মাত্র ১৬ শিক্ষার্থী নিয়ে চলছে যে বিদ্যালয়ের পাঠদান

লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলার নামুড়ী বালিকা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র ১৬ জন শিক্ষার্থীর পাঠদানের দায়িত্বে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৪জন। যাতায়াতের রাস্তা না থাকলেও বিদ্যালয়টি দ্বিতল ভবন করা হয়েছে।

(১৯ অক্টোবর) শনিবার সরেজমিনে বিদ্যালয়ে ক্লাশ চলাকালীন গেলে চোখে পড়ে বিদ্যালয়টির ৩য় শ্রেনীতে মাত্র ৪জন, ৪র্থ শ্রেনীতে ৪জন ও ৫ম শ্রেনীতে ৮জন মিলে মোট ১৬জন শিক্ষার্থী উপস্থিত। যাদের প্রত্যেকেই পাঠদান ছেড়ে মাঠে খেলা ধুলা করছিল। প্রধান শিক্ষক হাজিরায় স্বাক্ষর করে চলে যান বাহিরে। বাকী তিনজন শিক্ষকের একজন অফিস কক্ষে ঘুমালেও অন্য দুইজন বাহিরে আড্ডায় ব্যস্ত আছেন। সাংবাদিকদের ছবি তুলতে দেখে শিক্ষকরা তাড়াহুড়ো করে শিক্ষার্থীদের নিয়ে দৌড় দিলেন ক্লাশ রুমে।

শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়রা জানান, উপজেলার পলাশী ইউনিয়নের নামুড়ী গ্রামে ১৯৮৮ সালে নামুড়ী বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিরা। প্রতিষ্ঠাকালিন সময় পড়াশোনার মান ভাল থাকায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বৃদ্ধিও পায়। পরবর্তিতে প্রধান শিক্ষক বীরেন্দ্র নাথ সরকার ওরফে শিয়ালু’র একক আধিপত্তের কারনে দিনে দিনে নিম্নমুখি হয়ে পড়ে শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও পরিবেশ।

বাধ্য হয়ে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের পাশের বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন। বর্তমানে কাগজ কলমে বিদ্যালয়ে ১৩৭ জন শিক্ষার্থীর কথা লেখা থাকলেও বাস্তবে মাত্র শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ১৬ জন।

বিদ্যালয়ে যাওয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থাা না থাকলেও ক্ষমতাসীন দলের নেতা প্রধান শিক্ষক ক্ষমতা আর অবৈধ সুযোগ দিয়ে বিদ্যালয়টির রেজিস্ট্রেশন করেন এবং স্ত্রী সুজাতা রানীকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন।

২০০২ সালে দ্বি-তল ভবনের বরাদ্ধ নিয়ে ভবন তৈরী করেন। কিন্তু সেই বিদ্যালয়ে নেই পাঠদানের কোন সুষ্ঠু পরিবেশ। পরবর্তিতে ২০১৩ সালে জাতীয় করন করা হয় এ বিদ্যালয়টি। জাতীয় করনের পরে প্রতিষ্ঠাকালিন তিন শিক্ষকের বদলি হলেও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বীরেন্দ্রনাথ সস্ত্রীক রয়েছেন বহাল তবিয়তে। ফলে তাদের নিজস্ব গড়া নিয়ম নীতিতেই চলে বিদ্যালয়ের পাঠদান।

বিদ্যালয় টিকিয়ে রাখতে পাশের বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী এবং ভুয়া কিছু নাম দিয়ে শিক্ষার্থীর হাজিরা খাতা তৈরী করেছেন এবং সে অনুযায়ী ভোগ করেন যাবতীয় সরকারী সকল সুযোগ সুবিধা। বাঁশ বাগানের ভিতর ও ধান ক্ষেতে আইলের রাস্তা দিয়ে বিদ্যালয়ের যোগাযোগ। নেই মুল ফটক। তথ্যের ডিসপ্লেবোর্ড থাকলেও সেখানে নেই বিদ্যালয়ের কোন তথ্য। প্রবেশ পথেই বিপদজনক টয়লেটের খোলা ম্যানহোল। প্রায় প্রতিদিন সেখানে ঘটছে দুর্ঘটনা। সেদিকেও নজরদারী নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

৩য় শ্রেনীর শিক্ষার্থীরা জানায়, রুটিনে ক্লাশ শুরুর দুই ঘন্টা অতিবাহিত হলেও সংবাদকর্মীদের আগমনে শুরু হয় ক্লাশ। তাদের ৪জনকে নিয়েই ৩য় শ্রেনী। ৪র্থ ও ৫ম শ্রেনীর শিক্ষার্থীরাও জানালেন একই কথা। আসন্ন বার্ষিক পরীক্ষা সামনে হলেও এখন পর্যন্ত অনেক শিক্ষার্থীরা তাদের ক্লাশ রোল বলতে পারে নি। রোল কল তেমন একটা হয় না বলেই তারা তাদের রোল জানে না বলে দাবি শিক্ষার্থীদের।

কয়েকজন অভিভাবক জানান, প্রধান শিক্ষক ও তার স্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে চলে এ বিদ্যালয়টি। সবাই বদলি হলেও তাদের বদলি হয় না। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা, এমপি, মন্ত্রীদের সাথে তার বেশ সখ্যতা থাকায় শিক্ষা অফিস ভুলেও এ বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন না। ফলে নিজেদের গড়া নিয়মে চলে বিদ্যালয়। উচ্চতর তদন্তের দাবি স্থানীয়দের।

প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা সহকারী শিক্ষক সুজাতা রানী বলেন, আগের তুলনায় পাঠদান ভালো হলেও রাস্তার অভাবে শিক্ষার্থীরা এই বিদ্যালয়ে আসতে চায় না। শিক্ষার্থীরা বিলম্বে আসায় ছুটির আগে হাজিরা নেয়া হয়। বদলির চেষ্টা করেও তাকে বদলি করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

উপজেলা শিক্ষা অফিসের একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিলে বড় নেতাদের ফোন আসে। তাই কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না বা তারা নিতে পারেন না। পাশেই একাধিক বিদ্যালয় তবুও এটি অনুমোদন দেয়া ঠিক হয়নি। রাস্তা ছাড়া বিদ্যালয়টির যারা অনুমোদন দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রধান শিক্ষক বীরেন্দ্র নাথ (শিয়ালু) বলেন, বিদ্যালয়ে হাজিরা দিয়ে বিদ্যালয়ের কাজে শিক্ষা অফিসে ছিলেন। পাঠদানের মানের জন্য নয়, রাস্তার অভাবে এখানে শিক্ষার্থী নেই বা আসতে চায় না। তবে এখানে ভুয়া শিক্ষার্থী নেই। তবে যারা অনুপস্থিত তারা সবাই পরিবারের সাথে কাজের সন্ধানে এলাকার বাহিরে রয়েছে। বাড়ির পাশে হলেও বদলির চেষ্টা করেছি। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বদলি না করায় একই চেয়ারে কাটছে প্রায় ৩১ বছর। এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করতেও তিনি সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন।

আদিতমারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এনএম শরীফুল ইসলাম খন্দকার জানান, বিদ্যালয়টির এমন করুন পরিস্থিতি তার জানা নেই। পরিদর্শন করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না/লালমনিরহাট