এম. এ. আর. শায়েল
সিনিয়র সাব এডিটর

পুলিশের হাতে গ্রেফতার আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী ও নিহত রিফাতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেফতারের পর আদালত তাকে পাঁচ দিনের রিমাণ্ড মঞ্জুর করেছেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্বামীর হত্যাকাণ্ডে তাঁর স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা ওরফে মিন্নির জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির মুঠোফোনের আলাপ পর্যালোচনা করেই পুলিশ প্রাথমিকভাবে মিন্নির জড়িত থাকার প্রমাণ পায়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বুধবার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মূল হত্যাকারী নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর সঙ্গে মিন্নি পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করে।’

হুমায়ুন কবির বলেন, ঘটনার আগের দিন মিন্নি নয়ন বন্ডদের বাড়িতে গিয়ে এই হত্যার পরিকল্পনা করে। এই হত্যাকাণ্ডের ৬ নম্বর আসামি টিকটক হৃদয় আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে এই হত্যায় আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির সংশ্লিষ্টতার কথা জানায়।

দ্বিতীয় ভিডিও ফুটেজের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ফুটেজে মিন্নি রিফাত শরীফকে রক্ষার যে চেষ্টা করে সেখানে সে নয়নকে ঝাপটে ধরলেও তাকে (মিন্নি) কোনো আঘাত করেনি। এটা ছিল লোক দেখানো।

ঘটনার আগের দিন এবং ঘটনার পূর্বে নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির মুঠোফোনের আলাপ-আলোচনা থেকে এ হত্যাকাণ্ডে মিন্নির জড়িত থাকার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে সত্যতা পাওয়া গেছে।

তবে গ্রেফতারের আগেও মিন্নি বলেছেন, তিনি তার স্বামীর হত্যার বিচার চান, গ্রেফতারের পর আদালতেও বলেছেন, ‘আমার স্বামী রিফাত শরীফই। আমি আমার স্বামীর হত্যাকারীদের বিচার চাই। হত্যাকাণ্ডে আমি জড়িত নই। এ মামলায় আমাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হয়েছে।’

তবে আদালতে মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না বলে সুধীমহলে আলোচনার ঝড় উঠেছে মামলাটি ভিন্ন খাতে নেওয়া হচ্ছে। পুলিশের ভূমিকারও সমালোচনা করেছেন সুধীজনরা।

আদালতে মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী না থাকার বিষয়টি নিয়ে রয়েছে অনেক গুঞ্জন। তবে সূত্র জানিয়েছে, মিন্নির বাবা তিন আইনজীবী নিয়োগ করলেও ওকালতনামায় মিন্নি স্বাক্ষর না করায় তারা আদালতে মামলা লড়তে পারেননি।

এদিকে মিন্নির গ্রেফতার নিয়ে বুধবারও সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা হয়। সেখানে এক এমপি মিন্নির গ্রেফতারে প্রভাবশালী কারও ইন্ধন রয়েছে কি-না সে প্রশ্ন তোলেন।

বুধবার বেলা সোয়া ৩টার দিকে মিন্নিকে বরগুনার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বরগুনা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হুমায়ূন কবির। আদালতের বিচারক মোহাম্মাদ সিরাজুল ইসলাম গাজী শুনানি শেষে তার বিরুদ্ধে পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিফাত শরীফ হত্যার সময় মিন্নি তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। চাঞ্চল্যকর এ মামলার প্রধান সাক্ষী মিন্নি। তাকেই মঙ্গলবার রাতে গ্রেপ্তার করার পর থেকে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। তার এ গ্রেপ্তার নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন।

তারা বলছেন, মিন্নি কি সত্যি সত্যিই তার স্বামী রিফাত শরীফ হত্যায় জড়িত, নাকি হত্যার মোড় ঘুরিয়ে দিতে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা হচ্ছে। তিনি কি ষড়যন্ত্রের শিকার? এমন নানা প্রশ্ন এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের ওয়ালে ওয়ালে ঘুরপাক খাচ্ছে।

পুলিশের তদন্তকারী সংস্থা বরগুনা পুলিশ ঠিক কী কারণে মিন্নিকে গ্রেপ্তার করেছে তার প্রকৃত এবং সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানায়নি।

