এম. এ. আর. শায়েল
সিনিয়র সাব এডিটর

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতীকী।

যশোর সদর ও শহর আওয়ামী লীগের সম্মেলন ঘিরে সভাপতি সম্পাদক প্রার্থীদের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। পদ প্রত্যাশীরা চালাচ্ছেন নানা তৎপরতা। দীর্ঘ ১৫ বছর পর সদর আওয়ামী লীগের ১১ নভেম্বর ও শহর আওয়ামী লীগের ১০ নভেম্বর সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। তাই দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলন ঘিরে নেতাকর্মীদের মাঝে বিরাজ করছে বাড়তি আমেজ।

যশোর সদর আওয়ামী লীগ:
প্রায় ১৫ বছর পরে আগামী ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যশোর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন। আর এই সম্মেলনকে ঘিরে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ প্রত্যাশিরা শুরু করেছেন তৎপরতা। সাধারণ নেতাকর্মীদের মাঝেও বিরাজ করছে আমেজ।

সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল ২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। সেদিন কাউন্সিলারদের ভোটে সভাপতি পদে মোহিত কুমার নাথ এবং সাধারণ সম্পাদক পদে মেহেদী হাসান মিন্টু নির্বাচিত হন।

সেদিনের সম্মেলনে বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন ও সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত আব্দুল হাই নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হন। সাধারণ সম্পাদক পদে মেহেদী হাসান মিন্টুর একমাত্র প্রতিদ্বন্দী ছিলেন বর্তমান ইছালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সংগঠনিক সম্পাদক এসএম আফজাল হোসেন।

সম্মেলন সামনে রেখে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ প্রত্যাশিরা দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণসহ শীর্ষ নেতাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। কেউ কেউ প্যানা ঝুলিয়ে আবার কেউ কেউ ফেসবুকে গ্রচারণা চালাচ্ছেন।

সভাপতি পদে নাম শোনা যাচ্ছে বর্তমান সভাপতি মোহিত কুমার নাথ, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান মিন্টু, সহসভাপতি মীর আরশাদ আলী রহমানের নাম।

সাধারণ সম্পাদক পদে সাংগঠনিক সম্পাদক ও আরবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহারুল ইসলাম, লেবুতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলীমুজ্জামান মিলন, সাবেক উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান সুলতান মাহামুদ বিপুল, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহরাব হোসেন, যুবলীগ নেতা শাহিদুজ্জামান প্রমুখ।

এ বিষয়ে সভাপতি প্রার্থী বর্তমান সভাপতি মোহিত কুমার নাথ বলেন, জেলা সম্মেলনের অপেক্ষায় ছিলাম কিন্তু সেটা যখন হচ্ছে না তখন উপজেলা আওয়ামী লীগে আবারও সভাপতি পদে প্রার্থী হবো।

মেহেদী হাসান মিন্টু বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এবার সভাপতি পদে আসতে চাই। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে কাউন্সিলর দিয়ে ভোট করা কঠিন। কারণ সে প্রস্তুতি নেই। তবুও তার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে আছি।

এসএম আফজাল হোসেন বলেন, প্রার্থী হওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই। তবে আমাদের নিজেদের মধ্যে বসাবসি হলে তারপর দেখা যাবে।

কর্মিদের মাঝে আলোচনায় থাকলেও ইউপি চেয়ারম্যান শাহারুল ইসলাম বলেন, আমি কোনো পদপ্রার্থী না, আমি চাই দল শক্তিশালী করতে সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হোক। তিনি বলেন, দল সবসময়ই দ্বিধা বিভক্ত আছে। আমি নিজেও একটা পক্ষের। সেখান থেকে প্রার্থিতা বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।

সার্বিক বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন বলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে আমার কোনো প্রার্থী নেই। সবাই আমার প্রার্থী। তিনি বলেন, কেন্দ্র থেকে সম্মেলনের নির্ধারিত তারিখ পরিবর্তনের সুযোগ নেই।

যশোর শহর আওয়ামী লীগ:
দীর্ঘ ১৫ বছর পর আগামী ১০ নভেম্বর যশোর শহর আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনকে সামনে রেখে দলীয় নেতকর্মীরা সরব হয়ে উঠেছেন। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ প্রত্যাশী ডজনখানিক নেতা প্রচারণার পাশাপাশি জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাসহ তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। কেউ কেউ আবার কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়তে ছুটছেন ঢাকায়।

তবে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন চাকলাদার বলছেন, ৯ অক্টোবর জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিতসভায় শহর ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ হবে।

জানা যায়, সর্বশেষ ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয় শহর আওয়ামী লীগের সম্মেলন। সেদিন সমঝোতার মাধ্যমে এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে অ্যাডভোকেট আবুল হোসেনকে সভাপতি এবং আশরাফ আলী বিশ্বাসকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটির অনুমোদন দেয়া হয়।

