ক্ষতিকর কর্মীদের চিনে রাখাটা জরুরি। ছবি: সংগৃহীত

অফিস কর্মী বহিষ্কারের ক্ষেত্রে অনেক সময় কথায়-কাজে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, তোমাকে আর আমাদের দরকার নেই বা আমরা আর একসাথে কাজ করতে পারব না। কিন্তু বিষয়গুলো সব সময় এত মসৃণ হয় না। কখনো কখনো বিষয়গুলো অনেক খারাপ বা কটু পর্যায়ে চলে যায়।

আমরা সবাই কম বেশি অফিসের কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের চিনতে পারি, যেমন- কারা কম কাজ করেন, দলের সাথে ভালোভাবে কাজ করেন না, প্রত্যাশা পূরণের জন্য সংগ্রাম করেন। আবার কে অলস, কে পরিশ্রমী- তাও বুঝা যায়। প্রকৃত সমস্যা হচ্ছে কিছু কর্মী দেখায় যে কাজ করছেন, কিন্তু আসলে করেন না। তাদের এই ধরনের আচরণ ধীরে ধীরে অন্যান্য কর্মকর্তাদের কর্মক্ষমতা, মনোভাব এবং মনোবল নষ্ট করে দেয়।

৮ টি অপ্রত্যাশিত চিহ্ন দেখা গেলে অফিস কর্মকর্তা বহিষ্কার করা প্রয়োজন। ছবি : প্রতীকী

নিম্নে উল্লেখিত ৮ টি অপ্রত্যাশিত আচরণ দেখা গেলে অফিস কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত করা প্রয়োজন-

১) গল্পে মেতে উঠা বা কলিগের বদনাম করা

কারো পেছনে তার বদনাম করা যে অফিস সংস্কৃতির আওতায় পড়ে না, তা অনেকেই জানেন না। সম্প্রতি সময়ে এই অপচর্চা বেশ আলোচিত, পরিচিত ও ভয়ানকও বটে। ইংরেজিতে এই অপচর্চাকে ‘গসিপ’ বলে। গল্প, ঠাট্টা আর গসিপের পার্থক্য গুলিয়ে ফেললেই তা ভয়ানক রূপ ধারণ করে।

গল্পে মেতে উঠা বা কলিগের বদনাম করা। ছবি : প্রতীকী

‘গসিপ’ করে এমন কর্মী অফিসের জন্য অমঙ্গলজনক ও ক্ষতিকর। কেননা তার এই গসিপের জন্য অফিস কলিগদের মাঝে সম্মান ও সৌহার্দতা হ্রাস পায়। কখনো কখনো এই গসিপ কলিগদের মাঝে শত্রু ভাবাপন্ন মনোভাবও সৃষ্টি করে।

২) মিটিংয়ের পরে মিটিং করা

সাধারণত মিটিং হয়। যে কোনো সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। মতামত দেওয়া হয়। তারপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সবাই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে কাজে যোগ দেয়। কিন্তু অনেকেই এই মিটিংয়ের পরে আবার মিটিং করার কথা বলে থাকেন বা মিটিং করেও থাকেন। তখন ওই মিটিংয়ে তারা এমন কিছু বলেন যা, আগের মিটিংয়ে বলেননি। কখনো পরবর্তী মিটিংয়ে এমন কিছু বলেন যা আগের মিটিংয়ের কথার তুলনায় পুরোপুরি উল্টো।

মিটিং এর পরে মিটিং করা। ছবি : প্রতীকী

এই প্রকৃতির কর্মকর্তারা অনেক সময় বলে থাকেন, আমাকে এটা উপর মহল থেকে বলতে বা করতে বলা হয়েছে, তাই আমি বলেছি বা করেছি। এরা অফিসের জন্য সঠিক নয়। তারা মুখে যা বলেন, তা করেন না। আবার যা করেন, তা মুখে বলেন না। এই ধরনের ব্যক্তিদের অন্যত্র কাজ করা উচিৎ।

৩) এটা আমার কাজ নয়

কোম্পানি ছোট হোক বা বড় হোক, সময় ও পরিস্থিতি বুঝে কর্মকর্তাদের সব কাজ করা ও কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করা উচিৎ। তা সে সিইও হোক বা সাধারণ কর্মকর্তা হোক। কিন্তু এক্ষেত্রে অনেকেই বলে থাকেন, এটা আমার কাজ নয়। আমি শুধু আমার পদের কাজই করবো। এই ধরনের মনোভাব ও আচরণ অফিসের পরিবেশে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এ ছাড়াও অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তা সমন্বয়কে নষ্ট করে দেয়।

৪) ইতোপূর্বে অনেক দায়িত্ব কর্তব্য পালন করেছি

একজন কর্মকর্তা গত বছর, গত মাসে, গত দিনে বা গতকাল অনেক ভালো কাজ করেছেন, এটা সত্যি-ই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। তার কাজের জন্য কোম্পানি তার কাছে কৃতজ্ঞও। তবুও আজকে একটা নতুন দিন। নতুন দিনের কাজ তো আর অগ্রিম করা হয়নি। প্রতিটা নতুন দিনের সাথে নতুন দায়িত্ব কর্তব্যও আসে। একজন কর্মকর্তার প্রতিদিনের কাজ অনুসারেই তাকে বিচার বিবেচনা করা হয়।

