আসাদুজ্জামান স্বপ্ন
সিনিয়র রিপোর্টার

মাছের রাজা ইলিশের জন্য করা হোক জাতীয়ভাবে ‘ইলিশ উৎসব’। গ্রাফিক্স : আজকের পত্রিকা

সোনা নাচে কোনা; বলদ বাজায় ঢোল,

সোনার বউ রেঁধে রেখেছে ইলিশ মাছের ঝোল।

বৈশাখ থেকে চৈত্র সংক্রান্তি, আনন্দ আর হাসিতে ইলিশ দিয়ে মায়েদের-বউদের রান্নার ফর্দ কখনো খাটো ছিল না। ঝোলেতে না হোক সর্ষের ঝাঁঝ বা সর্ষে তেলে ভাজা ইলিশ তারা পাতে জোগান দেবেই।

কোনো ক্ষেত্রে পুরনো রান্নাটি আসছে নতুন নামকরণে। ভোজন পূজারীদের কারো কারো অভিযোগ, ইলিশের নতুন রেসিপিতে জিভের জলের গভীরতা যেন কমে আসছে। কারণ বিগত ৩ দশক ধরে কোনো কারণ ছাড়াই বাংলা নববর্ষে পানতার সাথে ইলিশ খাওয়া কোথাও অনেকটা ফ্যাশন আবার কোথাও পরিণত হয়েছে রেওয়াজে। সে কারণে নববর্ষে ইলিশের চাহিদা বেড়েছে ব্যাপক। সাথে যোগ হয়েছে মাছের রাজা ইলিশের মান ক্ষুণ্ন করার অপসংস্কৃতি।

ইলিশ নিয়ে যেন একটা হইচই ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা খাওয়ার রেওয়াজ থাকলেও ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডাকে ইলিশ দিয়ে বৈশাখ বরণের রেওয়াজে কিছুটা ভাটা পড়ে। তিনি বিগত দুই বছর ধরে পহেলা বৈশাখে ইলিশ খাওয়াকে নিরুৎসাহিত করছেন। ১৪২৫ বঙ্গাব্দের দুই দিন আগে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘পহেলা বৈশাখে ইলিশ না খাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আপনারা ইলিশ খাবেন না, ইলিশ ধরবেন না। পহেলা বৈশাখে পান্তা ভাত খাবো। তবে ইলিশ মাছ দিয়ে নয়, শুটকি ভর্তা দিয়ে খাবো।’

ইলিশ না খাওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পহেলা বৈশাখের খাদ্য তালিকায় উল্লেখ করেন খিচুড়ি, সবজি, মরিচ ভাজা, ডিম ভাজা ও বেগুন ভাজার কথা। রাষ্ট্র যখন ইলিশ সংরক্ষণের তৎপর। তখনই এক বানোয়াট সংস্কৃতিচর্চার হাত ধরে করপোরেট লুটেরাগুলো মাঠে নেমেছেন। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে অনেকেই এমন ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

ইলিশ মাছের ত্রিশ কাটা। ছবি : সংগৃহীত

আসলে ভৌগলিক নিবন্ধন পেয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ হিসেবে ইলিশ। মৎস আচার্য ইলিশ কয়েক বছর আগেও দুর্লভ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার আগে সাগর-নদী ছিল ইলিশে টইটম্বুর। বঙ্গোপসাগর থেকে শুরু করে পদ্মা, মেঘনা, বলেশ্বর, আগুনমুখো এবং তেঁতুলিয়া নদী ছিল ইলিশের বিচরণ এলাকা। ইলিশ খ্যাত সে নদীগুলো কিছুদিন আগেও ছিল প্রায় ইলিশ শূন্য। তবে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, এক যুগ আগে দেশের ২১টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ ছিল। বর্তমানে ১২৫টি উপজেলার নদ-নদীতে বিস্তৃত হয়েছে ইলিশ। পদ্মার শাখানদী মহানন্দা থেকে শুরু করে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওড় ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেদির হাওরেও নাকি এখন পাওয়া যাচ্ছে ইলিশ। সরকারের নানা উদ্যোগ, প্রচার-প্রচারণা, জেলেদের প্রণোদনাসহ সমন্বিত উদ্যোগে দেশে প্রতিবছরই বাড়ছে ইলিশের উৎপাদন।

