মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব আলী। ছবি : সংগৃহীত

অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ-ই তারুণ্যের ধর্ম। আর যে তরুণদের সময়ে জাতি ঐক্যবদ্ধ হয় তারা ভাগ্যবান, কারণ তারা সুযোগ পায় নিঃসঙ্কোচে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার। ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি পাকিস্তানি শাসন-শোষনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, শুরু করেছিল মুক্তিযুদ্ধ, তারুণ্যের ধর্ম অনুযায়ী আমিও সে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। এটা আমার সৌভাগ্য।

আমি সোহরাব আলী। জন্ম ১৯৫৩ সালের ১ জানুয়ারি। আমার বাড়ি তৎকালীন সিরাজগঞ্জ মহুকুমার সদর থানার ছোনগাছা ইউনিয়নের ভাটপিয়ারী গ্রামে। পিতা আব্দুল গফুর শেখ, বৃটিশ সেনাবাহিনীর সৈনিক ছিলেন, অবসর জীবনে বাড়িতে ফিরে কৃষিকাজে মনোনিবেশ করেন। মাতা মোছাঃ সখিনা খাতুন, সারাজীবন গৃহস্থালি কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। আমরা ৬ ভাই ২ বোন, আমিই সবার বড়। ১৯৬৯ সালে এসএসসি পাশ করে সিরাজগঞ্জ কলেজে আইএ ক্লাসে ভর্তি হই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তখন সিরাজগঞ্জের ছাত্র রাজনীতিতে গ্রামের ছেলেরা প্রায় সবাই ছাত্রলীগ করতো। তাছাড়া, আমাদের গ্রামের এমএ রউফ পাতা, গোলাম কিবরিয়ারা ছিলেন সিরাজগঞ্জ মহুকুমা ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতা। এসব বিভিন্ন কারণেও কলেজে ঢুকেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ি। সেখান থেকেই পেয়ে যাই বাঙালি জাতীয়তাবাদের সবক। আন্দোলন সংগ্রাম মিছিল মিটিংয়ে অংশ নিতে থাকি নিয়মিত।

নেতাদের নির্দেশে ৭০ এর নির্বাচনে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পক্ষে এলাকায় দ্বায়িত্ব পালন করতে হয় ছাত্রলীগ কর্মীদেরই। অংশ নিতে হয় ভোট প্রার্থণা থেকে নির্বাচনের কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত। ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে আমি ভাটপিয়ারী এলাকায় দায়িত্ব পালন করি। সারাদেশে আওয়ামী লীগের পক্ষে জোয়ার আসে। নির্বাচনে আমাদের কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের এমএনএ প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদার ও এমপিএ প্রার্থী সৈয়দ হায়দার আলী বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। সারাদেশে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় হয়, আর এ বিজয়ের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ ঘটে বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তির। আমরা নিশ্চিত হয়ে যাই যে, এবার পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অর্থাৎ বাঙালিরাই পাবে।

