বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা সাকিব আল হাসান এবং কেন উইলিয়ামসন। ছবি : সংগৃহীত

শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচের মধ্য দিয়ে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ ২০১৯ আসরের সমাপ্তি ঘটেছে। লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডে নিউজিল্যান্ডের দেওয়া ২৪২ রানের টার্গেট তাড়া করতে গিয়ে ‘টাই’ করে ব্রিটিশ ব্যাটসম্যানরা। পরবর্তীতে আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী সুপার ওভারে খেলার ফলাফল নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু তাতেও ফলাফল ‘টাই’ হয়। যদিও মূল ম্যাচে ইংল্যান্ডের বাউন্ডারির সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদেরকেই জয়ী ঘোষণা করা হয়। এভাবেই ইংল্যান্ড ছুঁয়ে দেখে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ। আর ব্ল্যাক ক্যাপস হেরে গিয়েও অজস্র মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়।

কেন উইলিয়ামসন। ছবি : সংগৃহীত

পুরস্কার বিতরণের সময় বাংলাদেশের কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীরা ‘ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট’ হিসেবে সাকিব আল হাসানকে দেখার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়, অর্থাৎ ম্যান অফ দ্য টুর্নামেন্টের পুরস্কার পায় নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন।

ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক নাসের হুসেইন যখন ম্যান অফ দ্য টুর্নামেন্টের নাম ঘোষণা করেন, তখন তিনি জানিয়েছিলেন- আরও তিনজন এই খেতাবের জন্য বিবেচিত হয়েছিলেন, যা বিবেচনা করেছিলো ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের একটি দল। সাকিব আল হাসানের সাথে এই পুরস্কারের জন্য বিবেচনায় ছিলেন ভারতের রোহিত শর্মা আর অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্ক। তবে ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফ্যান্টাসি লীগে সাকিব আল হাসানের পয়েন্ট বেশি থাকায় বাংলাদেশি ভক্তদের প্রত্যাশা ছিলো সাকিবের হাতেই ওঠবে সেরা খেলোয়াড়ের ট্রফি। তবে কেন উইলিয়ামসনকেই আইসিসি সেরা খেলোয়াড়ের যোগ্য দাবীদার মনে করলো! এক্ষেত্রে অবশ্য বেশি যুক্তিসঙ্গত কারণও রয়েছে।

কেন উইলিয়ামসনের ব্যাটিং এবং অধিনায়কত্ব

ব্যাটিং এ কেন উইলিয়ামসন ছিলো দুর্দান্ত। ছবি : সংগৃহীত

পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে ব্যাটিংয়ে কেন উইলিয়ামসন ১০ ম্যাচ খেলে সংগ্রহ করেন ৫৭৮ রান, যা বিশ্বকাপের চতুর্থ সর্বোচ্চ সংগ্রহ। এছাড়া এই রানগুলো ব্যাক্তিগত ইমপ্যাক্টের থেকে দলীয় ইমপ্যাক্ট অনেক বেশি ছিলো। অর্থাৎ তার সংগৃহীত রান গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে দলকে জয় এনে দিতে খুবই কার্যকরী ছিলো।

টুর্নামেন্টে নিউজিল্যান্ড টানা প্রথম ৫ ম্যাচে জয়ী হয়, যে ম্যাচগুলো দলকে সেমিফাইনালে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রথম ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১০ উইকেটে জয় ছাড়া নিউজিল্যান্ডের উদ্বোধনী জুটি তেমন উল্লেখ করার মতো রান করতে পারেনি। ব্যাট হাতে নিউজিল্যান্ডের ত্রাণকর্তার ভূমিকায় ছিলেন কেন উইলিয়ামসন। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৭৯, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১০৬ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৪৮ রান তোলেন নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক। সেমিফাইনালেও ভারতের বিপক্ষে ৬৭ রানের একটি ইনিংস খেলেন, যা পরবর্তীতে ম্যাচ জেতাতে সাহায্য করে। ফাইনাল ম্যাচে ৩০ রানে আউট হন তিনি।