ইতোপূর্বে অনেক দায়িত্ব কর্তব্য পালন করেছি। ছবি : প্রতীকী

এক্ষেত্রে অনেক কর্মকর্তা বলে থাকেন, বিগত দিনে বা ইতোমধ্যে আমি অনেক দায়িত্ব কর্তব্য পালন করেছি। এখন আর পারবো না বা করব না। তারা ধরেই নেন যে তারা যা অর্জন করেছেন, সেই অর্জনের দোহাই দিয়ে বর্তমান সময়টাকে পার করবেন। এই প্রকৃতির কর্মকর্তা দীর্ঘদিন অফিসের জন্য মঙ্গল বয়ে আনতে পারেন না।

৫) অভিজ্ঞতাই সব 

অনেক কর্মীই মনে করেন, অভিজ্ঞতাই সব। অভিজ্ঞতা অবশ্যই অনেক গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু অভিজ্ঞতা দিয়েই কাজ, দক্ষতা ও অর্জনকে আরও ভালোর দিকে নিয়ে যাওয়া যায় না। শুধু অভিজ্ঞতা বর্জ্য সমতুল্য। অফিসে এমন অনেক কর্মকর্তা থাকেন যারা সারাদিন শুধু তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলতে থাকেন। কিন্তু তিনি তার পদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব কর্তব্য পালন করেন না।

নিঃসন্দেহে সবাই অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে তার অভিজ্ঞতার জন্য সম্মান করবে। কিন্তু অভিজ্ঞ ব্যক্তিকেও তার নির্দিষ্ট দায়িত্ব কর্তব্য অবশ্যই পালন করতে হবে। আর যে কোনো সিদ্ধান্ত বা কাজের ক্ষেত্রে যুক্তি, বুদ্ধিমত্তা প্রকাশ করতে হবে। অযথা অভিজ্ঞতার দোহাই দিয়ে সব কাজে একটা যুক্তিহীন কথা বলা বা সেই কথায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা বোকামির কাজ হিসেবে গণ্য হবে।

৬) নিজে না এগিয়ে অন্যকে পিছাতে বলেন 

নতুন কর্মকর্তা অনেক পরিশ্রমী, ভালো কাজ করেন, কম সময়ে অনেক কাজ করে ফেলেছেন, অফিসে বেশি সময় দেন এসব কিছুই পুরাতন কিছু কর্মকর্তাদের কাছে চাপ বা ভয়ের মনে হয়। তারা নতুন কর্মকর্তার প্রশংসা না করে বরং তার দোষ ত্রুটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। আবার কখনো নতুন কর্মকর্তাকে বলেন- তুমি ভালো কাজ করে আমাদের খারাপ প্রমাণ করতে চাইছো! কিন্তু প্রকৃত অর্থে একজন ভালো কর্মকর্তা কখনই অন্যের সাথে নিজের তুলনা দেন না। প্রত্যেককেই নিজের সাথে নিজের তুলনা দেওয়া উচিৎ। কিছু কর্মকর্তা নিজে না এগিয়ে অন্যকে পিছাতে বলেন। এই প্রকৃতির কর্মকর্তা নিজের এবং অফিসের জন্য ভালো নয়। এরা নিজেদেরও উন্নতি করে না এবং অফিসেরও উন্নতি হতে দিতে চায় না।

৭) সবার আগে নিজের প্রশংসা পেতে চায়

হতে পারে ওই কর্মকর্তার জন্যই কাজটি সঠিকভাবে শেষ করা গেছে, তিনি প্রায় সকল বাধা পেরিয়ে কাজটি করেছেন। তিনি ছাড়া হয়ত দলটি সফল হতে পারত না। কিন্তু তবুও কিছু কর্মকর্তা সবার আগে নিজের প্রশংসা পেতে চায়। একজন ভালো কর্মকর্তা বা দলনেতা সবার সাথে গৌরব ভাগ করে নিতে চায়। কখনো শুধু নিজের কথা ভাবেন না। ‘আমি সব কিছু করেছি বা আমি সব বলেছি’- এই ধরনের কর্মকর্তা অফিসের জন্য সব সময় মঙ্গলজনক নয়।

নিজে না এগিয়ে অন্যকে পিছাতে বলেন। ছবি : প্রতীকী

৮) দ্রুত অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেওয়া

ঝড় হোক, বৃষ্টি হোক বা কেউ পাগল হয়ে যাক- কিছু কর্মকর্তা আছেন যারা সব কাজেই অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেন যত দ্রুত সম্ভব। আবার অনেক ক্ষেত্রে কিছু কর্মকর্তা দোষ যারই হোক আর ঘটনা যাই হোক, সব দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়ে নেন। কারণ তারা জানেন যে তারা এটা সামাল দিতে পারবেন। তাই এক্ষেত্রে যারা দ্রুত অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেন তারা বহিষ্কার যোগ্য। স্বার্থপরের মত শুধু নিজেকে নিয়ে চিন্তা করলে তারা দলের অন্যান্য কর্মকর্তাদের মাঝেও এই প্রবণতা ছড়িয়ে দিতে পারেন।

আজকের পত্রিকা/বিএফকে/সিফাত