কিন্তু ১৯৭১ সালের ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের একটি ঘোষনা পাকিস্তানের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এদিন তিনি ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষনা দেন। এর প্রতিবাদে সঙ্গে সঙ্গেই রাজপথে নেমে আসে জনতা, সবার মুখে শ্লোগান ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ বঙ্গবন্ধুও পাকিস্তানকে অসহযোগিতার আহবান জানান। আমরা প্রতিদিন কলেজে এসে স্বাধীনতার পক্ষে মিছিল করতে থাকি। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর রেসকোর্সের ঐতিহাসিক ভাষনের পর এলাকায় চলে যাই। এলাকার ছাত্র-তরুণেরা সেখানে অবসরপ্রাপ্ত আনসার ও পুলিশ সদস্যদের খুঁজে বের করি এবং ভাটপিয়ারী হাই স্কুলের মাঠে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি। এ প্রশিক্ষণে ক্যাডেট কলেজ ছাত্র গ্রামের রওশন ইয়াজদানী গুরুত্বপূর্ণ রাখে। ক্যাডেট কলেজের ছাত্র হিসেবে নিয়মিত প্যারেড, পিটি করতো, অস্ত্রের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণও ছিল তার। তাছাড়া ছিল সুঠাম দেহের অধিকারী, এ সব কারণে ভাটপিয়ারী প্রশিক্ষণে তার পক্ষে সহজেই প্রশিক্ষকের ভূমিকা পালন করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি তরুণদের প্রশিক্ষণ দিতে এগিয়ে আসেন সেনা সদস্য চান মিয়া, তিনি ওই সময় ছুটি নিয়ে বাড়িতে এসেছিলেন। আনসার সদস্য খোকা তালুকদার, ফরহাদ সহ আরো কয়েক জন প্রশিক্ষণে সহযোগিতা করেন। প্রশিক্ষণ সীমাবদ্ধ থাকে প্রধাণত বাঁশের লাঠি হাতে প্যারেড পিটিতে। এ প্রশিক্ষণ যুদ্ধে কতটুকু কাজে লেগেছে তা জানি না তবে, জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব হয়। তাদের মধ্যে এক ধরণের আশাবাদ জিইয়ে রাখা সম্ভব হয় যে, স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালি তরুণেরা লড়বে।
২৭ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ মহুকুমা শহর দখল করে নেয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। শহরের বেশীর ভাগ মানুষ ভীত হয়ে আগেই শহর ছেড়েছিল। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা লড়তে লড়তে পিছু হটে শহর ছেড়েছিল সে রাতেই। কোনও কোনও বাড়িতে দু’এক জন মানুষ বাড়িঘর দেখভালের জন্য থেকে গিয়েছিল। হানাদার বাহিনী বাহিরগোলা রেল স্টেশনে নেমেই বেশ কয়েক জনকে গুলি করে হত্যা করে ত্রাস সৃষ্টি করে। এর পর শহরের পনের আনা বাড়িঘর পুড়িয়ে শহরকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে। এ ছাড়া যাকে দেখতে পায় তাকেই পাখির মতো গুলি করে হত্য করে। গণহত্যা চালায় শহরতলীর গ্রামগুলিতে। তাদের নির্মম অত্যাচারে দিশেহারা হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। স্বাধীনতার কোলাহল, মহড়া থেমে যায়। গ্রামগুলো থমথমে হয়ে পড়ে। সরব হতে শুরু করে পাকিস্তানপন্থীরা। তারা মহুকুমা শহরে শান্তি কমিটি গঠন করে, ইউনিয়নে ইউনিয়নে, গ্রামে গ্রামে তার শাখা কমিটি গঠনে তৎপর হয়ে ওঠে।

এ সময় আমাদের এলাকায় খবর আসে যে, কুড়িগ্রাম মহুকুমার রৌমারী এখনো মুক্ত আছে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর সদস্যরা সেখানে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। প্রশিক্ষণ শেষে ভারত সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র দিয়ে দেশের ভিতরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এ খবর পেয়ে আমরা আশাবাদী হয়ে উঠি এবং বিভিন্ন গ্রামের ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করি। ভাটপিয়ারীর আশপাশের গ্রামের তরুণদের কাছে থেকে এর বেশ সাড়া মেলে। মে মাসের মাঝামাঝি ভাটপিয়ারী সহ বিভিন্ন গ্রামের আমি, আলতাফ হোসেন (ঝাঁটি বেলাই-কামারখন্দ), রঞ্জু (ঐ), মঞ্জু (ঐ), আব্দুল লতিফ (পারপাচিল), আবুল হাসেম (ভাটপিয়ারী), আবুল কাইয়ুম (ঐ), সোলায়মান (পারপাচিল), দলিলুর রহমান (ভাটপিয়ারী), আব্দুল জলিল (ঐ), আমিনুল (ঐ), রওশন ইয়াজদানী (ঐ) চাঁন মিয়া (ঐ) প্রায় ৬০ তরুণ একটি নৌকায় রওনা হই রৌমারীর দিকে। দুই দিন উজান ঠেলে যাওয়ার পর নৌকাটি ফুলছড়ি ঘাটের কাছে ডুবে যায়। আমরা সবাই সাঁতরে পাড়ে উঠতে সক্ষম হই। সেখান থেকে ছোট ছোট নৌকা ঠিক করে ভাগ ভাগ হয়ে চলে যাই মাইনকার চর।
মাইনকার চর আসাম প্রদেশের বাংলাদেশ সীমান্তের একটি ছোট্ট বাজার। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালি শরনার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের পদভারে জমজমাট হয়ে ওঠে বাজারটি। সেখান থেকে প্রায় তিন মাইল ভিতরে রৌমারী থানা। এ থানার অবস্থান ব্রহ্মপুত্রের চরের মধ্যে এবং ভারত লাগোয়া হওয়ায় কখনোই দখলে নিতে সাহস পায়নি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। তবে হামলা চালানোর চেষ্টা করেছে মাঝে মধ্যে। তাদের সে হামলা বীরত্বের সঙ্গে প্রতিহত করেছে বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এখানে বাংলাদেশের প্রকৃতি সহযোগিতা করেছে মুক্তিযোদ্ধাদের। যাইহোক, আমরা দল বেঁধে গেলাম কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে ঘেরা রৌমারী থানায়, সেখানে পত পত করে উড়ছে সবুজের মাঝে লাল বৃত্তে হলুদ রঙে আঁকা স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র। সাহসে বুকটা ভরে গেল, দেশের ভিতরে হায়েনারা দাপিয়ে বেড়ালেও এখনো কিছু এলাকা আছে, যেখানে স্বাধীন ভাবে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। প্রস্তুতি নেওয়া যায় তাদের তাড়ানোর।

