মুক্তিযুদ্ধে যোগদান না করে এপ্রিলের প্রথম দিকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাড়ি জমান এরশাদ। ছবি: সংগৃহীত

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ- বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক অদ্ভুত রহস্যময় চরিত্র, অনেকক্ষেত্রে ঘৃণিতও। রাজনীতির মতো সিরিয়াস একটি ফিল্ডে একজন সাবেক রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে এত হাস্যরসাত্মক কৌতুকের সৃষ্টি এর আগে বাংলাদেশে কখনো হয়েছে বলে জানা নেই। এরশাদ মানেই যেন হাসির পাত্র! অথচ তাঁর ছিল দীর্ঘ এক বর্ণাঢ্য জীবন।

সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত…রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো অলঙ্কিত না কলঙ্কিত করেছিলেন এরশাদ, সেসব বিচার-বিশ্লেষণ হয়তো তাঁর মৃত্যুর পর খুব নগণ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সাবেক এই রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের বিভিন্ন অংশ নিয়ে আজকের পত্রিকা এই অংশে থাকছে মুক্তিযুদ্ধের এরশাদের ভূমিকা প্রসঙ্গ।

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অবস্থায় এরশাদের ভূমিকা সম্পর্কে কম-বেশি সবারই জানা রয়েছে। তবে অনেকেই জানেন না মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে। ১৯৭১-১৯৭২ সাল ৭ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ড্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। বিভিন্ন তথ্য মতে জানা যায়, ১৯৭১-এ স্বাধীনতাযুদ্ধের শুরুর সময় এরশাদ ছুটিতে রংপুর ছিলেন। কিন্তু তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগদান না করে এপ্রিলের প্রথম দিকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাড়ি জমান। অসুস্থ পিতা মোহাম্মদ মকবুল হোসেনকে দেখার জন্য সেপ্টেম্বরে এরশাদ পুনরায় রংপুর এসেছিলেন বলে জানা যায়। তবে দেশে ফিরেও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি তিনি। এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি পাকিস্তানে ফিরে যান।

স্বাধীনতা যুদ্ধে ১নং সেক্টরে দায়িত্বপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডার মেজর (অবঃ) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তমের লেখা বই ‘প্রতিরোধের প্রথম প্রহর’ থেকে জানা যায়, পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙ্গালি অফিসার ও সৈন্যদের মধ্যে যারা পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলেন, দেশদ্রোহিতার অভিযোগে তাদের পাকিস্তানে বিচার শুরু হলে এরশাদ সেই ট্রাইবুনালের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন । যদিও এরশাদ বহুবার এই তথ্যকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেছেন, বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক সাফল্যের কারণে পাকিস্তানি আটকে পড়া বাঙালি অফিসাররা পরবর্তীতে দেশে ফিরেন।

এছাড়া দেশে ফেরার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই এরশাদকে পদোন্নতি দিয়ে আর্মি হেড কোয়ার্টারে এডজুটেন্ড জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেন বলে জানান এরশাদ। এমনকি বঙ্গবন্ধুই তাকে প্রথমবারের মতো এনডিসি কোর্স করাতে ভারতে পাঠিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বহু জায়গায় এরশাদ মন্তব্য করেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাকে কাছ থেকে জানতেন, তাই আমি এ পুরস্কার পেয়েছি।’

ইতিহাসের বিভিন্ন সুত্রের তথ্যমতে, পাকিস্তান থেকে আটকে পড়া বাঙালিরা যখন ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরে আসে তখন তিনিও প্রত্যাবর্তন করেন। যেসব অফিসার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেছিলো এরশাদ ছিলো তাদের মধ্যে সিনিয়র মোস্ট। এমনিতেই তিনি জিয়াউর রহমান ও শফিউল্লার সিনিয়র ছিলেন। তবে দেশে ফিরে আসলে তার চাকরিচ্যুতি হয়। চাকরিচ্যুতির কারণ ছিলো মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তার ভূমিকা।

১৯৭৩ সালের শেষের দিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদে কর্মরত বাঙালি অফিসার ও সদস্যদের পাকিস্তান থেকে ফেরত পাঠানো হয়। পাকিস্তান-ফেরত অফিসারদের মধ্যে তৎকালীন লে. কর্নেল এরশাদও আসেন। তাঁকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অ্যাডজুটান্ট জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১২ ডিসেম্বর ১৯৭৩ সালে তিনি কর্নেল ও ১৯৭৫ সালের জুন মাসে সেনাবাহিনীতে ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি পান। এরপর তাঁকে পাঠানো হয় ভারতে এন.ডি.সি কোর্স করতে। সম্ভবত উনিই প্রথম বাংলাদেশী সামরিক অফিসার যিনি এই কোর্স করার সুযোগ পান।

কথিত আছে যে, দেশে ফিরে আসার পর এরশাদ তাঁর মামা তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা এম কোরবান আলীর সহযোগীতায় বঙ্গবন্ধুর সাথে ব্যক্তিগত সাক্ষাতের সুযোগ পান। এরশাদ সেদিন বঙ্গবন্ধুর কাছে মুজিব কোট পরে যান। বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়েই তিনি তাঁর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করেন। এই সামরিক কর্মকর্তার এমন বিনয়ী আচরনে বঙ্গবন্ধু মুগ্ধ হন। এবং জানা যায় ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই এরশাদের চাকরি পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন বঙ্গবন্ধু।

