২৩ মে নেত্রকোনার পূবর্ধলার জারিয়া এবং দুর্গাপুরের ঝাঞ্জাইলে ভোগাই-কংশ নদীর খনন কাজ উদ্বোধন করেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। ছবি : সংগৃহীত

আগামী ২৫ মাসের মধ্যে মোহনগঞ্জ হতে নালিতাবাড়ি পর্যন্ত ১৫৫ কিলোমিটার নৌপথ খননের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ ( বিআইডব্লিউটিএ) । ২৩ মে বৃহস্পতিবার থেকে খনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ২০২১ সালের জুন মাসের মধ্যে কংশ নদী খনন প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।

এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সারাবছর কংশ নদী দিয়ে ৮ ফুট গভীরতার নৌ-যানসমূহ চলাচল করতে পারবে। এছাড়া এতদাঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে এবং কৃষি কাজে ও মৎস চাষে ব্যাপক উন্নতি ঘটবে বলে সংশ্লিস্ট ড্রেজিং প্রকৌশলীরা আশা প্রকাশ করছেন।

পাশাপাশি নেত্রকোণার বড়হাট্টা উপজেলার বাউশি হতে নদীটি কাউনাই নাম ধারণ করে ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ মোহনগঞ্জ এই তিনটি উপজেলা এলাকার নৌপথে সরাসরি নৌ-যোগাযোগ সহজ হবে এবং যাত্রী চরাচলও পুনরায় চালু হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের ( বিআইডব্লিউটিএ) রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে।

কংশ নদীর খনন কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন কালে মোনাজাত করেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী। ছবি : সংগৃহীত

২৩ মে বৃহস্পতিবার নেত্রকোনা জেলার পূবর্ধলার জারিয়া এবং দুর্গাপুরের ঝাঞ্জাইলে ভোগাই-কংশ নদীর খনন কাজ উদ্বোধন করেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের পরিবহন সেক্টরে নৌপরিবহন ব্যবস্থা একটি সাশ্রয়ী, আরামদায়ক ও পরিবেশ বান্ধব যোগাযোগ মাধ্যম’।

তিনি বলেন, ‘নাব্যতা সংকটের কারণে ধীরে ধীরে ঐতিহ্যবাহী নৌপথগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। নৌপথের নাব্যতা ফিরিয়ে এনে দেশের আবহমান ঐতিহ্য পুনঃরুদ্ধারসহ আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ঘটাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধিন সরকার দশ হাজার কিলোমিটার নৌপথ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে’।

তিনি আরও বলেন, ‘নদীভিত্তিক নৌপথ সমৃদ্ধ হচ্ছে। চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরের উন্নয়ন হচ্ছে’। তিনি বলেন, ‘উন্নয়নের জন্য সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে’।

এসময় অন্যান্যের মধ্যে সংসদ সদস্য ওয়ারেসাত হোসন বেলাল বীর প্রতীক, সংসদ সদস্য মানু মজুমদার, বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমডোর এম মাহবুব উল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, মোহনগঞ্জ হতে নালিতাবাড়ি পর্যন্ত ১৫৫ কিলোমিটার নৌপথে এক কোটি ঘনমিটার মাটি খনন করা হবে। এজন্য ব্যয় হবে ১৩৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।

পাঁচটি কোম্পানি যথা- বসুন্ধরা ইনফ্রাস্টাকচার ডেভলাপমেন্ট লিমিটেড, সোনালী ড্রেজার লিমিটেড, বিডিএল- এসআরডিসি, এস এস রহমান-মাতৃবাংলা এবং নবারুন ট্রেডার্স লিমিটেড মোহনগঞ্জ, বারহাট্টা, পূর্বধলা, ফুলপুর, নালিতাবাড়ি উপজেলায় খনন কাজ করবে।

উল্লেখ্য, ভোগাই কংশ নদীটি একটি সীমান্ত নদী। নৌ-পথটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার। নদীটি শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রকুরা মান্দালিয়া ইউনিয়ন দিয়ে ভোগাই নদী নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