বিশ্বে উৎপাদিত ইলিশের ৭০-৭৫ শতাংশ উৎপাদন হয় বাংলাদেশে। দিন দিন ক্রমাগত বাড়ছে ইলিশ উৎপাদন। তারপরও কতিপয় ব্যবসায়ী এবং ভ্রান্ত ধারণার কারণে মা-ইলিশ ও জাটকা ইলিশ ধরাও বাড়ছে। জানা যায়, দেশে সারা বছর যত জাটকা ধরা হয় তারমধ্যে ৬৫-৭০ শতাংশ ধরা হয় বৈশাখ উপলক্ষে। মৎস্য অধিদফতর বলছে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ১৭ হাজার টন। আর ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯৮ হাজার টন। এক যুগের কম সময়ে দেশে ইলিশের উৎপাদন ৭৬ শতাংশ বাড়ার দাবি মৎস্য অধিদফতরের।

একটা সময় ইলিশের অফুরন্ত জোগানে যে কখনো ভাটা পড়তে পারে, ভোজনপ্রিয় বাঙালি সেই ভাবনা কখনো মাথায় রাখেনি। অসময়ে কতিপয় লোভী মাছ ব্যবসায়ী ও জেলেদের জালে আটকে পড়া ডিমওয়ালা ইলিশ, জাটকা চালান হয়ে যায় বাঙালির গ্রাসে। কাদামাখা সনাতন মাছের বাজারে ইলিশের আর রুচি নেই। কারণ, এ বাজারে জাটকাকে ছেড়ে দিয়ে মৎসরাজ উঠে গেছে অভিজাত এলাকার মেগা শপিং সেন্টারে। একই সঙ্গে মধ্যবিত্তের চৌহদ্দি ডিঙিয়ে একেবারে উচ্চবিত্তের জিভের আগায়। কারণ বৈশাখে ইলিশ খাওয়া কোনোদিনই বাঙালির ঐতিহ্য নয়। ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে একশ্রেণির লোক এটিকে প্রথা বানিয়েছে, আভিজাত্য আনার চেষ্টা করেছে বলে মনে করেন মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আবু সাইদ মো. রাশেদুল হক।

মাছের রাজা ইলিশের মান যাতে না ক্ষুণ্ন হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে ইলিশের দাম টেনে তোলা হচ্ছে হাজারের ঘরে। বাড়তি চাহিদা ও আকাশচুম্বী দামকে পুঁজি করে বাজারে বেড়েছে জাটকার সরবরাহ। ছোট-বড় বাজারেই অহরহ দেখা মিলছে জাটকার। আসলে বৈশাখের সঙ্গে ইলিশের সংযোগ এমনভাবে ঘটানো হয়েছে, মনে হয় পান্তা ইলিশ ছাড়া বৈশাখের কোনও মানে নেই। যার প্রভাব পড়ে আর্থ-সামজিক পরিমণ্ডলে।

বৈশাখকে কেন্দ্র করে এ সময় মা ইলিশের ডিমসহ নিধন কেবল একটি মাছ নয়, লাখ লাখ ভবিষ্যতের ইলিশকেও ধ্বংস করা হয়। করপোরেট সংস্কৃতি সব কিছুকেই পণ্য বানাতে চায়। সে জন্য তারা উপকরণ খোঁজে। পান্তা ইলিশ হয়ে যায় সেই উপকরণ। বৈশাখী খাবারের ব্র্যান্ডে পরিণত হয় পান্তা ইলিশ। বৈশাখের পান্তা-ইলিশের জন্য ‘শহরের কিছু শিক্ষিত নাগরিককে’ দায়ী করেছেন ফোকলোর বিশেষজ্ঞ বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু করে ছায়ানট। তাদের আয়োজনকে কেন্দ্র করেও পান্তা-ইলিশের বিক্রির ব্যবস্থা হয় অনুষ্ঠানের আশেপাশে। কিন্তু বরাবরই ছায়ানট বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে এসব পান্তা-ইলিশের সঙ্গে ছায়ানট এবং বৈশাখের কোনও সম্পর্ক নেই।

বর্ষ শুরুর দিনে বাঙালি ঐতিহ্যের পোশাক হিসেবে মেয়েরা পরে শাড়ি। খোপায় ফুল পরে বাঙালি তরুণীরা মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেয়া যেন ঐতিহ্যের গৌরবকে করে শাণিত। কিন্তু তার সঙ্গে ছেলেরা নিত্য ব্যবহার্য লুঙ্গিকে কেন আনতে পারে না। লুঙ্গি পরে অন্তত বর্তমান ও অতীতকে একসূত্রে গাঁথা যায়। যদি জাতীয় পোশাকের প্রশ্ন আসে তাহলে শাড়ি ও লুঙ্গিকেই বাছাই করতে হবে। তাহলে ১৪২৬ এর যাত্রাটা হোক না পহেলা বৈশাখের উৎসব থেকে। শাড়িতো বাস্তবায়ন হয়েই গেছে বাকি আছে লুঙ্গি। লুঙ্গির সঙ্গে পাঞ্জাবি, শার্ট  কিংবা ফতুয়া যাই ইচ্ছা পরতে বাধা কী।

নববর্ষের উৎসবের সঙ্গে রূপসী বাংলাদেশের খেটে খাওয়া মানুষের সম্পর্ক। যদি বলা হয়, বৈশাখী মেলার কথা, সেখানেও রয়েছে কৃষিভিত্তিক সমাজের কতটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সময়ের প্রয়োজনে কৃষি ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে, এসেছে মেলাতেও। সেটা অনিবার্য। কিন্তু সে পরিবর্তন যদি কোনও ক্ষেত্রে ক্ষতিকর অনুসঙ্গ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। বিশ্বব্যাপী ভালোবাসা দিবস, মা দিবস, বাবা দিবস এমন হরেক উৎসব পালন হয়। তাহলে বৈশাখে কেন, মাছের রাজা ইলিশের জন্য করা হোক ইলিশ উৎসব।

ইলিশ মাছের ত্রিশ কাটা। ছবি : সংগৃহীত

বাংলা নববর্ষ ১৪২৬ আমাদের সবার জীবনে অনাবিল সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনবে এ প্রত্যাশা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নতুন বছরের প্রথম দিনে আমরা অতীতের গ্লানি ভুলে জীবনের এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়ে আশায় বুক বাঁধি। দেনা-পাওনা চুকিয়ে নতুন করে শুরু হয় জীবনের জয়গান। পহেলা বৈশাখ তাই যুগ যুগ ধরে বাঙালির মননে-মানসে শুধু বিনোদনের উৎস নয়, বৈষয়িক বিষয়েরও আধার।’

যোগ-বিয়োগের সারাংশ হিসেবে বলা যায়, পহেলা বৈশাখে স্লোগান হিসেবে যুক্ত হোক নববর্ষে প্রিয়জনকে বই উপহার দিন। পোশাকে যুক্ত হোক ছেলেদের লুঙ্গি। বর্ষবরণে পান্তা-ইলিশের অপসংস্কৃতি বাদ দিয়ে মাছের রাজা ইলিশের জন্য করা হোক জাতীয়ভাবে ‘ইলিশ উৎসব’।

হাল ছেড়ে দেওয়া দলের সদস্যরা ইলিশকে এখনই জাদুঘরবাসী বলে ডাকতে শুরু করেছে। কল্পনা করছে নিকট ভবিষ্যতে বিলুপ্ত ডাইনোসরের মতো ইলিশেরও শেষ আশ্রয় জাদুঘর। পরবর্তী প্রজন্ম ইতিহাসের পাতায় কিংবা জাদুঘরের গ্যালারিতে এসে জানবে এক সময় আমাদের পদ্মা-মেঘনা নদীতে ইলিশ নামে এক প্রজাতির মাছ ছিল। যার স্বাদ ছিল জগতজোড়া খ্যাতি। জোর কণ্ঠ ছেড়ে বলি-মিথ্যে হোক এই কল্পনা। সব বাঙালির পাতে দীর্ঘজীবী হোক ইলিশ মাছের ত্রিশ কাঁটা।

আজকের পত্রিকা/আ.স্ব/জেবি