কাজী নজরুল ইসলাম ও আব্বাসউদ্দীন আহমেদ। ছবি : সংগৃহীত

নজরুলের যে ৬০টি গজল আব্বাসউদ্দীনের গান, তার মধ্যে ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে’ একটি। অসংখ্য জলসায় যখন এ গানগুলো নজরুল, আব্বাসউদ্দীন ও আসাদ উদদ্দৌলা সিরাজি গাইতেন, তা একবার শুনে শ্রোতারা তুষ্ট হতেন না। একই গজল বারবার গাইতে হতো। এর মধ্যেই একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ গজল ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’।

অনেকেই মনে করেন এটা হঠাৎ করে নজরুল লিখে ফেলেন। কিন্তু আধ্যাত্মিক চর্চা ও সুফিবাদের পেয়ালায় ধারাবাহিক চুমুক দেওয়ার কারণেই এ গান রচনা করা সম্ভব। যে বেদনা বা স্বজাতির প্রতি দরদের তাড়নায় তিনি এ গজল রচনা করেছেন তার পটভূমি অনেকটা রোমাঞ্চিত হওয়ার মতো।

ঈদুল ফিতরকে নিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত কালজয়ী এ গান রচনা করেন ১৯৩১ সালে। লেখার মাত্র চারদিন পর শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের গলায় গানটি রেকর্ড করা হয়। রেকর্ড করার দুই মাস পর ঈদের ঠিক আগে আগে এই রেকর্ড প্রকাশ করা হয়।

কীভাবে এ গজলটি রচিত হলো তা শোনা যাক আব্বাসউদ্দীনের ‘দিনলিপি ও আমার শিল্পী জীবনের কথা’র ১৩৩ নম্বর পৃষ্ঠায়। আব্বাসউদ্দীন বলেন, “কাজী দা’র লেখা গান ইতোমধ্যে অনেকগুলো রেকর্ড করে ফেললাম। তার লেখা ‘ বেণুকার বনে কাঁদে বাতাস বিধুর’, ‘অনেক কিছু বলার যদি দুদিন আগে আসতে’, ‘গাঙে জোয়ার এল ফিরে তুমি এলে কই’, ‘বন্ধু আজও মনে পড়ে আম কুড়ানো খেলা’ ইত্যাদি রেকর্ড করলাম। একদিন কাজী দা’কে বললাম, ‘কাজী দা, একটা কথা মনে হয়। এই যে পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়াল- এরা উর্দু কাওয়ালি গায়, এদের গানও শুনি অসম্ভব বিক্রি হয়। এ ধরনের বাংলায় ইসলামি গান দিলে হয় না? তারপর আপনি তো জানেন কীভাবে কাফের-কুফর ইত্যাদি বলে বাংলার মুসলমান সমাজের কাছে আপনাকে অপাংক্তেয় করে রাখার জন্য আদাজল খেয়ে লেগেছে এক দল ধর্মান্ধ! আপনি যদি ইসলামি গান লেখেন, তাহলে মুসলমানের ঘরে ঘরে আবার উঠবে আপনার জয়গান।”