রৌমারী থানার দারোগার অফিস মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের প্রধান অফিস। সেখানে প্রশাসনিক দায়িত্বে আছেন ছাত্রনেতা ইসমাইল হোসেন (দোয়াতবাড়ি)। প্রশিক্ষণের দায়িত্বে আছেন আমাদের এলাকার এমএনএ মোতাহার হোসেন তালুকদারের বড় ভাইয়ের ছেলে জহুরুল ইসলাম তালুকদার মিন্টু। তিনি সিরাজগঞ্জ মুকুল ফৌজের সংগঠক হিসেবে সুপরিচিত পাশাপাশি ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত। রৌমারীর ক্যাম্পটি মূলত ইয়ুথ ক্যাম্প, এখান থেকে রিক্রুট করে নিয়ে যাওয়া হয় ভারতের অভ্যন্তরে মূল প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। এখানে শরীর চর্চা, প্যারেড, পিটিই প্রধান প্রশিক্ষণ। নাম লেখালাম মুক্তিযুদ্ধে।

রৌমারী ইয়ুথ ক্যাম্প তখনো ঠিক মতো চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। যথাসময়ে পাওয়া যেত না রেশন, ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া হতো না। যখন রেশন আসতো তখন দু’বেলা খাওয়া পাওয়া যেত, তা-ও বেশী সময়ই খিচুড়ি। আর যখন রেশন পাওয়া যেত না তখন এক বেলা খাবার পাওয়া যেত। আবার কখনো কখনো হয়তো ক্যাম্প থেকে কোনও বেলাই খাবার পাওয়া যেত না। তখন বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া সামান্য পয়সা থেকে খরচ করতে হতো। দ্রুতই আরো ভোগান্তিতে পড়তে হলো আমাদের। তা হলো, বিভিন্ন ক্যাম্পে ছড়িয়ে পড়ছিল চোখ ওঠা আর চুলাকানি রোগ। আমাদের ক্যাম্পের প্রায় সবাইকেই এ রোগে আক্রমন করে বসেছিল। অথচ ক্যাম্পে না ছিল চিকিৎসা ব্যবস্থা। আমাদের যাওয়ার কয়েকদিন পরই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে লোক এলেন। আমরা লাইন করে দাঁড়ালাম তার সামনে। তিনি নেবেন কিছুটা অভিজ্ঞ লোক। কিন্তু আমাদের বেশীর ভাগই অস্ত্র সম্পর্কে কোনও অভিজ্ঞতাই নেই। আমাদের মধ্যে থেকে সুযোগ পেলেন রওশন ইয়াজদানী, কারণ তার রোভার্স স্কাউট থেকে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ ছিল। এ ছাড়াও সুযোগ পেলেন মিলিটারি চাঁন মিয়া। আমরা অনেকেই প্রশিক্ষণে যাওয়ার প্রথম সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে কিছুটা হতাশ হয়ে পড়ি। পাশাপাশি খাওয়ার সমস্যা, অসুখ-বিসুখেও মনটা অস্থির হয়ে ওঠে। আবার এলাকায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেই, ভাবি যে, এলাকায় গেলে অস্ত্রের একটা ব্যবস্থা হবেই।
জুন মাসের প্রথম দিকেই আবার ফিরে আসি এলাকায়। ইতিমধ্যেই এলাকায় খবর ছড়িয়ে পড়েছে যে, আমরা মুক্তিযুদ্ধে চলে গেছি, প্রশিক্ষণ আর অস্ত্র নিয়ে ফিরবো যে কোনও সময়। কিন্তু অস্ত্র ছাড়া প্রশিক্ষণ ছাড়াই ফিরে আসতে হলো। এলাকায় থমথমে অবস্থা, দাপিয়ে বেড়াচ্ছে স্বাধীনতা বিরোধীরা, ইউনিয়নে ইউনিয়নে শান্তি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আনসার বাহিনীর পরিবর্তে রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়েছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহযোগিতার জন্য। আমাদের ভাটপিয়ারী গ্রামেও রয়েছে স্বাধীনতা বিরোধীদের একটি শক্ত গ্রুপ, তাদের সহযোগিতায় গ্রামের কয়েক জনকে রাজাকার বাহিনীতে নাম লেখানো হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে এলাকায় স্বাধীনতার পক্ষে যারা আছেন তারা বের হওয়ার সাহস পান না। তার উপরে আমরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এলাকায় বিশেষ করে স্বাধীনতা বিরোধীদের কাছে চিহ্নিত হয়ে গেছি, ফলে এলাকায় আমাদের থাকা আরো মুশকিল। তাই আবারো সিদ্ধান্ত নিলাম রৌমারীতে চলে যাওয়ার। আবারো দল গঠন করা হলো। জুন মাসের শেষের দিকে আবারো রওনা হলাম রৌমারীর দিকে। এবারে আমাদের সঙ্গী হলেন আব্দুস সোবহান (ভাটপিয়ারী), ফুটবলার জয়নাল আবেদীন (সিরাজগঞ্জ কলেজের পাশ্বে) সহ প্রায় ৩০ জন। রৌমারী পৌঁছার পর আব্দুস সোবহান ও জয়নাল আবেদীনকে বয়স বেশী বলে ফিরিয়ে দেওয়া হলো। তাদের বলা হলো, এলাকায় মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসেবে কাজ করার জন্য।

