ভবিষ্যতে মুক্তিযুদ্ধের গবেষকেরা প্রমাণ করতে সমর্থ হবেন যে, ২৬ মার্চ থেকে স্বল্প কয়েক দিনের মধ্যেই হানাদার মুক্ত করে বাংলাদেশকে পাল্টে ফেলা সম্ভব ছিল। ছবি : সংগৃহীত

মুক্তিযুদ্ধের প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও অনেকে মনে করেন যে, যুদ্ধটা যদি দীর্ঘায়িত হতো তবে স্বাধীন দেশের সমাজ বদলে যেতো, অন্তত ফিরে আসতো না হত্যা, ষড়যন্ত্র, সাম্প্রদায়িক তথা পাকিস্তানি ধারার রাজনীতি। লড়ে লড়ে কঠিন ইস্পাতে পরিণত হতো মুক্তিযোদ্ধারা। দেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ এতে যুক্ত হতো বেশি বেশি, তাদের নিয়ে গড়ে উঠতো দৃঢ় সংগঠন। তখন ধনিক-বণিক এবং বিদেশিদের স্বার্থ রক্ষাকারীরা দূর্বল হয়ে পড়তো। বিজয়ী হতো খেটে খাওয়া মানুষ। এ মত পোষন করেন প্রধানত ‘বামপন্থী’ বিভিন্ন গ্রুপ এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের প্রধান অংশ যারা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জাসদ গঠন করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। কিন্তু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কে সাধারণ ধারণা থাকলে তারা এ মত পোষন করতেন না।

ভবিষ্যতে মুক্তিযুদ্ধের গবেষকেরা প্রমান করতে সমর্থ হবেন যে, ২৬ মার্চ থেকে স্বল্প কয়েক দিনের মধ্যেই হানাদার মুক্ত করে বাংলাদেশকে পাল্টে ফেলা সম্ভব ছিল। বদলে ফেলা সম্ভব ছিল বিদ্যমান সমাজ। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে সমাজ পরিবর্তনের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল তাকে রাজনৈতিক অপরিপক্কতায় কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। সম্ভব হয়নি ‘হুজুগে বাঙালি’কে ‘সাংগঠনিক বাঙালি’তে পরিণত করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সমাজ বদল করা। অবশ্য ‘বামপন্থী’ এবং জাসদ এ ধারণা পোষন করে এক ধরণের সমাজ পরিবর্তণের আকাক্সখা এবং ব্যর্থতা থেকে।

১৯৭১ সালের আগে থেকেই ‘বামপন্থী’দের একাংশ চেয়েছে ‘জনগণতান্ত্রিক বা নয়াগণতান্ত্রিক’ পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে জনগণের মুক্তি। তারা এ আকাঙ্খা পূরণের জন্য উনসত্তুরের প্রথম দিকে পল্টন ময়দানে পূর্ব বাংলা ছাত্র ইউনিয়নের এক জনসভা করে ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। এর ঘোষণার উদ্যোক্তা ছিলেন কাজী জাফর আহমদ, রাশেদ খান মেনন ও হায়দার আকবর খান রনো। এরা ৬ দফাকে মনে করেতেন বিস্ফোরণমুখি জনগণকে বিভ্রান্ত করার ‘সাম্রাজ্যবাদ’-এর দেওয়া প্রেসক্রিপশন এবং নব্য ধনিকদের মুক্তির সনদ হিসেবে। মস্কোপন্থী ‘কমিউনিষ্ট’রা স্বপ্ন দেখেছে, সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় পুরো পাকিস্তানে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। তারা ৬ দফাকে সমর্থণ জানিয়েছে পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের স্বায়ত্বশাসনের জন্য। তারা ৬ দফার স্বায়ত্বশাসন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেনি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী ৬ দফার মধ্যে শ্রমজীবী মানুষের কোনও দাবি নেই। তারা চেষ্টা করেছে একটি ‘কমিউনিষ্ট’ পার্টি গড়ে তোলার। তারা মনে করতো যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের মতো কোনও এক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের পাকিস্তানের ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে, তখন সমাজতন্ত্র বিনির্মানে কমিউনিষ্ট পার্টি কাজ করবে।