ক্রিটিকাল ম্যাচগুলোতে অসাধারণ অধিনায়কত্ব দেখিয়েছে কেন উইলিয়ামসন। ছবি : সংগৃহীত

অন্যদিকে অধিনায়কত্বের দিক বিবেচনায় আনা হলে উইলিয়ামসন এবারের বিশ্বকাপের সেরা অধিনায়কের খেতাব পাবেন। ব্যাটিং স্বর্গের দেশে অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টে নিউজিল্যান্ড এমন একটি দল, যারা কোনো ম্যাচে ৩০০ রান সংগ্রহ করতে পারেনি। অথচ উইলিয়ামসনের অধিনায়কত্বের জোরে অনেকগুলো ক্রিটিকাল ম্যাচেও জয়ী হয় ব্ল্যাক ক্যাপস। বাংলাদেশের বিপক্ষে ২ উইকেটের জয়, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৪ উইকেটের জয় ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৫ রানের জয়ে উইলিয়ামসন শেষ পর্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ফিল্ডিং সাজানো ও বোলিং পরিবর্তনের কাজ করেন, যা দলকে ফাইনালে নিয়ে আসতে কাজে দেয়।

সাকিবকে যে কারণে দেওয়া হলো না

Image may contain: 3 people, people smiling, outdoor
সাকিব আল হাসান। ছবি : সংগৃহীত  

নিঃসন্দেহে সাকিব আল হাসান এবারের বিশ্বকাপের একজন দুর্দান্ত খেলোয়াড়দের মধ্যে অন্যতম। শুধু ব্যাটিং আর বোলিং মিলিয়ে সেরা খেলোয়াড়ের বিবেচনা করলে সাকিবই ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্টের প্রথম দাবীদার। ৮ ম্যাচে ৬০৬ রানের সংগ্রহের পাশাপাশি সাকিবের ঝুলিতে আছে ১১টি উইকেট। সবগুলো ম্যাচেই সাকিবের দুর্দান্ত ব্যাটিং বিশ্বের ক্রিকেট প্রেমীদের নজর কাড়ে। কিন্তু সাকিবের এই অসাধারণ পারফরমেন্স থাকা সত্ত্বেও তার দলীয় ইমপ্যাক্ট তুলনামূলক খুব কম।

দলে একজন সাকিব থাকার পরেও ৮ নম্বর অবস্থানে থেকে বিশ্বকাপ মঞ্চ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে বাংলাদেশ দলকে। সেক্ষেত্রে সাকিবের দুর্দান্ত অলরাউন্ড পারফরমেন্সের গুরুত্ব অনেকটাই লঘু হয়ে গেছে। কারণ ক্রিকেট একার খেলা নয়, এটি দলগত খেলা। সেরা খেলোয়াড় হবার একটা বিশেষ দিক হচ্ছে ব্যক্তির সাফল্য দলের সাফল্যের উপর কতটা প্রভাব ফেলছে, তার উপর নির্ভর।

ইতিহাস ঘাটলেও তাই দেখা যায়। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ১৯৯২ সাল থেকে ম্যান অফ দ্য টুর্নামেন্ট পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। ১৯৯২ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত যত বিশ্বকাপ হয়েছে, সেখানে অন্তত সেমিফাইনাল যারা খেলেছে তাদের মধ্য থেকেই বিশ্বকাপের সেরা ক্রিকেটার নির্বাচিত হয়েছেন। তাই বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ইতিহাসে একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে ৬০০’র ওপর রান ও ১০টিরও বেশি উইকেট নিয়েও শুধুমাত্র দলীয় অসফলতার কারণেই সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হতে পারেননি সাকিব আল হাসান।

আজকের পত্রিকা/কেএইচআর/সিফাত