এরপর নদীটি মরিচপুড়া ইউনিয়নে দুইটি ভাগে যথাক্রমে ইছামতি ও কংশ নামে বিভক্ত হয়ে ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুর উপজেলার ফুলপুর ইউনিয়নে পুনরায় মিলিত হয়ে কংশ নাম ধারন করেছে। বর্তমানে ভোগাই নদীর মূল প্রবাহ ইছামতি নদীর গতিপথে প্রবাহিত হয়।

নেত্রকোণার বড়হাট্টা উপজেলার বাউশি হতে নদীটি কাউনাই নাম ধারণ করে ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ মোহনগঞ্জ এই তিনটি উপজেলার সংযোগস্থলে ফিনারবাক ইউনিয়নে বাউলাই নদীতে পতিত হয়েছে। শুধুমাত্র বর্ষাকালে কংশ নদী পথে সামান্য পানি প্রবাহিত হয়। এই গতিপথ বর্তমানে মরা চ্যানেলে পরিণত হয়েছে।

জানা গেছে, কংশ নদীটি ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা জেলার মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে সুমানগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাক ইউনয়নে বাউলাই (বালুয়া) নদীতে পতিত হয়েছে। নদীটির গতিপথে শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী, ময়মনসিংহ জেলার ধুবাউড়া ও নেত্রকোণা জেলার দূর্গাপুর উপজেলায় যথাক্রমে মালিজি, নিতাই ও সোমেশ্বরী নদী তিনটিতে মিলিত হয়েছে।

আবার নেত্রকোণা সদর উপজেলা ও বারহাট্টা উপজেলায় যথাক্রমে ধলাই-বিশনাই ও গুলাম খালী নামে দুইটি নদী উৎপন্ন হয়েছে। বর্তমানে ভোগাই-কংশের মূল প্রবাহ এই দুইটি নদীপথে বেশী প্রবাহিত হয়। ফলে নদীটিতে শুস্ক মৌসুমে পানির প্রবাহের পরিমাণ নাই।

ভাটিতে নদীটির প্রস্থ দিন দিন কমে যাচ্ছে এবং তলদেশ ভরাট হয়ে আবাদি জমিতে পরিনত হয়েছে। জারিয়া নামক স্থানে নদীর পারে সুইসগেট দিয়ে বিলের পানি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এককালে এই অঞ্চলের যোগাযোগ, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্য পুরোপুরি এ নদীর উপর নির্ভরশীল ছিল।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, কালের বিবর্তনে পলি পড়ে ভোলাই-কংস নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার কারনে বর্তমানে শুধুমাত্র বর্ষাকালে এ নৌ-পথে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় যাত্রী ও ছোট ছোট কার্গোয় মালামাল পরিবহন করা সম্ভব। শুস্ক মৌসূমে নাব্যতা সংকটের কারনে অল্প কিছু বিচ্ছিন্ন অংশ ছাড়া এ নৌ-পথ নৌ-চলাচলের জন্য অনুপযোগী হয়ে পড়ে এবং সেচের জন্য প্রয়োজনীয় পানির অভাবে কৃষিকাজ মারাতœকভাবে ব্যহত হয়।

এ নৌ-পথে বেশ কিছু ব্যবসা কেন্দ্র অবস্থিত। নৌ-পথে নাব্যতা না থাকায় এসব ব্যবসা কেন্দ্রে সড়ক পথে মালামাল পরিবহন করা হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে পরিবহন খরচ অনেকটা বেশী হচ্ছে। নৌ-পথে সার্বক্ষনিক নির্বিঘ্নে কার্গো/নৌ-যান চলাচল অক্ষুন্ন রাখার নিমিত্তে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নৌ-পথটির নাব্যতা ফিরিয়ে এনে এ অঞ্চলের জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য বিআইডব্লিউটিএ ‘অভ্যন্তরীন নৌ-পথের ৫৩টি রুটে ক্যাপিটাল ড্রেজিং (১ম পর্যায়- ২৪টি নৌ-পথ)’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে শুস্ক মৌসূমে ৮ ফুট গভীরতা রাখার জন্য খনন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

আজকের পত্রিকা/আরবি/এমএআরএস