অপরদিকে, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার, ৬ দফা ও ১১ দফা ভিত্তিক ছাত্র আন্দোলন, সত্তুরের নির্বাচন ইত্যাদি রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে দিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর রাজনীতিতে মূলধারা হিসেবে আবির্ভাব ঘটে আওয়ামী লীগের, যার প্রধান শক্তি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের মধ্যে স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধীনতাপন্থী দু’টি ধারা থাকলেও স্বাধীনতাপন্থীরাই শক্তিশালী এবং তারা তখন সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী হয়ে উঠতে শুরু করেছিল।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করে। প্রতিবাদে স্বেচ্ছায় রাজপথে নেমে আসে সাধারণ মানুষ। এগিয়ে আসে ছাত্রলীগ তথা আওয়ামী লীগ সমর্থিত যুব-ছাত্রনেতারা। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেয়, ঘোষনা করে স্বাধীনতার ইশতেহার। ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চে রেসকোর্সের জনসভার বক্তৃতার ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তি সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ শব্দগুচ্ছকে স্বাধীনতার ঘোষণার নামান্তর বলে মনে করে। তাঁর ঘোষিত অসযোগ আন্দোলনে বেসামরিক প্রশাসন বিকল হয়ে পড়ে। দলে দলে তার কাছে গিয়ে একাত্মতা ঘোষণা করে সিএসপি অ্যাসোসিয়েশন থেকে পুলিশ প্রশাসনসহ বিভিন্ন সেক্টরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া বিদেশি দূতাবাসসহ সর্বত্র উড়তে থাকে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হামলে পড়ে সাধারণ বাঙালিদের ওপর। শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন মুক্তিযুদ্ধের একক নেতা এবং তাঁর সংগঠন আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের একক সংগঠন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট পরবর্তীতে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক রেষারেষির ফলে মুজিব বা আওয়ামী লীগকে মেনে নিতে দ্বিধাগ্রস্থ ভাষানী ন্যাপের বিভিন্ন গ্রুপ। এ ধারার কেউ ‘কেউ দুই কুকুরের কামড়া কামড়ি’ কেউবা পাকিস্তানকে সহযোগিতা, আবার কেউ কেউ জনগণতন্ত্রকে আঁকড়ে ধরতে, কেউবা নিদেনপক্ষে আওয়ামী লীগকে ‘পেটি বুর্জুয়ার দল’ বলতে গিয়ে গণবিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে। তোয়াহা জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের যুদ্ধ করতে গিয়ে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে নোয়াখালী থেকে সরে আসেন; বিমল বিশ্বাস, নুর মোহাম্মদরা যশোর-নড়াইল এলাকায় সাড়া ফেলতে পারলেও মুক্তিযুদ্ধের মূলধারায় মিলতে না পেরে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং নভেম্বরের দিকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আব্দুল হক মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই এ যুদ্ধকে ‘দুই কুকুরের কামড়া কামড়ি’ আখ্যা দিয়ে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। আর পাবনা মতিন, আলাউদ্দিন, টিপু বিশ্বাসরা প্রথম দিকে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে একাত্ম ছিলেন। কিন্তু পরে আওয়ামী লীগের বিরোধীতা করতে গিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করতে শুরু করেন এবং এক সময় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে মার খেতে খেতে ১৬ ডিসেম্বরের আগেই এলাকা ছাড়েন। নওগাঁর আত্রাইয়ের অহিদুর রহমান, নরসিংদির শিবপুরে আব্দুল মান্নান ভূইয়া, হায়দার আনোয়ার খান ঝুনোরা, বরিশালের পেয়ারা বাগানে সিরাজ শিকদার মুক্তিযুদ্ধে মূলধারা বাইরে থাকায় নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে আটকা পড়েন। ভাসানী ন্যাপের প্রধান নেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী যুদ্ধের শুরুতেই ভারতে চলে যান এবং প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা পদ নেন, তবে তিনি নিজের মতো করে কাজ করতে পারেন নি বলে অভিযোগ আছে। ভাসানী ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান যাদু মিয়া কোলকাতায় গিয়েছিলেন, কিন্তু মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে দেখা করতে পারেন নি মাওলানার অনিচ্ছার কারণে। যাদু মিয়া ‘পূর্ব পাকিস্তানে’ ফিরে আসেন এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করতে থাকেন। অবশ্য ডা. সাইফ-উদ দাহারসহ কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধের মূলধারায় ঢুকতে পারলেও স্বতন্ত্র বজায় রাখতে ব্যর্থ হন। জাফর-মেনন-রনোরা বিভিন্ন গ্রুপেরর সমন্বয়ের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে শিবপুর ধারার সঙ্গে মিশে যেতে বাধ্য হন। যারা ডিসেম্বরের পরেও বিভিন্ন এলাকায় টিকে ছিলেন, কিন্তু বাংলাদেশ মুক্ত হওয়ার তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার তাদের সামরিক কায়দায় উচ্ছেদ করতে সক্ষম হয়। মস্কোপন্থী কমিউনিষ্টরা অধিকাংশই ভারতে চলে যান। তাদের প্রধান নেতা মনি সিংহ প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন এবং ভারত-সোভিয়েত সরকারের সঙ্গে প্রবাসী সরকারের যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ রাখে। এদের অনেকেই [মস্কোপন্থী ন্যাপ-সিপিবির দাবি অনুযায়ী তাদের গেরিলা যোদ্ধার সংখ্যা পনের হাজার] ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশের ভিতরে ঢোকে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারকে সহযোগিতা করতে গিয়ে তারা গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

