল মাছরাঙা ডিম পাড়ে। পুকুরের পাড়ে বা খাড়া মাটির পাড়ে এক ফুট দীর্ঘ গর্ত করে ওরা বাসা তৈরি করে। গর্তের শেষ প্রান্তটি প্রশস্ত হয়। এ বাসায় নীল মাছরাঙা ৫ থেকে ৬টি ডিম পাড়ে। ডিমের রঙ সাদা।

-বেনজীর আহমেদ সিদ্দিকী
ফার্মাসিস্ট ও সমাজকর্মী

  • 5
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    5
    Shares