হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। ছবি : সংগৃহীত

হাতে প্লেকার্ড। খালি গা। বুকের মধ্যে সাদা রঙে লেখা ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’। এমন দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় নূর হোসেনের মতো আন্দোলনকারী ছাত্রদের যারা স্বাধীন বাংলায় স্বৈর শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলো। গণতন্ত্রের মুক্তির লক্ষ্যে স্বাধীন ভূখণ্ডে স্বৈর শাসকের গুলির সামনে দাপটের সঙ্গে বুক পেতে দিয়েছে।

স্বৈর শাসক, সাবেক সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সরকারের পতন মূলত প্রথমে ছাত্র আন্দোলন, গণ আন্দোলন এবং গণ অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে এসে সফলতা পায়।

ক্ষমতা দখল

হুসেই মুহাম্মদ এরশাদ পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার পর ১৯৭৩ সালে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অ্যাডজুটান্ট জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১২ ডিসেম্বর ১৯৭৩ সালে তিনি কর্নেল ও ১৯৭৫ সালের জুন মাসে সেনাবাহিনীতে ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি পান। ১৯৭৫ সালের ২৪ অগাস্ট ভারতে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় তিনি মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি পান ও উপসেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। ১৫ অগাস্ট সামরিক অভ্যুত্থানের পর এরশাদ বাংলাদেশের দিল্লি মিশনের মাধ্যমে দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা জানিয়ে বার্তা পাঠান।

৩০ মে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হবার পর, এরশাদের রাজনৈতিক অভিলাষ প্রকাশ হয়ে পড়ে। ২৪ মার্চ ১৯৮২ সালে এরশাদ রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৩ সাল নাগাদ তিনি প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে দেশ শাসন করেন।

৯০’র গণ অভ্যুত্থান

১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালে বেশ কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গড়ে উঠা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিলে সেনাবাহিনীর হামলায় জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দীপালী সাহা সহ অনেক ছাত্র/ছাত্রী নিহত হয়। তখন থেকে জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে একটি লাগাতার ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়।

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলনের মিছিলে বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক/গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে রাজপথে নেমেছিলেন যুবলীগ নেতা নূর হোসেন। পরে জিপিও’র সামনে জিরো পয়েন্টের (বর্তমান শহীদ নূর হোসেন স্কয়ার) কাছে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন তিনি।

স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেন। ছবি : সংগৃহীত

এই হত্যাকান্ডের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ বিরোধী দলগুলো ১১ ও ১২ই নভেম্বর সারা দেশে সকাল সন্ধ্যা হরতাল ঘোষণা করে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন, ফলে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন আরোও ত্বরান্বিত হয়।

নূর হোসেনের হত্যার পরেও স্বৈর শাসন ব্যবস্থা চলমান থাকে আরও ৩ বছর। কিন্তু আন্দোলন অব্যাহত থাকে। ১৯৯০ সালের ১০ই অক্টোবর জেহাদ নামে একজন ছাত্র পুলিশ কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হলে সেই মৃত জেহাদের লাশকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে তৎকালীন ক্রিয়াশীল সকল ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সেখানে উপস্থিত হয়। ২৪টি ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে গড়ে উঠে ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’।

সেসময় আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি’র নেতৃত্বে রাজনৈতিক জোট একই সাথে আন্দোলন কর্মসূচী নিয়ে এগিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীও মাঠে ছিল। ১৯৯০ সালের অক্টোবর মাস থেকে ছাত্র সংগঠনগুলো ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের’ ব্যানারে আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল। তবে ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর চিকিৎসক নেতা ডা. শামসুল আলম মিলনকে হত্যার পর আন্দোলনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল।

ডা. মিলনকে হত্যার পর জেনারেল এরশাদ বিরোধী আন্দোলন আরো তুঙ্গে উঠে। তখন জনগণের ক্ষোভের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে শুরু করেছিল সেনাবাহিনী। একইসাথে জেনারেল এরশাদের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের প্রক্রিয়াও শুরু করেছিল তারা।

এদিকে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য এর আন্দোলনের সঙ্গে দেশের জনগণ সম্পৃক্ত হলে তা গণ আন্দোলন থেকে গণ অভ্যুত্থানে রুপ নেয় । সেই গণ অভ্যুত্থানে জেনারেল এরশাদ ৪ঠা ডিসেম্বর পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং ৬ই ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া সত্ত্বেও এরশাদ তাঁর অনুগত নবম ডিভিশনের জিও মেজর জেনারেল রফিকুল ইসলামের ওপর নির্ভর করে বাঁচতে চেয়েছিলেন। পরিস্থিতি আঁচ করে সেনাপ্রধান লে. জেনারেল নূরউদ্দীন রফিকের পুরো বাহিনী সাভারে পাঠিয়ে দেন। জেনারেল নূরউদ্দীন এবং সিজিএস মেজর জেনারেল আবদুস সালাম সারা দিন এরশাদের ফোন ধরেননি। সেনা কর্মকর্তাদের একটা বড় অংশ এরশাদের ‘অপকর্মের’ দায় আর বয়ে বেড়াতে চায়নি।

৬ ডিসেম্বর বেলা দুইটায় বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ উপরাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। এরশাদ নবনিযুক্ত উপরাষ্ট্রপতির
কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। এভাবেই শেষ হয় নয় বছরের এরশাদ-জমানা।

এরশাদের বিদায়ের পর রাস্তায় আনন্দ মিছিল। ছবি : সংগৃহীত

দীর্ঘ ৯ বৎসর পরিচালিত আন্দোলন ১৯৯০ এ এসে সফল হয়। ডিসেম্বর মাসের ৪ তারিখে জেনারেল এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দিলে রাস্তায় মানুষের ঢল নেমে যায়। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের কাছে জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা হস্তান্তর অর্থাৎ ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেই ঢল বজায় ছিল।

১৯৯০ সালে এরশাদের বিদায়ের পর। ছবি : সংগৃহীত

দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশে সুষ্ঠ গণতন্ত্রের চর্চা হবে এমনটাই প্রত্যাশ্যা ছিলো সবার। কিন্তু এরশাদের স্বৈর শাসন গণতন্ত্রকে মাটি চাপা দিয়ে দেয়। যেখান থেকে রাষ্ট্রকে বেরিয়ে আসতে ৯ বছর সময় লেগে যায়। ১৯৯০ সালে এরশাদ বিরোধী বা স্বৈর শাসন বিরোধী আন্দোলনের সফল সমাপ্তি ঘটে।

আজকের পত্রিকা/কেএইচআর/