এবার আসা যাক, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের মূলধারা, যারা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জাসদ গঠন করে। দাবি করা হয়, ১৯৬২ সালে নিউক্লিয়াস গঠনের মাধ্যমে এরা স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু করে। শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা আন্দোলনের মধ্যে এ ধারাটি পুষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ এ ধারার প্রভাবেই গঠিত হয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। এরা ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে, ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করে। এ ধারার উত্তোলিত পতাকা, জাতীয় সংগীত বাঙালি জাতি বহন করে চলেছে এখনো। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এদের অধিকাংশই এমনকি জেলা/মহুকুমা পর্যায়ের নেতারা বেশির ভাগই ভারতে পাড়ি জমান। ওদিকে, ১৮ এপ্রিল প্রবাসী সরকারের পক্ষ থেকে বিএলএফের ৪ নেতা শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমদ- মুক্তিবাহিনী গঠনের দায়িত্ব পান। তারা সে দায়িত্ব গ্রহণ না করে ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং দীর্ঘ মেয়াদী যুদ্ধের পরিকল্পনা নিয়ে বিএলএফ তথা মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। তাদের ৫ বছর মেয়াদী যুদ্ধের এ পরিকল্পনার মধ্যে ছিল প্রথম বছরে গ্রাম-ইউনিয়ন-থানা ভিত্তিক কমিটি গঠন, ছোট ছোট গেরিলা যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে পাকিস্তানিদের শহর অঞ্চলে আবদ্ধ করে ফেলা, তারপর চূড়ান্ত যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশকেমুক্ত করা। তারা দেশে ঢুকে বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপরে সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করতে থাকেন। তাদের প্রাথমিক কাজ ছিল গ্রাম ভিত্তিক গণসংগঠন গড়া, যার মাধ্যমে এক পর্যায়ে স্বশাসনের কাঠামো গড়ে তোলা, যে কাঠামো একটি শক্তিশালী কাঠামো [রাশিয়ার সোভিয়েত ও চীনের কমিউন ধাঁচের] হিসেবে যুদ্ধ ও যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবে। কিন্তু ভারতের সহায়তায় প্রবাসী সরকার মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটায় মাত্র নয় মাসের মধ্যেই। ফলে, বিএলএফ তথা মুজিব বাহিনীর পরিকল্পনা অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে যায়।