পাকিস্তান ফেরত সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের পুনরায় চাকরিতে বহাল রাখায় এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এক সরকারি আদেশে সামরিক ও বেসামরিক পর্যায়ে সরকারী চাকরিজীবী মুক্তিযোদ্ধাদের দুই বছরের জ্যেষ্ঠতা দেওয়ায়- মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেনা এবং পাকিস্তান ফেরত সেনাদের মধ্যে মানসিকভাবে এক যুদ্ধ চলতে থাকে। সরকারী চাকরিজীবী মুক্তিযোদ্ধাদের দুই বছরের জ্যেষ্ঠতা দেওয়াকে পাকিস্তান ফেরত কোনো সেনা অফিসার ও সদস্য মেনে নিতে পারেননি। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এরশাদ বাংলাদেশে আগমনের পর আর্মি হেড কোয়ার্টারের প্রথম কনফারেন্সে মুক্তিযোদ্ধাদের দুই বছরের সিনিয়রটিকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।

এরই ধারাবাহিকতায় সেনাবাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধা ও অ-মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে এক স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হয়। বিভিন্ন সেনা কর্মকর্তা লিপ্ত হন নানা রকম ষড়যন্ত্রে। জানা যায়, এরশাদও ওইসব ষড়যন্ত্রে কিছু ভূমিকা রেখেছিলেন। কর্নেল (অব:) শাফায়াত জামিলের ভাষ্য অনুযায়ী, ৭৪ সালের শেষ দিকে মেজর ডালিমের সঙ্গে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা গাজী গোলাম মোস্তফার একটি পারিবারিক দ্বন্দ্বকে তদানীন্তন কর্নেল এরশাদ আরও উস্কে দিয়েছিলেন। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তিনি একদল তরুণ অফিসারকে নেতৃত্ব দিয়ে তৎকালীন সেনা উপ-প্রধান মেজর জেনারেল জিয়ার অফিসে যান এবং ওই ঘটনায় সেনাবাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপের দাবি করেন। অথচ এরশাদ তখন সেনাবাহিনীর সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।

১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট ভারতে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় তিনি মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি পান ও ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ হিসেবে নিয়োগ পান।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সরাসরি হত্যার পর সেনা প্রধান শফিউল্লাহকে অব্যাহতি দিয়ে তাকে রাষ্ট্রদূত এবং উপ-সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করা হয়। একই সাথে তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার এইচ এম এরশাদকে নিয়ম ভেঙ্গে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে উপ-সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ করা হলো।

বঙ্গবন্ধু নিহত ও পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পেলে এরশাদ কাউকে কিছু না বলে দিল্লী থেকে ঢাকায় চলে আসেন। কর্নেল (অব:) শাফায়াত জামিলের ভাষ্যমতে, মেজর জেনারেল জিয়ার সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার দ্বিতীয় দিন হঠাৎ করেই সেনাপ্রধান জিয়ার কক্ষে প্রবেশ করেন এরশাদ। এরশাদের তখন প্রশিক্ষণের জন্য দিল্লীতে থাকার কথা। তাকে দেখা মাত্র জিয়া অত্যন্ত রূঢ়ভাবে জিগ্যেস করলেন, তিনি বিনা অনুমতিতে কেন দেশে ফিরে এসেছেন। জবাবে এরশাদ বলেন- তিনি দিল্লীতে অবস্থানরত তার স্ত্রী জন্য একজন গৃহ-ভৃত্য নিতে এসেছেন। তা শুনে জিয়া রেগে গিয়ে বলেন, আপনার মতো সিনিয়র অফিসারদের এই ধরনের লাগামছাড়া আচরণের জন্যেই জুনিয়র অফিসাররা রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করে দেশের ক্ষমতা দখলের মতো কাজ করতে পেরেছে।’

পরবর্তী ফ্লাইটেই এরশাদকে দিল্লী ফিরে যেতে নির্দেশ দেন জিয়া। সঙ্গে বঙ্গভবনে যাওয়ার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন। পরদিন ভোরে এরশাদ তার প্রশিক্ষণ-স্থল দিল্লীতে চলে গেলেন ঠিকই, কিন্তু সেনাপ্রধান জিয়ার নির্দেশ অমান্য করে রাতে তিনি বঙ্গভবনে যান। অনেক রাত পর্যন্ত সেখানে অবস্থানরত অভ্যুত্থান-কারীদের সঙ্গে বৈঠকও করেন তিনি।

জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালে জেনারেল এরশাদ ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রধান উপদেষ্টা। যদিও তিনজন সিনিয়র মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ঢাকায় চাকরিরত ছিল। অতঃপর জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর এরশাদ নিহত জিয়ার বিচারের নামে সেনাবাহিনীতে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় তিনি অনেক সেনা অফিসারকে জোর করে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেন। জিয়াউর রহমানের খুনিদের বিচারের নামে জেনারেল মঞ্জুরকেও এরশাদের নির্দেশেই হত্যা করা হয় বলে ধারণা করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এরশাদের ভুমিকা নিয়ে যে বিতর্ক, সেটা এরশাদ নিজেও জানতেন। ২০১৭ সালে জাতীয় সংসদের এক অধিবেশনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারিনি। এটা আমার জীবনের বড় দুঃখ। ১৯৭০ সালের ২৯ ডিসেম্বর আমাকে পাকিস্তানের করাচিতে মালির ক্যান্টনমেন্টে বদলি করা হয়। পরে এক মাস ছুটি কাটিয়ে একাত্তর সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে পাকিস্তান যাই। মার্চে জেনারেল ওসমানীর কাছে আমার করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি আমাকে সেখানে থাকার নির্দেশ দেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে না পারার দুঃখ থেকে যাবে। যুদ্ধে অংশ নিতে না পারলেও মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে ঘোষণা দিয়েছি। মতিঝিলে কল্যাণ ট্রাস্টের অফিস করেছি, ২২টি শিল্প প্রতিষ্ঠান মুক্তিযোদ্ধাদের দেওয়া হয়েছে।’

আজকের পত্রিকা/এমএআরএস