ক্যানসার চিকিৎসায় যুগান্তকারী এক আবিষ্কার করলেন পদার্থবিদ ও বিজ্ঞানী ড. ইয়াসমিন হক এবং তার দল। দেশে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এই রোগ ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনছে রোগী ও তাদের পরিবারের জন্য।

বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং প্রচুর সময়ও লাগে শুধু চিহ্নিত করতেই। ক্যানসার ধরা পড়ার পরেও চলে এর দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা। এতে রোগীর পরিবারের প্রচুর অর্থ খরচ হয়, বেশিরভাগই নিঃস্ব রিক্ত ও হত দরিদ্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের পক্ষে এ রোগের ব্যয়ভার বহন করা অসম্ভব।

এ রকম একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ড. ইয়াসমিন ও তার দল এ দেশের জন্য দারুণ এক খবর এনে দিলেন। সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক গত ২৩ বছর ধরে এক্সপেরিমেন্টাল নন-লিনিয়ার অপটিক্স নিয়ে কাজ করছেন। তার নেতৃত্বাধীন একটি গবেষণা দল গবেষণার এক পর্যায়ে আবিষ্কার করেন ক্যানসার চিহ্নিতকরণের সহজ উপায়। তারা মানবদেহের রক্তের মধ্যে এমন কিছু ‘বায়োমার্কার’ খুঁজে পেয়েছেন, যা ক্যানসার রোগির ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে সাড়া দেয়। নন-লিনিয়ার অপটিকসে’র পদ্ধতি প্রয়োগ করেই রক্তের মধ্যে ওই ধরনের বায়োমার্কার খুঁজতে শুরু করেছিলেন, অবশেষে তাতে সাফল্য মিলেছে।

ইয়াসমিন হক ও তার দল আশা করছেন, ক্যানসার পরীক্ষার একটি ‘ডিভাইস’ বা যন্ত্র এক বছরের মধ্যেই তৈরি করে ফেলা সম্ভব হতে পারে, যার মাধ্যমে মাত্র ৫০০ টাকায় ৫ মিনিটের মধ্যে ক্যানসার চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। ক্যানসার চিকিৎসায় নিঃসন্দেহে এই প্রযুক্তি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

২০১১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের নন-লিনিয়ার অপটিক্স গ্রুপ উচ্চ শিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের (হেকেপ) অর্থায়নে বাস্তবায়িত একটি প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম এক্সপেরিমেন্টাল নন-লিনিয়ার অপটিক্স রিসার্চ ল্যাবরেটরি নির্মিত হয়। স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি শিক্ষার্থীরা এই ল্যাবরেটরিতে ভিন্ন ভিন্ন লেজার ব্যবহার করে নানা ধরনের জৈব, অজৈব এবং বায়ো-স্যাম্পলের মৌলিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের কাজ শুরু করে। এই নমুনাগুলোর ভেতর দিয়ে শক্তিশালী লেজার রশ্মি পাঠিয়ে তাদের নন-লিনিয়ার বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা হয়। এভাবে কোনো পদার্থের নন-লিনিয়ার অপটিক্যাল বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াটি অনেক ক্ষেত্রেই বায়োকেমিক্যাল প্রক্রিয়া বা স্পেক্ট্রোস্কোপিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নমুনার গুণাগুণ বের করার চাইতে সহজতর ও ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়া সম্ভব।

২০১৫ সালের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এই নন-লিনিয়ার অপটিক্স রিসার্চ গ্রুপ হেকেপের উইন্ডো ফোরের আওতায় ইউনিভার্সিটি-ইন্ডাস্ট্রি সমন্বিত গবেষণার জন্য একটি উদ্ভাবনীমূলক পরিকল্পনা জমা দেয়। এই পরিকল্পনাটি ছিল ক্যানসার রোগাক্রান্ত ব্যক্তির রক্তের নন-লিনিয়ার বৈশিষ্ট্য পরিমাপ করে ক্যানসারের সম্ভাব্য উপস্থিতি ও অবস্থা চিহ্নিত করার একটি প্রক্রিয়া উদ্ভাবন। অর্থাৎ প্রচলিত বায়োকেমিক্যাল ক্যান্সার নির্দেশক বায়োমার্কারের পরিবর্তে একটি অপটিক্যাল বায়োমার্কার উদ্ভাবন করা। সহজ ভাষায় বলা যায়, ক্যানসার রোগাক্রান্ত রোগিদের রক্তে এমন কিছু একটা অনুসন্ধান করে বের করা যায়, যার নন-লিনিয়ার বৈশিষ্ট্যটি ক্যানসার রোগের সম্ভাব্যতার একটি ধারণা দেবে। একই সঙ্গে খুব সহজে নন-লিনিয়ার বৈশিষ্ট্যটি অনুসন্ধানের জন্য একটা সহজ যন্ত্রও তৈরি করার পরিকল্পনা করা হয়। সজভাবে বলা যায়, এই উদ্ভাবনী প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে শুধু ক্যানসার রোগাক্রান্ত রোগিদের রক্ত নয়, অন্য যে কোনও নমুনার নন-লিনিয়ার ধর্ম খুবই সহজে পরিমাপ করা সম্ভব হবে।

২০১৬ সালের মার্চ মাসে ‘নন-লিনিয়ার অপটিক্স ব্যবহার করে বায়োমার্কার নির্ণয়’ শীর্ষক প্রকল্পটি হেকেপের আওতায় সিপি-৪০৪৪ হিসেবে গৃহীত হয়। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে নন-লিনিয়ার বায়ো-অপটিক্স রিসার্চ ল্যাবরেটরি নামে একটি নতুন ল্যাবরেটরি নির্মিত হয়। এই ল্যাবরেটরিতে ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষের রক্তের সিরামে শক্তিশালী লেজার রশ্মি পাঠিয়ে নন-লিনিয়ার ধর্মের সূচক পরিমাপ করার কাজ শুরু হয়েছে।

এখন অপেক্ষা ডঃ ইয়াসমিন ও তার দলের এই গবেষণার ফসল কবে হাসপাতাল আর ডাক্তারদের সঠিক সহযোগিতায় মানুষের হাতের নাগালে আসবে। তাদের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের কারণে হয়তো অনেকের জীবন বেঁচে যাবে ক্যানসার নামক মরণব্যাধির কবল থেকে।

আজকের পত্রিকা/সিফাত