বিএলএফ তথা মুজিব বাহিনীর এ পরিকল্পনা ছিল ত্রুটিপূর্ণ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বিশ্ব পুঁজিবাদী গতিপ্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কারণ, বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ, এমন দেশে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের পরিকল্পনা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়াই স্বাভাবিক। মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে যদি ৩০ লক্ষ মানুষকে ৩ লক্ষ নারীকে সম্ভ্রম হারাতে হয় তা হলে দীর্ঘ মেয়াদী যুদ্ধে হানাদার বাহিনী কী পরিমান ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে তা সহজেই অনুমেয়। তখন প্রাণ রক্ষা বা সম্পদ রক্ষার জন্য এ জনগোষ্ঠী যে বেঁকে বসবে না তাই বা কে বলবে? মাত্র নয় মাসের যুদ্ধকে খুঁটিয়ে দেখলে এমন অনেককেই পাওয়া যাবে, যারা ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে পাকিস্তানিদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রও ধারণ করছে, ধরিয়ে দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের। খোদ প্রবাসী সরকারের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মার্কিন ও পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ রয়েছে। একই অভিযোগ, একজন সেক্টর কমান্ডারের বিরুদ্ধেও আছে। তাছাড়া কয়েকজন এমএনএ/এমপিএ- যারা প্রথম ধাক্কায় ভারতে গিয়ে আবার ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এ ফিরে এসে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছে। পাকিস্তান সরকারের বাঙালিদের প্রায় সবাই অসহযোগ আন্দোলনে যুক্ত হয়েও যুদ্ধের চাপে আবার চাকুরিতে ফিরে গেছে শতকরা ৯৭ জন। এসব সুবিধাবাদীদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী মুক্তিযুদ্ধ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাছাড়াও সমাজ বদলের দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ চলতে থাকবে অথচ বিশ্বপূঁজিবাদ চুপচাপ বসে থাকবে এমন চিন্তা শিশুসুলভ ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না।

আসলে মুক্তিযুদ্ধের সূবর্ণ সময় ১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম দিন থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত। প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীরা যদি সচেতন হতেন তবে স্বাধীনতা ও জনগণের মুক্তি- এ দু’টোই এ সময়ের মধ্যে আদায় করে ফেলতে পারতেন। আলোচনার সুবিধার্থে এ সময় কালকে দুই ভাগে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে। নিরস্ত্র সময়কাল এবং সশস্ত্র সময়কাল। ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত নিরস্ত্র সময়কাল এবং পাকিস্তান বাহিনীর নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর হামলে পড়ার পর অর্থাৎ ২৬ মার্চ থেকে চূড়ান্ত বিজয়ের আগে পর্যন্ত সশস্ত্র সময়কাল।

১ মার্চ দুপুরে রেডিওতে ঘোষণা দিয়ে ৩ মার্চের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। এতে তারা তাৎক্ষনিক ভাবে হয়ে ওঠে স্বাধীনতার দাবিদার। জনগণ রাজপথে নেমে আসে, ধ্বণি তোলে স্বাধীনতার। ‘হুজুগে বাঙালি’ যেন স্বাধীনতার হুজুগে মেতে ওঠে। কিন্তু স্বাধীনতা তো হুজুগে আসে না, প্রয়োজন ‘সংঘ শক্তির’। যাকে সামনে রেখে বাঙালি জাতির এ মাতম শুরু হলো সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চে রেসকোর্সে তার ঐতিহাসিক ভাষনে বললেন, প্রত্যেক গ্রাম/মহল্লা, ইউনিয়ন, থানা, মহুকুমায় ‘আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে’ সংগ্রাম পরিষদ গঠন করো। ‘আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে’ শব্দগুচ্ছ শুনেই সমাজ পরিবর্তনকামী ‘কমিউনিষ্ট’ ‘বামপন্থী’রা আর ও পথে হাঁটলেন না। আর আওয়ামী লীগের প্রগতিশীল অংশ হিসেবে পরিচিতরা বাঁশের লাঠি হাতে নিয়ে ‘সশস্ত্র’ প্রশিক্ষণের নামে ‘হুজুগে বাঙালি’কে আকৃষ্ট করতে মহড়া দিতে থাকলো। ফলে ‘হুজুগে বাঙালি’র আর ‘সাংগঠনিক বাঙালি’ হয়ে ওঠা হলো না। অথচ এই স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রতিটি গ্রাম, ইউনিয়ন, থানায় গড়ে তোলা যেত সংগ্রাম কমিটি, যা স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনার আধারও হয়ে উঠতো, স্থানীয়ভাবে জনগণ একটি নেতৃত্ব পেতো। প্রতিটি গ্রামের গণসংগঠনগুলো নেতৃত্ব দিত প্রতিটি মানুষকে। যা হয়ে উঠতো পুরাতন রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিকল্প নতুন দেশের নতুন শাসন কাঠামো। এ শাসন কাঠামো বা নেতৃত্ব কাঠামো পুরনো আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোকে চাপে পিষ্ঠ করে ফেলতে পারতো সহজেই।