এবারে গিয়ে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের উন্নতি দেখতে পেলাম। ক্যাম্প থানার ছোট পরিসর থেকে বাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে পাশের হাই স্কুলে। সামনে বিশাল মাঠ। সে মাঠেই ব্যবস্থা হয়েছে প্রশিক্ষণের। এবারে অস্ত্র প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআর সদস্যরা। বেলকুচির ইপিআর সদস্য নামদার হোসেন আর তালেব নামে একজনকে পেলাম অস্ত্র প্রশিক্ষণের ওস্তাদ হিসেবে। সেখানে নিয়মিত যাতায়াত করতেন ১১ নং সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল তাহের। সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুরু হতো প্রশিক্ষণ। প্রথমে প্যারেড পিটি সকাল আটটা পর্যন্ত। এর পর বিশ্রাম আর নাস্তা। ১০ টার দিকে শুরু হতো অস্ত্র প্রশিক্ষণ। স্কুলটিতে অনেকগুলো কৃষ্ণচূড়া গাছ, সেসব গাছের নিচে বসে বসে আমরা নিতাম শত্রু হননের অস্ত্র তালিম। সে সব অস্ত্রের মধ্যে ছিল থ্রিনটথ্রি, এসএলআর, এসএমজি, এলএমজি। গ্রেনেড নিক্ষেপও শেখানো হতো প্রশিক্ষণে। দুপুর ১টা পর্যন্ত চলতো সে প্রশিক্ষণ, তারপর খাওয়া ও বিশ্রামের বিরতি। বিকেল ৪টায় আবার অস্ত্র প্রশিক্ষণ। অস্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর যারা এসএসসি পাশ করেছে সে সব তরুণদের দেওয়া হলো এক্সপ্লোসিভ প্রশিক্ষণ, যাতে মুক্তিযোদ্ধারা সহজেই ব্রিজ-কালভার্ট, রাস্তা-বাঁধ উড়িয়ে দিয়ে পাক-হানাদার বাহিনীর চলাচল ব্যহত করতে পারি। প্রশিক্ষণ চলল এক মাসেরও বেশী সময় ধরে। এবার অস্ত্র হাতে বাংলাদেশের ভিতরে যাওয়ার অপেক্ষা। আমাদের স্বপ্ন নিজ এলাকা- যেখানকার রাস্তাঘাট, মানুষজন আমাদের পরিচিত- সে এলাকায় গিয়ে আমরা যুদ্ধ করবো।