কথাটা নজরুলের মনে লাগলো। তিনি বললেন, “আব্বাস, তুমি ভগবতীবাবুকে বলে তার মত নাও। আমি ঠিক বলতে পারব না।” আমি ভগবতী ভট্টাচার্য অর্থাৎ গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল-ইনচার্জকে বললাম। তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন, ‘না না না, ওসব গান চলবে না। ও হতে পারে না’। মনের দুঃখ মনেই চেপে গেলাম। এর প্রায় ছয় মাস পর। একদিন দুপুরে বৃষ্টি হচ্ছিল, আমি অফিস থেকে গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল ঘরে গিয়েছি। দেখি, একটা ঘরে আশ্চর্যময়ী আর ভগবতীবাবু বেশ রসালো গল্প করছেন। আমি নমস্কার দিতেই বললেন, ‘বসুন, বসুন’। আমি তার রসাপ্লুত মুখের দিকে চেয়ে ভাবলাম, এ-ই উত্তম সুযোগ। বললাম, ‘যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে বলি। সেই যে বলেছিলাম ইসলামি গান দেওয়ার কথা। আচ্ছা; একটা এক্সপেরিমেন্টই করুন না, যদি বিক্রি না হয় আর নেবেন না, ক্ষতি কী’? তিনি হেসে বললেন, ‘নেহাতই নাছোড়বান্দা আপনি, আচ্ছা আচ্ছা, করা যাবে’।
শুনলাম, পাশের ঘরে কাজীদা আছেন। আমি কাজীদাকে বললাম, ভগবতীবাবু রাজি হয়েছেন। তখন সেখানে ইন্দুবালা কাজীদার কাছে গান শিখছিলেন। কাজীদা বলে উঠলেন, ‘ইন্দু, তুমি বাড়ি যাও, আব্বাসের সঙ্গে কাজ আছে’। ইন্দুবালা চলে গেলেন। এক ঠোঙা পান আর চা আনতে বললাম দশরথকে। তারপর দরজা বন্ধ করে আধঘণ্টার ভেতরই লিখে ফেললেন, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’। তখনই সুর সংযোগ করে শিখিয়ে দিলেন। পরের দিন ঠিক এই সময় আসতে বললেন। পরের দিন লিখলেন, ‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এল নবীন সওদাগর’। গান দু’খানা লেখার ঠিক চার দিন পরই রেকর্ড করা হল। কাজীদার আর ধৈর্য মানছিল না। তার চোখেমুখে কী আনন্দই যে খেলে যাচ্ছিল! তখনকার দিনে যন্ত্র ব্যবহার হতো শুধু হারমোনিয়াম আর তবলা। গান দু’খানা আমার তখন মুখস্থ হয়নি। তিনি নিজে যা লিখে দিয়েছিলেন, মাইকের পাশ দিয়ে হারমোনিয়ামের ওপর ঠিক আমার চোখ বরাবর হাত দিয়ে কাজীদা নিজেই সেই কাগজখানা ধরলেন, আমি গেয়ে চললাম। এই হল আমার প্রথম ইসলামি রেকর্ড। শুনলাম; দুই মাস পর ঈদুল ফিতররের সময় গান দু’খানা তখন বাজারে বের হবে। ঈদের বাজার করতে একদিন ধর্মতলার দিকে গিয়েছি। বিএন সেন অর্থাৎ সেনোলা রেকর্ড কোম্পানির বিভূতিদার সঙ্গে দেখা। তিনি বললেন, ‘আব্বাস, আমার দোকানে এসো’। তিনি এক ফটোগ্রাফার ডেকে নিয়ে এসে বসলেন, ‘এর ফটোটা নিন তো’। আমি তো অবাক! বললাম, ‘ব্যাপার কী’? তিনি বললেন, ‘তোমার একটা ফটো নিচ্ছি, ব্যস, আবার কী’?

ঈদের বন্ধে বাড়ি গেলাম।…কলকাতা ফিরে এসে ট্রামে চড়ে অফিসে যাচ্ছি। ট্রামে একটি যুবক আমার পাশে গুনগুন করে গাইছে, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’। আমি একটু অবাক হলাম। এ গান কী করে শুনল! অফিস ছুটির পর গড়ের মাঠে বেড়াতে গিয়েছি, মাঠে বসে একদল ছেলের মাঝে একটি ছেলে গেয়ে উঠল, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’। আনন্দে-খুশিতে মন ভরে উঠল।… ছুটলাম কাজীদার বাড়ি। শুনলাম, তিনি রিহার্সেল রুমে গেছেন। দেখি, দাবা খেলায় তিনি মত্ত। দাবা খেলতে বসলে দুনিয়া ভুলে যান তিনি। আমার গলার স্বর শুনে একদম লাফিয়ে উঠে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, ‘আব্বাস, তোমার গান কী যে-’ আর বলতে দিলাম না পা ছুঁয়ে তার কদমবুসি করলাম। ভগবতীবাবুকে বললাম, ‘তাহলে এক্সপেরিমেন্টের ধোপে টিকে গেছি, কেমন’? তিনি বললেন, ‘এবার তাহলে আরও ক’খানা এই ধরনের গান…’
নজরুলের এই গজলগুলোর শব্দচয়ন বিশেষ করে আরবি-ফার্সি শব্দের ব্যবহার বলে দেয়, তিনি কতটা আধ্যাত্মিকভাবে সচেতন।

লেখক : শামস আরেফিন

আজকের পত্রিকা/এমএইচএস/সিফাত