যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল

শনিবার দুপুর দেড়টা। ইজিবাইক দুর্ঘটনায় আহত পল্লী চিকিৎসক নীলকমল পালকে (৪৬) স্বজনরা নিয়ে যান যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে ভর্তি করে চিকিৎসার জন্য পাঠান পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে।

রোগীকে সেখানকার অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) নিয়েই দায়িত্বরত কর্মচারী খাইরুল ইসলাম স্বজনের হাতে একটি স্লিপ ধরিয়ে দেন। বাইরে থেকে কিনে আনা হয় পভিসেপ, জিপসনা ও সফরুল।

রোগী নীলকমল বিশ্বাস ওটি থেকে বেরিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আমাদের আমাদের প্রতিনিধিকে বলেন, এটা নাকি সরকারি হাসপাতাল। তার সব চিকিৎসা সামগ্রী বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়েছে। হাসপাতাল থেকে কিছুই দেয়া হয়নি।

চিকিৎসাধীন আরেক রোগী লালচাঁন জানান, ড্রেসিং ও পিলাস্টার করার জন্য সব কিছু তাকে বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।

মডেল ওয়ার্ডের ২০ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন মিরাজুল ইসলাম সাজু (২৮)। শনিবার তার পেটে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। রোগীর স্বজনরা আমাদের প্রতিনিধিকে জানান, অস্ত্রোপচার কক্ষ থেকে রোগীর জন্য কোনো চিকিৎসা সামগ্রী দেয়া হয়নি। অস্ত্রোপচারের আগে ওষুধের পাশাপাশি সুতা, ক্যাথেটার, ব্যান্ডেজ, তুলা, পভিসেপ ও গ্লোবস তাদের কিনতে হয়েছে।

একই অভিযোগ করেন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন একাধিক রোগী ও তাদের স্বজনেরা। তবে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বলেছেন, সুতা, পভিসেপ, জিপসনা, সফরুল, গজ, ব্যান্ডেজ, তুলা, গ্লোবস ও ক্যাথেটার হাসপাতালে অহরহ রয়েছে। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেড় কোটি টাকার এসব চিকিৎসা সামগ্রী কেনা হয়েছে রোগীদের বিনামূল্যে সরবরাহের জন্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোন রোগী ভর্তি হলেই এসব চিকিৎসা সামগ্রী বাইরে থেকে কিনে আনার জন্য স্বজনদের হাতে স্লিপ ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। সেবিকা ও কর্মচারীদের অনিয়মের কারণে রোগীরা বিনামূল্যের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, অস্ত্রোপচার কক্ষ, পুরুষ ও মহিলা সার্জারি ওয়ার্ড, পুরুষ ও মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ড, পুরুষ ও মহিলা পেয়িং ওয়ার্ড, মডেল ওয়ার্ড, লেবার ওয়ার্ড, গাইনী ওয়ার্ড, সংক্রামক ওয়ার্ড এবং শিশু ওয়ার্ডে প্রয়োজন মতো গজ, ব্যান্ডেজ, তুলা, গ্লোবস ও ক্যাথেটার সরকারিভাবে সরবরাহ রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ রোগীর ভাগ্যে তা জোটে না। হাসপাতালে সামনের ওষুধের দোকান থেকে এসব সামগ্রী কিনে আনতে হয়। তবে তদবির করার লোক থাকলে এসব চিকিৎসা সামগ্রী রোগীর ভাগ্যে মিলবে।

রোগীর স্বজন আতিয়ার রহমান জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে তার রোগী সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার রোগীকে বিনামূল্যের কোনো চিকিৎসাসামগ্রী দেয়া হয়নি। সব কিছু বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়েছে।

আরো কয়েকজন রোগীর স্বজন রাহেলা খাতুন, আছিয়া খাতুন, আব্দুর রউফ, আশাদুল ইসলাম, শাহিন হোসেন, টিটো মিয়া, পারুল ইসলাম, সালমা আক্তার জানান, রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসার জন্য ওয়ার্ডে আসলেই দায়িত্বরত সেবিকা অথবা কর্মচারীরা গজ, ব্যান্ডেজ, তুলা, গ্লোবস ও ক্যাথেটার কিনে আনার জন্য তাদের হাতে একটি স্লিপ ধরিয়ে দেন। হাসপাতালে এগুলো সরকারিভাবে সরবরাহ আছে কিনা তারা জানেন না। এমনি বিষয়টি ওয়ার্ড থেকে তাদের বলাও হয় না। তবে প্রভাবশালীদের পরিচিত কেনো রোগী আসলে এগুলো ওয়ার্ড থেকে দেয়া হয়। তাদের প্রশ্ন বিনামূল্যের এসব চিকিৎসা সামগ্রী কি শুধু প্রভাবশালীদের রোগীদের জন্য সরবরাহ করা হয়েছে। গরিব রোগীদের কি এসব পাওয়ার অধিকার নেই।

তারা জানিয়েছেন, ওয়ার্ডে দায়িত্বরত কতিপয় সেবিকা ও কর্মচারীর অনিয়মের কারণে সরকারি সুবিধা থেকে বি ত হচ্ছে সাধারণ রোগীরা। অভিযোগ উঠেছে, অধিকাংশ রোগীর স্বজনরা বাইরে থেকে কিনে আনা চিকিৎসা সামগ্রী সেবিকা ও কর্মচারীদের হাতে দেন। তারা এসব সামগ্রী গোপনে গায়েব করে দিচ্ছে। আর সরকারের সরবরাহকৃত চিকিৎসা সামগ্রী রোগীর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব সামগ্রীর গায়ে সরকারিভাবে কোনো সিল না থাকায় রোগীর স্বজনরা প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারে না। এভাবে প্রতিনিয়ত রোগী ও স্বজনদের বোকা বানানো হচ্ছে সরকারি।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আবুল কালাম আজাদ লিটু আমাদের প্রতিনিধিকে জানান, এসব চিকিৎসা সামগ্রী রোগীদের বিনামূল্যে দেয়ার জন্য প্রতিটি ওয়ার্ড ইনচার্জ সেবিকা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগে দায়িত্বরত কর্মচারীকে নির্দেশনা দেয়া আছে। কোনো সেবিকা ও কর্মচারী এগুলো ঘিরে যদি অনিয়ম করে ও বাণিজ্যে লিপ্ত হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ইয়ানূর রহমান/যশোর