ছবি: আজকের পত্রিকা

শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের ভিটিপাড়া গ্রামের ভিতর দিয়ে রেললাইন গেছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ রেললাইনের একটি অংশ ভিটিপাড়া গ্রামের মধ্যে। যে অংশটি ভিটিপাড়া গ্রামের মধ্যে পড়েছে, সেখানে মাটিকাটা নামে একটি ছোট নদীর উপর একটি রেলওয়ে ব্রিজ আছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই ব্রিজকে রক্ষার জন্য পাকিস্তানী বাহিনী ভিটিপাড়া গ্রামের রেললাইনের পূর্বপার্শ্বে অবস্থিত ভিটিপাড়া জুনিয়র বিদ্যালয়ে ক্যাম্প স্থাপন করে।

এই ক্যাম্পে শতাধিক পাকিস্তানী সৈন্য এবং দু শতাধিক রাজাকার থাকে। তাদের দায়িত্ব হচ্ছে রেলওয়ে ব্রিজটাকে রক্ষা করা। মুক্তিযোদ্ধারা যেন এ ব্রিজটি ধ্বংস করে না দেয়। কারণ এই ব্রিজটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি ধ্বংস হয়ে গেলে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। সুতরাং যাত্রী পরিবহন ও মালপরিবহন স্বাভাবিক রাখতে হলে অবশ্যই ব্রিজকে অক্ষত রাখতে হবে। ফলে মুক্তিযোদ্ধারা এই ক্যাম্পের পতন ঘটানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন।

শ্রীপুর উপজেলার প্রায় চার শতাধিক মুক্তিযোদ্ধাকে সংগঠিত করার জন্য নভেম্বরের শেষে সকল মুক্তিযোদ্ধাকে এক যৌথসভায় আহ্বান করা হলো। আমিও এই যৌথসভায় উপস্থিত ছিলাম। ডিসেম্বর মাসের শুরুর দিকে ক্যাম্পের তিনদিক থেকে একসাথে যৌথ আক্রমন চালানো হলো। মুক্তিযোদ্ধারা রাত ১২টার মধ্যে পুরো পাকিস্তানী ক্যাম্প ঘেরাও করে ফেললো। শুধু ক্যাম্পের পশ্চিম দিক খোলা রাখা হলো, যাতে পাকসেনারা আক্রমন থেকে বাঁচার জন্য কাওরাইদ অথবা শ্রীপুরের দিকে চলে যেতে পারে।

আমি সেকশন কমান্ডার ছিলাম। আমার অধীনে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আমি আমার এই ১১ জন যোদ্ধা নিয়ে আক্রমনে অংশগ্রহণ করি। প্রচন্ড আক্রমনের মুখে পাকবাহিনী ক্যাম্প ত্যাগ করে কাওরাইদের দিকে পলায়ন করে। ভোরেই মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্প দখল করে নেয়। ক্যাম্পে গিয়ে দেখি প্রতিটি ঘরে প্রচুর রক্ত। এতেই প্রমাণিত হয় যে, মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমনে একাধিক পাকসেনা এবংরাজাকার আহত অথবা নিহত হয়েছে।

ক্যাম্পের কাছেই একটি পুকুর ছিল। আমরা পুকুর পাড়ে অবস্থান নেই। পাকসেনারা দিনের আলোতে কাওরাইদ থেকে আরও সৈন্য নিয়ে পুনরায় ক্যাম্পে আসার চেষ্টা করে। আমরা তাদের আক্রমনের মুখে পড়ে যাই। একেবারে মুখোমুখি অবস্থান।কোনোভাবে পুকুর পাড় থেকে উঠে পিছু হটি। আমাদের গায়ে যে কোনো সময় গুলি লাগতে পারতো। বৃষ্টির মতো গুলি করে পাকসেনারা অগ্রসর হতে থাকে। আমরা কোনোভাবে সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হই। তবে পাকসেনারা আর সে ক্যাম্পে স্থায়ীভাবে থাকেনি। ক্যাম্প মুক্তই থাকে এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তই থাকে। এরপর থেকে পুরো এলাকা স্বাধীন হয়ে যায়। তখন থেকে শ্রীপুর থেকে কাওরাইদ এই দীর্ঘ জনপদে আর কোনো পাকিস্তানী সেনা ছিল না। তখন থেকে এই এলাকা স্বাধীন।

লেখক: মো. এমদাদুল হক
সেকশন কমান্ডার; কাওরাইদ, শ্রীপুর, গাজীপুর
সাবেক প্রধান শিক্ষক, ইসলামী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, মিরপুর ২, ঢাকা