প্রাচীন বঙ্গের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির অনুসন্ধানে আত্মোৎসর্গকারী জ্ঞানতাপস আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার ১০১তম জন্মবার্ষিকী উদযাপিত হয়েছে মঙ্গলবার। ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির আয়োজনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালার পরীক্ষণ থিয়েটার হলে এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন কমিটির চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষণা করে অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘বহুমাত্রিক প্রতিভাধর আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার প্রায় সব কাজই প্রাচীন বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি কেন্দ্র করে। তার কাজ যেমন বাংলার প্রাচীন ইতিহাসকে সামনে নিয়ে এসে আমাদের সমৃদ্ধ করবে, তেমনি তা বিশ্বমানবতাকেও সমৃদ্ধ করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ দ্বারা তাড়িত না হলে, পরিচালিত না হলে মনু্ষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটে না। আ ক ম যাকারিয়ার জীবন ও কর্ম আমাদের সেই মনু্ষ্যত্বের বিকাশে নিরন্তর অনুপ্রেরণা যুগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের জন্য এক অনন্য অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক কামালুদ্দিন কবীর বাংলাদেশের দেশজ সংস্কৃতির ধারায় যোগীর গানের বিশেষত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘আধুনিক যুগে ছাপাবইয়ের প্রচলনের আগে জ্ঞানচর্চার ধারা যেমন ছিল গুরুমুখী, তেমনি সে সময়ের দর্শন চর্চার প্রধান মাধ্যমই ছিল যোগীর গানের মতো এইসব দেশজ শিল্পচর্চার ধারা। দেশে এখন কবিগান, জারিগান, মনসার পালা বা অন্যান্য পালাগানের ধারা মোটামুটি চালু থাকলেও যোগীর গান বিলুপ্ত প্রায়। কিন্ত নাথ গুরুদের দেহ সাধনার তত্ত্বকথা আর দর্শনে সমৃদ্ধ যোগীর গানের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে এর চর্চায় সহায়তা করা জরুরি।’

সংক্ষিপ্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন যাকারিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র মারুফ শমসের যাকারিয়া। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘বাবার কাছেই গল্প শুনেছিলাম, ছোটবেলায় তাকে পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রথমে মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়। কিন্তু তিনি নিজেই দাদীর কাছ থেকে এক আনা নিয়ে নিজ উদ্যোগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ছোটবেলাতেই তার এই মেধা ও দূরদৃষ্টির পরিচয় আমাকে বিস্মিত করে।’

বরেণ্য প্রত্নতত্ত্ববিদ, পুঁথিসাহিত্যবিশারদ, অনুবাদক ও ইতিহাসবিদ যাকারিয়ার জন্মবার্ষিকী উদযাপনের মূল আয়োজন ছিল নাটোরের বেলাল প্রামাণিক ও তার দলের পরিবেশনায় যোগীর গান। একইসঙ্গে আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার রচিত গ্রন্থসমূহের প্রদর্শনী এবং তাঁর জীবন ও কর্মের উপর একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীর ও আয়োজন ছিল অনুষ্ঠানস্থলে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সূচনা সংগীত পরিবেশন করেন, শিল্পী ইশরাত জাহান কাকন, অরুণা সরকার, সেঁজুতি নওরোজ এবং যাকারিয়া কন্যা সুফিয়া আতিয়া যাকারিয়া এবং তবলায় ছিলেন অনুপ বিশ্বাস, গিটারে ছিলেন সাদ্দাম হোসেন।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন শিল্পী শরীফ আল মাসুদুর রহমান। জ্ঞানতাপস যাকারিয়ার জন্মবার্ষিকীর এ অনুষ্ঠান আয়োজনে সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী।

বাংলার পুঁথিসাহিত্য সম্পাদনায় আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার ‘কবি শুকুর মামুদ বিরচিত গুপি চন্দ্রের সন্ন্যাস’ এবং ‘বাঙলা সাহিত্যে গাজী কালু ও চম্পাবতীর আখ্যান’ গ্রন্থ দুটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। যাকারিয়া রচিত প্রায় অর্ধশত গ্রন্থের মধ্যে ‘গুপি চন্দ্রের সন্ন্যাস’ই তার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ, যার বিষয়বস্তু নাথ ধর্মের সাধন পদ্ধতি ও যোগীদের আখ্যানকাব্য। এ কারণেই যাকারিয়ার জন্মবার্ষিকীর আয়োজনে রাজধানীর দর্শকদের সামনে ঐতিহ্যবাহী এই দেশীয় শিল্পরীতির চর্চাকারী শিল্পীদের অংশগ্রহণে ‘যোগীরগান’র পরিবেশন করেছে আয়োজকরা।

আজকের পত্রিকা/সিফাত