তবে পুলিশের গোপন একটি সূত্র বলেছে রিফাত হত্যায় মিন্নি সরাসরি জড়িত নন। তিনি জানতেন তার স্বামী রিফাত শরীফকে অপমান করা হবে। জানে মেরে ফেলা হবে তা তিনি জানতেন না।

আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত মিন্নির বাবা মোজাম্মেল কিশোর কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাংবাদিকদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন, ‘তার মেয়ে যতটা না দোষী, তার চেয়ে অনেক বেশি দোষী বানাচ্ছেন এখানকার একটি শক্তিশালী গ্রুপ।

যারা মাদক কারবার করতে ০০৭ বন্ড বাহিনী তৈরি করেছে। এরা পুরো মামলাকে অন্যদিকে মোড় দিয়ে নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করছে। তাদের উদ্দেশ্য মাদক কারবারি দল সুসংগঠিত রাখা। এ ব্যাপারে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

মিন্নিকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের বিষয়টি নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে বরগুনাজুড়ে। মামলার ফল নিয়েও উদ্বিগ্ন অনেকেই। বরগুনাবাসীর বড় একটি অংশ হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, সাক্ষী ছাড়া মামলাই তো থাকে না। এ মামলা এখন গতি হারাবে।

একাধিক আইনজীবী বলেন, রাজসাক্ষী ছিলেন মিন্নি। তিনি এখন আসামি। তা হলে মামলাই তো মেরুদণ্ডহীন হয়ে গেল। এ মামলা এখন ভিন্ন দিকে মোড় নেবে।

এদিকে মিন্নিকে একনজর দেখার জন্য আদালত প্রাঙ্গণে হাজির হন শত শত উৎসুক জনতা। তাদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খায় পুলিশ। এর আগে বরগুনার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে মঙ্গলবার দিনভর মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে গ্রেপ্তার করার কথা সাংবাদিকদের জানানো হয়।

পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেন, ওই হত্যায় মিন্নির সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গত ২৬ জুন রিফাতকে প্রকাশ্য সড়কে দুই যুবক রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যার সময় স্বামীকে বাঁচাতে মিন্নির চেষ্টার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ঘটনাটি সারাদেশে আলোচনায় উঠে আসে। পরদিন রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ ১২ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন, তাতে প্রধান সাক্ষী করা হয় মিন্নিকেই।

সম্প্রতি মিন্নির শ্বশুর তার ছেলের হত্যাকাণ্ডে পুত্রবধূ মিন্নির জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে তাকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করলে আলোচনা নতুন দিকে মোড় নেয়। তবে শ্বশুরের অভিযোগ অস্বীকার করে ১৪ জুলাই আরেক সংবাদ সম্মেলনে মিন্নি বলেন, মামলার আসামিরা প্রভাবশালী। তারা মামলাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

এরই অংশ হিসেবে ষড়যন্ত্রকারীদের প্ররোচনায় তার শ্বশুর দুলাল শরীফ তাকে জড়িয়ে বানোয়াট কথা বলছেন। এ মামলার এজাহারভুক্ত ছয়জনসহ মোট ১৩ জনকে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হত্যা মামলার মূল আসামি সাব্বির আহম্মেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ইতোমধ্যে নিহত হয়েছেন। ২ জুলাই নিহতের ওই ঘটনায় কোনো কথা বলেনি নয়ন বন্ডের পরিবার। কিন্তু ১২ জুলাই থেকে হঠাৎ দৃশ্যপট বদলাতে থাকে। মিন্নিকে দায়ী করে প্রথমে গণমাধ্যমে কথা বলেন নয়ন বন্ডের মা। ১৩ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে মিন্নিকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান তার শ্বশুর দুলাল শরীফ। তিনি মিন্নি জড়িত থাকার পক্ষে ১০টি কারণও তুলে ধরেন গণমাধ্যম কর্মীদের সামনে।