তবে সম্মেলনের বছর তিন পরে আশরাফ আলী বিশ্বাস মৃত্যুবরণ করলে যুগ্মসাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন সিদ্দিকী ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু তিনিও বছর দুই আগে মৃত্যুবরণ করলে পরবর্তী যুগ্মসাধারণ সম্পাদক ইমাম হাসান লাল বর্তমানে শহর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এদিকে, সম্মেলনকে সামনে রেখে নতুন কমিটির নেতৃত্বে আসতে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হলেন- সভাপতি পদে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান, শহর আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম আহবায়ক ফিরোজ খাঁন, অন্যতম নেতা কামাল হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান আসাদ, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মহিউদ্দিন আহমেদ ও পৌর কাউন্সিলর গোলাম মোস্তফা।

সাধারণ সম্পাদক পদে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ইমাম হাসান লাল, ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়া নেতা পৌর কাউন্সিলর মোস্তাফিজুর রহমান মুস্তা, জেলা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আজাহার হোসেন স্বপন, পৌর কাউন্সিলর মোকসিমুল বারী অপু, সাবেক কেন্দ্রীয় ও জেলা ছাত্রলীগ নেতা, বর্তমান জেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক লুৎফুল কবীর বিজু ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শাজাহান কবীর শিপলু।

জানতে চাইলে সভাপতি পদপ্রার্থী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান বলেন, এবার সম্মেলনে শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রার্থী হতে চাই। তবে তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে। এজন্য সকল প্রস্তুতি আছে বলেও জানান তিনি।

আরেক সভাপতি পদপ্রার্থী মৎস্য ব্যবসায়ী ফিরোজ খাঁন জানান, বিগত দিনে এক এগারোর সময়ে তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত শরীফ আব্দুর রাকিবের নেতৃত্বে মিছিল মিটিং করেছি। পদে না থাকলেও জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে সমুন্নত রাখতে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই আছি। প্রার্থী হিসেবে নেতাকর্মীদের কাছে যাচ্ছি।

কামাল হোসেন বলেন, ২০০৪ সালের সর্বশেষ সম্মেলনে শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী ছিলাম। কিন্তু একপর্যায়ে সমঝোতার মাধ্যমে কমিটি গঠিত হলে সে কমিটিতে ঠাঁই হয়নি। তিনি বলেন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন এবং সদর আসনের সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদের আশীর্বাদ নিয়ে এবার সভাপতি প্রার্থী হচ্ছি।

গোলাম মোস্তফা বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই রাজপথে থেকে রাজনীতি করছি। এবার শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে প্রার্থী হবো।

তিনি বলেন, সভাপতি পদে এখন যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তাদের অনেককেই আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে দেখা যায়নি। কারো আশির্বাদ নিয়ে নয় কর্মীদের সমর্থনে প্রার্থী হবো।

শহর আওয়ামী লীগের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এবং সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী ইমাম হাসান লাল বলেন, নীতি এবং আদর্শের মধ্যে থেকেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছি। দলের পরিচয় ব্যবহার করে কোনো অনৈতিক কর্মে নিজেকে সম্পৃক্ত করিনি। তিনি বলেন, নিজের যে ইমেজ আছে তাতে কর্মীরা আমাকে বিমুখ করবে না।

অপর সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী আজাহার হোসেন স্বপন বলেন, সকল কাজে কেনো গ্রুপ দেখিনি। জননেত্রী শেখ হাসিনার কর্মী হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে আদর্শ মনে করে কাজ করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, শহর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হিসেবে অংশ নেবো। এতে কর্মী-সমর্থকরা আমার পক্ষে থাকবে।

কর্মীদের মাঝে আলোচনায় থাকলে পৌরসভার ৪নম্বর ওয়ার্ডের একাধিক বারের নির্বাচিত কাউন্সিলর মুস্তাফিজুর রহমান মুস্তা বলেন, শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবো এমন সিদ্ধান্ত নেইনি।

কাউন্সিলর মোকসিমুল বারী অপু বলেন, সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদের অশীর্বাদ নিয়ে শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবো। সে অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছি।

সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী লুৎফুল কবীর বিজুর দাবি, ছাত্রজীবন থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ তাকে সাধারণ সম্পাদক পদে একক প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, মাননীয় এমপি সাহেবের নির্দেশনায় কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ রাখছি। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা তাকে আশাহত করবেন না বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন চাকলাদার বলেন, শহর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে আমার কোনো প্রার্থী নেই। তৃণমূল যাদের পক্ষে থাকবে সেই হবে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক।

ইয়ানূর রহমান/যশোর