প্রশিক্ষণ আর অস্ত্রের অপেক্ষায় কেটে গেল প্রায় দুই মাস। সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে ১১ সেক্টরের হেডকোয়ার্টার থেকে খবর এলো যে, গাইবান্ধার মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গ্রুপ ব্রিজ, রাস্তা, বাঁধ উড়িয়ে দেওয়ার জন্য সহযোগিতা চেয়েছে। সেখানে যেতে হবে আমাদের কয়েক জনকে। মনটা খারাপ হয়ে গেল, কারণ নিজ এলাকায় যুদ্ধ করতে যেতে পারছি না, আবার ভালো লাগলো এ কারণে যে, তবুও তো ক্যাম্প ছেড়ে যুদ্ধের মাঠে যেতে পারছি। আর গাইবান্ধা তো আমাদের এলাকা থেকে খুব বেশী দূরে নয়, হয়তো এলাকার কারো কারো সঙ্গে দেখাও হয়ে যেতে পারে। ময়মনসিংহের সেনাসদস্য আব্দুস সামাদের নেতৃত্বে দল গঠন করা হলো। সে দলে অন্তুর্ভূক্ত হলাম আমি, সানোয়ার হোসেন (পেঁচিবাড়ি), সিরাজ (তাড়াশ), জাহিদ হোসেন (ভাটপিয়ারী), আলতাব হোসেন (চিলগাছা), জুবেল (গাইবান্ধা), আবুল হাসেম (ভাটপিয়ারী)সহ মোট কুড়ি জন। মাইনকার চর থেকে নৌকায় উঠে পড়লাম আমরা সবাই।

ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম পাশে গাইবান্ধা মহুকুমা, পূর্ব পাশে ভারতের আসাম প্রদেশ। গাইবান্ধার সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থান এর চরাঞ্চল। এই এলাকা প্রাকৃতিক কারণে প্রায় সব সময় মুক্ত থাকতো। আমরা নামলাম গাইবান্ধার কালাসোনার চরে। সেখানে কোথায় থাকবো তা আগেই নির্দ্ধারণ করা ছিল। এলাকাবাসীর কাছে জানা গেল, পাকিস্তানি আর্মিরা সেখানে আসার সাহস পায় না। তবে দু’এক বার হামলা চালিয়ে এলাকাবাসীর ওপর অত্যাচার করা হয়েছে। আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম মুক্তিযোদ্ধাদের একটি কোম্পানির, যাদেরকে সহযোগিতা করতে হবে। কিন্তু তারা আর আসে না। একদিন স্থানীয় রঞ্জু গ্রুপ এলো আমাদের সাহায্যের জন্য। তারা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের রসুল সুইজ গেট উড়িয়ে দিতে চায়। কারণ এ বাঁধের ওপর দিয়ে মিলিটারিরা চলাচল করে থাকে। এ বাঁধ উড়িয়ে দিলে বিভিন্ন জেলার সঙ্গে পাকিস্তান আর্মির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা যাবে। রঞ্জু গ্রুপ রেকিও করে রেখেছে। যথা সময়ে হামলা চালানো হলো। কিন্তু ওদের ডিফেন্সটা অনেক মজবুত, অস্ত্রেও ওরা অনেক বেশী আধুনিক। আমরা যদি গুলি ছুঁড়ি একটা তবে ওরা তার জবাব দেয় শত গুলি ছুঁড়ে। ফলে আমরা আর সেই সুইজ গেট নিজেদের দখলে নিতে পারলাম না, সেটা ভেঙ্গে ফেলাও সম্ভব হলো না। তবে ওদের মধ্যে একটা আতঙ্ক সৃষ্টি করা সম্ভব হলো। ওদের কিছু গুলিও নষ্ট করা গেলো। এক সময় ফিরে এলাম নিজেদের আশ্রয়ে।

এর মধ্যে একদিন খবর পেলাম, আমাদের পাশের পাড়াতেই মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গ্রুপ অবস্থান করছে, তাদের সঙ্গে সিরাজগঞ্জের কয়েক জন মুক্তিযোদ্ধা আছেন। যুদ্ধের মাঠে নিজের পরিচিত বা এলাকার কারো খবর পেলে তাদের সঙ্গে দেখা করতে স্বাভাবিক ভাবেই মনটা উতলা হয়ে ওঠে। আমাদের অবস্থাও তাই। ছুটে গেলাম তাদের দেখতে। ওরা সেদিনই রৌমারীতে ফেরত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেখা হলো, সাইফুল (গজারিয়া), হাবিব (শিয়ালকোল). গোলাজার (আমলাপাড়া) সহ সিরাজগঞ্জের ৫ জনের সঙ্গে। সাইফুল জ্বরের ঘোরে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। ওদের সঙ্গে কিছুক্ষণ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে এলাম নিজেদের আশ্রয়ে।