একই সঙ্গে মিন্নিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে বরগুনার সর্বস্তরের জনগণের ব্যানারে একটি পক্ষ বরগুনা শহরে মানববন্ধনও করেন। ক্রমশ মিন্নিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে একটি পক্ষ সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা এখনো সক্রিয়। মঙ্গলবার রাতে মিন্নি গ্রেপ্তার হওয়ার পর নয়ন বন্ড ও মিন্নির সম্পর্কের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কারা এই ভিডিও ছড়িয়ে দিয়েছে? ভিডিওটি আসলেই তাদের কিনা এ সম্পর্কে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে কেউ-কেউ বলছেন মিন্নির বিরোধীপক্ষই কাজটি করতে পারে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, রিফাত হত্যার পরিকল্পনায় নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর সঙ্গে জড়িত ছিল মিন্নি। তাদের সঙ্গে মিলে এ হত্যা সংঘটন করে। এদিকে বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও রিফাত হত্যাকাণ্ড ও মিন্নি গ্রেপ্তারের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

কমিটির সভাপতি শামসুল হক টুকুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, রিফাত হত্যাকা- নিয়ে এখনই মতামত প্রকাশ করার সময় হয়নি। তদন্ত শেষে জনসমক্ষে অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচন এবং আইনের মুখোমুখি করা হবে।

সূত্র জানায়, বৈঠকে কমিটির সদস্য পীর ফজলুর রহমান রিফাত শরীফ হত্যার প্রধান সাক্ষী তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, কেউ দোষী হলে তার শাস্তি হোক, সেটা আমরা চাই। কিন্তু কারও প্ররোচনায় মিন্নিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার। এ বিষয়ে তিনি পুলিশের বক্তব্য জানতে চান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদীয় কমিটির সভাপতি শামসুল হক টুকু সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা উঠেছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বিষয়টি তদন্ত পর্যায়ে। এ নিয়ে উপসংহার টানার সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।

ওদিকে মিন্নি গ্রেপ্তারের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসংখ্য প্রশ্ন এসেছে।

প্রশ্নগুলোর মধ্যে রয়েছে, মিন্নিকে কি ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে? তার শ্বশুর কি কোনো চাপের শিকার? শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে এবং নিশ্চিত তথ্যপ্রমাণ প্রকাশ না করে মিন্নিকে প্রাথমিক ধারণার ভিত্তিতে গ্রেপ্তার কি সমর্থনযোগ্য?

মিন্নিকে আটকের জন্য কয়েক দিন ধরেই বরগুনায় একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। একটা কথিত ‘জনমত’ সৃষ্টির চেষ্টা কী? যারা করেছে তাদের নেপথ্যে কারা? নয়ন বন্ড ক্রসফায়ারে গেল; কিন্তু প্রভাবশালীর স্বজনরা গ্রেপ্তার হলেও ক্রসফায়ারের বাইরে থেকে গেল। তাদের স্বজনরা বাইরে এখন পুরোমাত্রায় সক্রিয়। তা হলে বিষয়টি নিয়ে কারা খেলছে? মিন্নি তার স্বামী রিফাত হত্যার সাক্ষী। সেই একমাত্র তাকে রক্ষার চেষ্টা করেছে। সে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হতে পুলিশের এত সময় লাগল কেন? প্রমাণ পেতে কত দিন লাগবে?

এদিকে রিফাত শরীফ হত্যা, মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড ক্রসফায়ারে নিহত হওয়া, নয়ন বন্ডের মা মিন্নিকে নিয়ে চাঞ্চল্যকর তখ্য দেয়া, মিন্নির শ্বশুরকে মিন্নি দায়ী করে সংবাদ সম্মেলনসহ মানববন্ধনে বক্তব্য রাখা এবং মিন্নির পাল্টা সংবাদ সম্মেলন, সর্বোপুরি মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে এনে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাতে গ্রেফতার দেখানো সব কিছু মিলিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।

বিষয়টি অনেকের কাছে এখনো স্পষ্ট নয়। যত দিন যাচ্ছে সাধারণ মানুষ রিফাত-মিন্নি-নয়ন বন্ডের ঘটনা নিয়ে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। কেউ জেনে আবার কেউবা না জেনে সমালোচনায় মেতে উঠেছেন। একপক্ষ বিষয়টিকে নাটক আখ্যা দিচ্ছেন আরেকপক্ষকে মিন্নি গ্রেফতার হওয়ায় সন্তোষ্টি প্রকাশ করে প্রশাসনকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন। আবার আরেকটি পক্ষ বিষয়টির মধ্যে প্রভাবশালীদের হাত থাকতে পারে বলে সন্দেহ পোষণ করছেন।