আসাদুজ্জামান স্বপ্ন
সিনিয়র রিপোর্টার

বাংলা নববর্ষের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের যোগসূত্র নেই। ছবি : সংগৃহীত

১৯৮৩ সাল। চৈত্রের শেষ। চারিদিকে বৈশাখের আয়োজন চলছে। চৈত্রের এক বিকালে আড্ডা দিচ্ছিলেন কয়েকজন সাংস্কৃতিক কর্মী। আড্ডায় চলে পান্তা-ইলিশের কথা। তাদের মধ্যে একজন দৈনিক জনকণ্ঠের সাংবাদিক বোরহান আহমেদ রমনা বটমূলে পান্তা-ইলিশ চালুর প্রস্তাব করেন। আর সে প্রস্তাবে সবাই সমর্থন করেন। আর সে বছর থেকেই শুরু হয় রমনা বটমূলে পান্তা-ইলিশ।

রমনা বটমূলের বৈশাখী আয়োজনে প্রথম পান্তা-ইলিশের প্রস্তাব করেন সাংবাদিক বোরহান আহমেদ। বিভিন্ন পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়, ১৯৮৩ সালে বোরহান আহমেদের পান্তা-ইলিশের প্রস্তাবের পর পুরো আয়োজনের ব্যবস্থা করলেন ফারুক মাহমুদ। সম্ভবত সে সময় ৫ টাকা করে চাঁদা ধরা হয়। আর বিপ্লব পত্রিকার পিয়নকে দায়িত্ব দেয়া হয় বাজার করা আর রান্না-বান্নার করার। রাতে ভাত রেঁধে পান্তা তৈরি, কাঁচামরিচ-শুকনো মরিচ, পেঁয়াজ, ইলিশ ভাজা করা হয়। পরের দিন ১৪ এপ্রিল ‘এসো হে বৈশাখে’র আগেই খুব ভোরে বটমূলের রমনা রেস্টুরেন্টের সামনে হাজির হলেন পান্তা-ইলিশ প্রথা বানানোর দল। মুহূর্তের মধ্যে শেষ হলো পান্তা-ইলিশ। এভাবে যাত্রা শুরু হলো পান্তা ইলিশের।

বছরের প্রথম দিনে এখানে ঘটা করে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার সংস্কৃতিকে অনেকেই ভালো চোখে দেখেন না। এমনকি তারা বলছেন এর সঙ্গে বাংলার সংস্কৃতির কোনো সম্পর্ক নেই। অনেকেই আবার বলেন, শহরে পান্তা ভাত খাওয়া আমাদের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ সংস্কৃতিকে ব্যঙ্গ করা। ধারণা করা হয়, পান্তা-ইলিশ শুরু হয়েছিল টাকা কামানোর ধান্দায়, সংস্কৃতিপ্রেমের জন্য নয়। আজকাল শহরের মানুষের মধ্যে এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে, বছরের শুরুর এ দিনটিতে ইলিশ না খেলে বছরটাই মাটি হয়ে যাবে। তবে বছরের এই একটি দিনের ইলিশপ্রীতি ইলিশের ভবিষ্যত্ নষ্ট হওয়ার কারণ হিসেবে আশঙ্কা অনেকের মনে।

বাংলা নববর্ষের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের যোগসূত্র ঠিক কবে থেকে তার সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায় না। জানা যায়, আশির দশকে রমনাকে কেন্দ্র করে নববর্ষে কিছু খাবারের দোকান বসে। যারা ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখতে যেতেন তারা সেখানে খেয়ে নিতেন। এমনই একবার অল্প কয়েকজন মিলে পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছ ভাজা বিক্রি করলেন এবং তা সব বিক্রি হয়ে গেল। কয়েকজন বেকার তরুণ এই কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাদের উৎসাহিত করতে এবং ‘নতুন একটা কিছু প্রবর্তন’ করার মানসিকতা নিয়ে একটি গ্রুপ এর প্রচারণা চালাতে লাগলেন। যাদের মধ্যে দুই একজন গণমাধ্যমকর্মীও ছিলেন। বিষয়টা আর কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

৩০ সেপ্টেম্বর ’০৯-এ দৈনিক আমাদের সময়ে ‘রমনা বটমূলের পান্তা ইলিশের উদ্যোক্তা বোরহান ভাইকে কেউ কি মনে রাখবে’, শীর্ষক একটি লেখা লিখেছিলেন সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল। তার দু’দিন পর ২ অক্টোবর ’০৯-এ সেই লেখার প্রতিবাদে সাংবাদিক শহিদুল হক খান লিখেন : ‘রমনা বটমূলের পান্তা ইলিশের ইতিহাস প্রকাশে দুলালের বিভ্রান্তি’। হয়তো তিনিই আসল উদ্যোক্তা হিসেবে দাবি করেছিলেন। পরে সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল আবার ০৯ অক্টোবরে লিখেন : ‘আমি পান্তা ইলিশের ইতিহাস রচয়িতা নই, বোরহান ভাইয়ের শ্রদ্ধান্তে সঠিক তথ্যদাতা’।

৫ সেগুন বাগিচা বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘর ছিলো দৈনিক দেশ এবং সাপ্তাহিক বিপ্লবের কার্যালয়। বিপ্লবের কবি সিকদার আমিনুল হক, সহকারী সম্পাদক ফারুক মাহমুদ, দেশের সাহিত্য সম্পাদক হেলাল হাফিজ, সাংবাদিক মাহবুব হাসান, শহিদুল হক খান, মুন্সী আবদুল মান্নান, রোজী ফেরদৌস প্রমূখ সম্পৃক্ত ছিলেন এ পত্রিকা দু’টির সাথে।

সম্ভবতঃ একই বছর বা পরের বছর শহিদুল হক খানও এই প্রক্রিয়ার সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ৯ অক্টোবর ২০০৯ সালে আমাদের সময় পত্রিকায়  ‘তিনি দাবি করেছেন, নিজ হাতে পান্তার পোস্টার লিখেছেন, তার পরিবারের সদস্যবৃন্দ ভাত রেঁধেছেন, ইলিশ মাছ ভেজেছেন, কাঁচামরিচ পেঁয়াজ কেটেছেন, মাটির সানকি সংগ্রহ করেছেন’। সে সময় তারা পান্তা-ইলিশ নিয়ে বিটিভিতে সাক্ষাৎকারও দিয়েছেন! তবে রমনা বটমূলের পান্তা-ইলিশের উদ্যোক্তার কৃতিত্ব এককভাবে কেউ নন। যাদের নাম উল্লেখ্য করলাম, তারা সকলেই নানাভাবে কমবেশি যুক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা থেকে জানা যায়।

বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সর্বজনীন উৎসব! ছায়ানট শিল্পীগোষ্ঠী সেই ষাট দশক থেকে অদ্যাবধি নানান প্রতিকূলতার মধ্যে জাতীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাঙালি জাতিকে দিয়েছে এক অফুরন্ত সাংস্কৃতিক আনন্দ-উৎসব। ষাট দশকে প্রতিপক্ষরা নতুনভাবে আবির্ভূত হয়ে ভিন্নভাবে বোমা হামলা চালিয়ে মানুষ মেরে নসাৎ করতে চেয়েছে উৎসবকে। কিন্তু পারেনি। পারবেও না কোনোদিন! বরং বৃদ্ধি পাবে, মাত্রা পাবে, যুক্ত হবে নতুন কিছু। যেমন যুক্ত হয়েছে চারুকলার বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা কিংবা পান্তা-ইলিশের সংযোজন! তারপর থেকেই মূলত গ্রাম-শহর একাকার হয়ে যায় পান্তা-ইলিশ সংস্কৃতির সঙ্গে।

করপোরেট সংস্কৃতি সব কিছুকেই পণ্য বানাতে চায়। সে জন্য তারা উপকরণ খোঁজে। পান্তা ইলিশ হয়ে যায় সেই উপকরণ। বৈশাখী খাবারের ব্র্যান্ডে পরিণত হয় পান্তা ইলিশ। তাই নববর্ষে ইলিশ মাছ খাওয়া কতটা জরুরি? এমনই প্রশ্ন এখন তুলছেন অনেকে। ইলিশের প্রজনন মৌসুম হওয়ায় পহেলা বৈশাখে ইলিশ বর্জন করে মাছ বাঁচানোর আহ্বান জানাচ্ছে সচেতন মহল। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে বেশ ভালোভাবেই চলছে এমন প্রচার।

বাংলা নববর্ষে পান্তা ইলিশ খাওয়ার প্রচলন আগে একবারেই ছিল না। ছবি : আজকের পত্রিকা

২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে পহেলা বৈশাখে ইলিশ না খাওয়ার আহ্বান জানান। বলেন, আপনারা ইলিশ খাবেন না, ইলিশ ধরবেন না। পহেলা বৈশাখের খাদ্য তালিকা হিসেবে-খিচুড়ি, সবজি, মরিচ ভাজা, ডিম ভাজা ও বেগুন ভাজার কথা উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।

একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ব্যান্ড সংগীতের শিল্পী মাকসুদুল হক বলেছিলেন, গ্রাম বাংলায় পহেলা বৈশাখ উদযাপনের যে ঐতিহ্য তার সাথে ইলিশের কোনো সম্পর্ক নেই। গ্রামবাংলায় গিয়ে দেখবেন সেখানে এখন ইলিশ নেই। তাদের খাওয়ার সামর্থ্যও নেই। আর আমরা কি খাচ্ছি মাছও খাচ্ছি, ডিমও খাচ্ছি। ভবিষ্যতের ইলিশগুলোকে শেষ করে দিচ্ছি।

বাংলার ঐতিহ্য নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন অধ্যাপক ও বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেছিলেন, ‘বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের চিরায়ত সংস্কৃতির সাথে ইলিশের কোনো সম্পর্ক নেই। বৈশাখে যখন খরার মাস যখন কোনো ফসল হতো না তখন কৃষকদের হাতে পয়সাও থাকতো না। সুতরাং তাদের পক্ষে ইলিশ কিনে খাওয়া সম্ভব হতো না। সুতরাং এটা মোটেও সত্যি নয় যে, কৃষকরা নববর্ষ উদযাপনে পান্তা ইলিশ খেয়ে বছর শুরু করতো। গ্রামবাংলায় নববর্ষের উৎসবই ছিল খুব ছোট আকারে। কৃষাণী আগের রাতে একটি নতুন ঘটে কাঁচা আমের ডাল ভিজিয়ে রাখতো, চাল ভিজিয়ে রাখতো। সকালে কৃষক সেই চাল পানি খেত, এবং শরীরে কৃষাণী পানিটা ছিটিয়ে দিত। তারপর সে হালচাষ করতে যেত। দুপুরবেলায় পান্তা খেতে পারতো কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ দিয়ে। কখনো কখনো একটু শুটকি, একটু বেগুন ভর্তা ও একটু আলু ভর্তা দিয়ে খেত।’

পহেলা বৈশাখের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের কোনও সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশের লেখক ও চিন্তকরা জানান, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দিক দিয়ে বৈশাখ উদযাপনের সঙ্গে এই খাবার দু’টির কোনও যুক্ততা খুঁজে পাননি তারা। তাদের মতে, বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হতে ব্যবসায়ীরা শহুরে নাগরিকদের কাছে পান্তা-ইলিশকে বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

লেখক চিন্তক যতীন সরকার জানিয়েছেন, স্বাধীনতার পর থেকে পান্তা-ইলিশকে পহেলা বৈশাখের অনুষঙ্গ করে তোলা হয়। প্রকৃত অর্থে এটি বানোয়াট সংস্কৃতিচর্চা। এর সঙ্গে বাঙালির কোনও সম্পর্ক নেই। পান্তা হচ্ছে গরিবের খাবার আর উৎসবের সময় মানুষ যেখানে ভালো ভালো খাবার খায়, সেখানে পান্তাকে খাওয়ানো হচ্ছে ব্যবসার খাতিরে।

প্রয়াত প্রখ্যাত সাংবাদিক, সাহিত্যিক এবং ছড়াকার ফয়েজ আহমদ পহেলা বৈশাখের উৎসব সম্পর্কে একাধিক প্রবন্ধ, নিবন্ধ এবং সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন, পহেলা বৈশাখের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের কোনও সম্পর্ক নেই। এটা কোনও গরিব মানুষের খাবার নয়। গ্রামের মানুষ ইলিশ মাছ কিনে পান্তাভাত তৈরি করে খায়, এটা আমি গ্রামে কখনও দেখিনি, শুনিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার এক লেখায় বলেন, ‘পহেলা বৈশাখের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের সম্পর্ক নেই। গরিব মানুষের খাবার পান্তাভাত। রাতে খাওয়ার পর অবশিষ্ট ভাত রাখার কোনো উপায় ছিল না; তাই পানি দিয়ে রাখা হতো এবং সকালে আলুভর্তা, পোড়া শুকনো মরিচ ইত্যাদি দিয়ে খাওয়া হতো। আমিও ছোটবেলায় খেয়েছি। কিন্তু এখন পান্তা-ইলিশ ধনী লোকের বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে এবং এটা দুর্মূল্যও বটে, যা সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এর মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতিকে সম্মান দেখানোর পরিবর্তে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে।’

প্রয়াত সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ বলেছিলেন, ‘পহেলা বৈশাখের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের সম্পর্ক নেই। এটা গরিব মানুষের খাবার নয়। গ্রামের মানুষ ইলিশ কিনে পান্তা ভাত তৈরি করে খায়। এটা কখনও দেখিনি, শুনিনি।’ প্রতিবারই বর্ষবরণের আগে এ নিয়ে বিতর্ক ওঠে। সে সঙ্গে বাজারে বাড়তে থাকে ইলিশের দাম। কয়েকদিন ধরেই গণমাধ্যমে ইলিশের দাম বাড়ার খবরের সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে বৈশাখে ইলিশ রান্নার নানা রেসিপির খবরও।

লোকগবেষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও মৎস্য বিশেষজ্ঞরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বৈশাখের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের সম্পর্ক নেই। এটা বাণিজ্যিক কারণে আরোপিত সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বলছেন, বৈশাখ মাসে ইলিশ খাওয়ার মধ্য দিয়ে সারা বছরের ইলিশ উৎপাদনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।’ 

বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার সাহিত্যিক আমজাদ হোসেন লিখেছেন, ‘পহেলা বৈশাখে ইলিশপান্তার কালচার একদমই নতুন প্রজন্মের।’ আসলে বৈশাখের সঙ্গে ইলিশের সংযোগ এমনভাবে ঘটানো হয়েছে যে, মনে হয় পান্তা ইলিশ ছাড়া বৈশাখের কোনও মানে নেই। যার প্রভাব পড়ে আর্থ-সামজিক পরিমণ্ডলে। বৈশাখকে কেন্দ্র করে এ সময় মা ইলিশের ডিমসহ নিধন কেবল একটি মাছ নয়, লাখ লাখ ভবিষ্যতের ইলিশকেও ধ্বংস করা হয়।

আজকের পত্রিকা/আ.স্ব/জেবি