একদিন এলাকাবাসী এসে খবর দিল যে, একটা নৌকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রেশন যাচ্ছে চিলমারীর দিকে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম সে নৌকা আক্রমনের। খবর নিয়ে জানা গেল, কয়েক জন রাজাকার সে নৌকা পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা সে নৌকায় আক্রমন চালালাম। আমাদের আক্রমনে তিন জন রাজাকার নিহত হলো, অন্যরা নৌকা ফেলে সাঁতরে ওপার উঠে পালিয়ে গেল, আমরা সে নৌকা দখলে নিয়ে চলে এলাম ব্রহ্মপুত্র নদে, কালাসোনার চরের পূর্ব পাশে, যেখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আসার সাধ্য নেই। পরে সে নৌকা পাঠিয়ে দেওয়া হলো ১১ নং সেক্টরের হেডকোয়ার্টারে। এ সফলতার জন্য হেড কোয়ার্টার থেকে আমাদের দলের প্রত্যেককে পুরস্কৃত করা হলো। কিন্তু আমরা যে গ্রুপকে সহযোগিতা করতে গাইবান্ধায় এসেছি, তারা তখনো গাইবান্ধায় এসে পৌঁছেনি। ফলে আমরা ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে উঠছিলাম। এ সময়েই নির্দেশ এলো ১১ নম্বর সেআরর হেড কোয়ার্টারে ফিরে যাওয়া জন্য।

ফিরে এলাম ১১ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার, মাইনকার চর থেকে একটু দূরে কামাখ্যা মন্দিরের কাছে। স্বপ্ন দেখছি, অস্ত্র হাতে ফিরে যাবো নিজ এলাকায়। কিন্তু সে অস্ত্র পেতে দেরী হচ্ছে বলে এলাকায় ফেরা হচ্ছে না। এর মধ্যে একদিন ছুটি নিয়ে গেলাম রৌমারীতে এলাকার লোকজনের সঙ্গে দেখা করতে। দেখলাম, ওখান থেকে সিরাজগঞ্জের সবাই উচ্চতর প্রশিক্ষণের প্রস্ততি নিচ্ছে, পরের দিনেই রওনা হবে সবাই। এদিকে, ১১ নম্বর সেক্টর থেকে আমাদের এলাকায় পাঠানো হবে কিনা, তা নিয়ে শুরু হয় দ্বিধাদ্বন্দ। কারণ, সিরাজগঞ্জ মহুকুমা ১১ সেক্টরের অধীনে নয়। ভিতরে ভিতরে বুদ্ধি করলাম, আমরাও রৌমারীর ওদের সঙ্গে যাবো উচ্চতর প্রশিক্ষণে। বিকেলে ফিরে এলাম হেডকোয়ার্টারে। গভীর রাতে আমরা সিরাজগঞ্জের কয়েক জন পালালাম ১১ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার থেকে। রৌমারীতে এসে সিরাজগঞ্জের তরুণদের সঙ্গে মিলে অক্টোবরের মাঝামাঝি চলে গেলাম শিলিগুড়ির পাথরঘাটা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে।

যুদ্ধের মাঠ থেকে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, এ যেন এক বিরক্তিকর বিষয়। টেনিং ভালো লাগে না, কারণ থ্রিনটথ্রি, এসএলআর, এসএমজি- এসব অস্ত্র তো আমাদের মুখস্থ। তবুও নিয়ম রক্ষার্থে প্রশিক্ষণ নিতেই হয়। প্রায় সবাই দেশে ফেরার জন্য অস্থির হয়ে পড়ছি। আমাদের নিয়ে গঠন করা হলো চার্লি কোম্পানি, কমান্ডার নিযুক্ত হলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর শিখ রেজিমেন্টের কর্মকর্তা ধীলন সিং। ধীরে ধীরে বুঝতে পারি যে, আমাদের ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করা হবে। তারা তাদের সঙ্গে থাকার জন্য বিভিন্ন প্রলোভনও দেখায়, কিন্তু আমরা বলতে থাকি যে, আমরা অন্য এলাকা চিনি না, এতে অসুবিধা হয়, তাই আমরা এলাকায় যেতে আগ্রহী। এসব আলোচনা চলতে চলতেই আমরা চলে গেলাম তরঙ্গপুর। সেখানে আমাদের ২৯ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে গঠন করা ৫২৮ নং টিম, লিডার নিযুক্ত করা হলো আমাকে, আর ডেপুটি টিম লিডার আমজাদ হোসেন (একডালা)। এবং আমাদের এলাকায় যাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। তরঙ্গপুর থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পৌঁছে দেওয়া হয় মাইনকার চরে। এটা নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহের কথা। ততদিনে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা পানি অনেক কমে গেছে, বড় নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা ছোট ছোট পাঁচটি নৌকা ঠিক করি এবং রওনা হই সিরাজগঞ্জের উদ্দেশ্যে। আমাদের ৫২৮ নম্বর টিমে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে এই মূহুর্তে যাদের নাম মনে পড়ছে তারা হলেন- সেজাবউদ্দিন (একডালা), আজাহার আলী (ঐ), ছফর আলী (ঐ), আব্দুস সামাদ (হাটবয়ড়া), মনোয়ার হোসেন (হাট বয়ড়া), আব্দুর রশীদ (একডালা), গোলাম হোসেন (চিলগাছা), আবুল হোসেন (ঐ), রেজাউল করিম (ঐ), আনিসুর রহমান (বাহুকা), সানোয়ার (পেচিবাড়ি), এসাবউদ্দিন (বয়ড়া), আব্দুল আজিজ (ব্রহ্মগাছা), শচীন ঠাকুর (ঐ), সুনীল (ভুইয়াগাতী), অখিল (ঐ), নিখিল (ঐ), সচীন ঠাকুর (ঐ) সিরাজ (নিমগাছী), হাসেম (ভাটপিয়ারী) সহ অন্যরা।

নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমরা সিরাজগঞ্জের মেছড়া ঘাটে এসে নামি এবং আশ্রয় নেই সে গ্রামেই। এলাকায় এসে একটি দুঃসংবাদ পাই, তাহলো, ভাটপিয়ারী আব্দুস সোবহান যাকে রৌমারী থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তিনি এলাকায় ফিরে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে কাজ করছিলেন, তাকে সহ আমার গ্রামের ৭ জনকে পাকিস্তানিরা গত ৭ নভেম্বর গ্রাম থেকে ধরে নিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করেছে। এ সংবাদে সবারই মন খারাপ হয়ে যায়। সিরাজগঞ্জের অবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য বিভিন্ন জনকে বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। খবর পাওয়া যায় যে, ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি গ্রুপ সিরাজগঞ্জে পৌঁছে গেছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী করণীয় নির্দ্ধারণের সিদ্ধান্ত নেই। এ সময় কাজীপুর থানায় মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাজীপুরে অবস্থানরত কয়েকটি গ্রুপ, আমরাও সে পরিকল্পনায় যুক্ত হই। ৩ ডিসেম্বর কাজীপুর থানা মুক্ত করার জন্য আক্রমন করা হয়। কাজীপুর থানায় অবস্থানরত পাকিস্তান সেনাবাহিনী, তাদের সহযোগি বাঙালি পুলিশ ও রাজাকারেরা ভীতসন্ত্রস্থ হয়ে পালিয়ে সিরাজগঞ্জের দিকে রওনা হয়। মুক্ত হয় কাজীপুর থানা। তারা আশ্রয় নেয় আমার নিজ গ্রামের ভাটপিয়ারী হাই স্কুলে, আমরা সেখানেও আক্রমনের সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু পাকিস্তানিরা সেখানে এক রাত থেকেই চলে যায় শৈলাবাড়ি ক্যাম্পে। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের পিছু ছাড়ি না, আমরা সেখানেও আক্রমনের সিদ্ধান্ত নেই।
১২ ডিসেম্বর সকাল থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন গ্রুপ ছোনগাছা মাদ্রাসায় জড় হতে শুরু করে। কমান্ডারদের বৈঠক বসে আক্রমনের কৌশল নিয়ে। সেখানে উপস্থিত থাকা এই মূহুর্তে যাদের নাম মনে পড়ছে তারা হলেন- আমির ভুলু (কাজীপুর), আলাউদ্দিন (ধীতপুর), ইসমাইল (রহমতগঞ্জ), জহুরুল (গজারিয়া), মুক্তা (মাড়োয়ারি পট্টি), ইসহাক আলী (দোয়াতবাড়ী), গোলাম কিবরিয়া (ভিক্টোরিয়া রোড) প্রমুখ। শৈলাবাড়িতে পাকিস্তানি ক্যাম্পের ঠিক পশ্চিমে আমাদের প্লাটুনের পজিশন দেওয়া হয়। শুরু হয় আক্রমন। কিন্তু বরাবরই ওরা আধুনিক অস্ত্রে বলীয়ান আর আমরা সাধারণ অস্ত্রে। কিন্তু আমাদের সংকল্প ছিল দেশ রক্ষার। আমরা অসীম সাহস নিয়ে লড়ে যেতে থাকি। রাত ১০ পর্যন্ত লড়াই করে আমরা উইথড্র করার সিদ্ধান্ত নেই। আমি আমার গ্রুপ নিয়ে চলে যাই ভাটপিয়ারীতে।

পরের দিন, অর্থাৎ ১৩ ডিসেম্বর ভাটপিয়ারীতে বসেই খবর পাই যে, আমির ভুলুর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা সিরাজগঞ্জ শহরে ঢোকার চেষ্টা করে। কিন্তু তখনো ফকিরপাড়া-কোবদাসপাড়ার মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত রেলব্রিজের কাছে বাঙ্কার করে অবস্থান করছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। তারা দল বেঁধে মুক্তিযোদ্ধাদের শহরের দিকে যেতে দেখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হামলা চালায়। সেখানে শহীদ হন ৪ মুক্তিযোদ্ধা। এদের কাউকে গুলি করে কাউকে বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করা হয়। শহীদ হন আহসান হাবীব (খারুয়া), ছফর আলী ফকির চাঁন (শিমলা), মকবুল হোসেন কালু (কুড়ালিয়া), শ্রী সত্যেন বাবু (নাটোর), আব্দুর রাজ্জাক মল্লিক (কাজীপুর)। এ খবরে বিমর্ষ হয়ে পড়ে মুক্তিযোদ্ধারা। শহরের পরিস্থিতি নিয়ে আমরাও খোঁজ খবর নিতে শুরু করি, পরিকল্পনা করি শহরে ঢুকে পড়ার।

১৪ ডিসেম্বর ভোরে আমরা আমাদের প্লাটুন নিয়ে রওনা হই সিরাজগঞ্জ শহরের দিকে। রাস্তায় খবর পাই যে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সিরাজগঞ্জ শহর ছেড়ে চলে গেছে। আমরা তখন জোর কদমে সিরাজগঞ্জ শহরে চলে আসি। শহরে ঢুকে খবর পাই যে, আমাদের আগে ইসমাইল ও তার সহযোদ্ধারা সিরাজগঞ্জ শহরে ঢুকেছিল। তারা সিরাজগঞ্জ থানার পাকিস্তানি পুলিশের মজুদ থাকা শতাধিক অস্ত্র নিয়ে চলে গেছে। অন্যদিকে খবর আসে যে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কালিয়াহরিপুর থেকে ফিরে আসছে। এ সময় আমরা ও আলাউদ্দিন (ধীতপুর) গ্রুপ কান্দাপাড়ায় ছুটে যাই এবং সেখানেই ডিফেন্স করি। পরে যখন নিশ্চিত হওয়া যায় যে, পাকিস্তানি বাহিনী আর ফিরে আসতে পারবে না, তখন ডিফেন্স থেকে উইথড্র করি। আমাদের প্লাটুন চলে যাই ভাটপিয়ারীতে।
পাকিস্তানি প্রশাসনে এসডিও ও এসডিপিওর দায়িত্বে ছিলেন যথাক্রমে এম আলিমুজ্জামান ও আব্দুল জব্বার। পাকিস্তানের সহযোগি হিসেবে তাদের ক্ষমতাহীন করে ফেলা হয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতারা সিরাজগঞ্জ মহুকুমার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেন। গড়ে তোলা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশাসন। সিরাজগঞ্জ মহুকুমা মুক্তিযুদ্ধের অধিনায়ক নির্বাচিত হন আমির হোসেন ভুলু। এসময় মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে দায়িত্ব পালন করায় এসডিও হিসেবে পরিচিতি পানসা ইসমাইল হোসেন (দোয়াতবাড়ি)। আইন-শৃক্সখলা রক্ষার্থে এবং প্রশাসন চালু করতে বিভিন্ন থানায় মুক্তিযোদ্ধাদের পাঠানো হয়। আমাদের দলকে পাঠানো হয় কামারখন্দের ঝাঁটিবেলাই গ্রামে, নক্সালপন্থী দমনের উদ্দেশ্যে। কামারখন্দ থানা মুক্তিযোদ্ধা প্রশাসনের দায়িত্ব পেয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা বিমল কুমার দাস।

কয়েক দিনের মধ্যেই প্রবাসী সরকার পাকিস্তানের সহযোগি কর্মকর্তাদের তুলে নিয়ে সেখানে নিয়োগ দিতে থাকেন অন্যদের। তারা মহুকুমা ও থানায় প্রবাসী সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করতে থাকেন। অপরদিকে, মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হতে থাকে।
আমরা কামারখন্দ থেকে ফিরে আসি শহরে। আমরা অস্ত্র জমা দেই এসএস রোডের রহিম বিহারীর বাড়িতে স্থাপিত মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লে. সাইফুল্লার কাছে। তারপর ফিরে যাই যার যার বাড়িতে।

অনুলিখন- সাইফুল ইসলাম

আজকের পত্রিকা/এমএইচএস