২৬ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করে ধমক দেয় নিরস্ত্র বাঙালিকে। সে ধমকে অনেকে ফিরে যায় পাকিস্তানের কাছে। ‘হুজুগে বাঙালি’রা মুক্ত করে ফেলে বাংলাদেশের সাড়ে পনের আনা অংশ। পাবনা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহে তো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সশস্ত্র সদস্যদের ‘গণপিটুনি’ দিয়ে উৎখাত করে সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন সেনানিবাসে আটকা পড়ে পাকিস্তান সেনারা। পরিস্থিতি এমন হয় যে, হেলিকপ্টার ছাড়া এক সেনানিবাসের সঙ্গে আরেক সেনানিবাসের যোগাযোগ করাও দূরূহ হয়ে ওঠে পাকিস্তানিদের জন্য। কোথাও কোথাও দা-বল্লম নিয়ে ‘হুজুগে বাঙালি হামলা চালাতে শুরু হয় সেনানিবাসেও।

এই ‘হুজুগে বাঙালি’কে মার্চর ২৫ দিনে যদি ‘সাংগঠনিক বাঙালি’তে রূপান্তর করা যেত তবে যুদ্ধের চেহারাটাই পাল্টে যেত, আক্রমন বা পলায়ন- দু’টোই হতো সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে। ২৫ মার্চের পর যে পরিমান অস্ত্র পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন থানা, পুলিশ লাইন, ইপিআর ক্যাম্প, সেনানিবাস থেকে বের হয়ে এসেছিল তা দিয়ে ‘সংগঠিত বাঙালি’ সশস্ত্র হয়ে উঠতো। আন্দোলনে এক ধরণের শৃঙ্খলা আসতো, শক্তিও বেড়ে যেত অনেকগুণ। তখন পাকিস্তানি প্রশাসনের বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ফিরে যাওয়ার সাহস পেতো না। ক্যান্টনমেন্টে আটকে পড়া বাঙালিরা -যারা অসহযোগ আন্দোলনের সময় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল মিছিলে যুক্ত হওয়ার- তারা বের হয়ে আসার সুযোগ পেতো। সাত/আটটি পয়েন্টে আটকে পড়া পাকিস্তানিরা অন্নাভাবেই আত্মসমর্পণে বাধ্য হতো বাংলাদেশের জনগণের কাছে। কারণ, ১২ শ’ মাইল দূর থেকে এসে আটকে পড়াদের সহযোগিতা করার সামর্থ পাকিস্তান সরকারের ছিল না, মার্কিনি ৭ম নৌবহর আসতেও লাগতো অন্তত ১ মাস, ততদিনে ঢাকাকে মুক্ত করা কঠিন হতো না সংগঠিত বাঙালিদের। কারণ, ততদিনে, সংগঠিত বাঙালিদের মধ্যে মিশে যেত সশস্ত্র বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা।

লেখক : সাইফুল ইসলাম, লেখক, সাংবাদিক, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক