রমজানের রাতের ঢাকা তার ঐতিহ্য হারিয়েছে। ছবি : সংগৃহীত

সোহরাব আলীর বয়স ৮৬। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকার বকশীবাজারে। একটি মফস্বল মেগাসিটি হয়েছে তার চোখের সামনে। বদলে যাওয়া শহরের অনেক স্মৃতিই ভিড় করে তার মনের অলি-গলিতে।

তার সঙ্গে কথা হয় আগের আমলের ঢাকার রমজান পালন নিয়ে। স্মৃতির ডালি যেন খুলে তার। বলেন, ঈদের আগেই একটা ঈদ আছিলো রমজান। চকবাজারের ইফতার তো আছিলোই। সেই ইফতার পুরা মহল্লার সব বাড়িতে বিলি বন্টন হইতো। আমরা মসজিদেও ইফতার করতাম। তারাবির নামাজে কোরআন খতম দিতাম। এরপর রাইতে কাশিদা গাইয়া মহল্লার হগ্গলরে উঠাইতাম। মহল্লা ঘুমাইত না সারা রাইত। মহল্লার ছোট বড় সবাই মিল্লা সেহেরি খাইয়া ফজরের নামাজ পড়তাম।

সোহরাবের আক্ষেপ সেই ঢাকা আর নাই। তার কাছে কাশিদা নিয়ে জানতে চাইলে বলেন, এইডা পঞ্চায়েতই ঠিক করতো। সুন্দর গলার পোলারা ভোর রাইতে পুরা ধইরা কাশিদা হুনাইতো। এহন আর তেমন কিছু দেহি না।

আরবি ভাষায় পরিজনদের প্রশংসামূলক কবিতাকে বলে কাশিদা। পুরান ঢাকা ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এক সময় ‘কাশিদা’ গেয়ে রোজাদারদের জাগিয়ে তোলার প্রচলন ছিল। তখনও মসজিদে মসজিদে মাইকের ব্যবহার শুরু হয়নি। আর সে জন্য রমজান মাস এলেই তরুণেরা পাড়া-মহল্লায় হেঁটে হেঁটে হামদ, নাত ও উর্দু কাশিদা গেয়ে রোজাদারদের ডেকে তুলতেন। কাশিদা দলের সদস্য ঠিক করতেন সেই মহল্লার পঞ্চায়েতগণ। ঢাকায় পাঠান ও মোঘল আমল থেকেই কাশিদা গেয়ে সেহেরি খাওয়ার প্রচলন শুরু হয়। রফিকুল ইসলাম লিখিত ‘যুগে যুগে ঢাকায় ঈদ মিছিল’ গ্রন্থটি থেকে জানা যায় যে, কাশিদার এই প্রচলনটি খাজা আহসান উল্লাহর সময় উৎকর্ষতা লাভ করেছিল। সেসময় কাশিদা প্রতিযোগীতাও হতো।


এ সময়ের পুরান ঢাকাও জেগে থাকে অনেক রাত পর্যন্ত। ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা কেন্দ্রের পরিচালক আজিম বক্স আজকের পত্রিকাকে বলেন, আমাদের ছোটবেলায় আমরা দেখেছি পাড়ায় পাড়ায় কাশিদার দল থাকতো। পুরো ঢাকার কাশিদা দলগুলো নিয়ে প্রতিযোগীতার আয়োজন হতো।

তিনি আরো বলেন, কাশিদার সুর ও কথা ছিল অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। একজন দলনেতা থাকতেন। বাকিরা তার সঙ্গে কোরাস গাইতেন। কোনো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার হতো না কাশিদায়।

আজিম বক্স দু:খ প্রকাশ করে বলেন, দেখতে দেখতে আমাদের চোখের সামনে ঢাকার এই ঐতিহ্য হারিয়ে গেল।

নতুন ঢাকায় তেমন কিছু হয় না। এখন মসজিদের সংখ্যা বেড়েছে। মসজিদের মাইকে রোজাদারদের ঘুম থেকে ওঠানের জন্য ডাকা হয়।

তবে মিরপুর, মোহাম্মদ এর মতো কিছু এলাকায় এখনও কিছু তরুণকে রাতে দেখা যায়। তারা টিন পিটিয়ে চিৎকার করে, ‌রোজদারু, জিন্দারু… আল্লাহ কো পেয়ার করো। সঙ্গে চলে হামদ-নাত আবৃত্তি।

এভাবে কিছু এলাকায় টিকে আছে রমজানের ঢাকার কিছু ঐতিহ্য। সময়ের সঙ্গে যার ধরণ বদলেছে। ঢাকায় বেড়ে ওঠা প্রবীণদের স্মৃতিতেই একমাত্র বেঁচে আছে কাশিদা। একে ফিরিয়ে আনার দায় বোধ কার সে প্রশ্নের উত্তর অজানা।

আজকের পত্রিকা/এমএইচএস