ছবি: আজকের পত্রিকা

ভয়াবহ ডেঙ্গুর কারণে ১৭ কোটি মানুষ আতঙ্কিত। প্রতিদিন প্রায় চার হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। মৃতের সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়েছে। চারদিকে আহাজারি। বাংলাদেশের আকাশ যেন ভারী হয়ে উঠেছে মানুষের চিন্তায়, আহাজারিতে। এমন সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, ‘মশারি টানান, মশায় কামড়াবে না।’ আমার হৃদয় চমকে উঠল। অনেকদিন আগেই মশারি টানানোর ব্যাপারে সিরিয়াস হয়েছিলাম; মন্ত্রীর কথা শুনে নয়, সাপের ভয়ে।

তখন ছাত্র ছিলাম। জাহাঙ্গীরনরগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝ বরাবর পশ্চিম কোণে অবস্থিত আল বেরুনি হলে থাকতাম। রুম নাম্বার ১১০। নীচতলা। অলসতার কারণে মশারি টানাতাম না। কিন্তু এমনি বৃষ্টি-বর্ষার সন্ধ্যায় হঠাৎ একদিন দেখি, সিঁড়ির কাছে একটি বাচ্চা সাপ এঁকেবেঁকে যাচ্ছে। সাপটির সামনে গিয়ে শব্দ করতেই সেটি ফণা তুলে দাঁড়াল। বুঝলাম গোখরার বংশধর। নিজ রুমে গিয়ে দেখি জানালার শিকে পেঁচিয়ে রয়েছে ওরকমই আরেকটি পিচ্চি। মনে মনে ভাবলাম, বাচ্চাগুলোকে ঘুরতে পাঠিয়ে মা-বাবা নিশ্চয়ই আশেপাশেই রয়েছে। সাংসারিক আলাপ আলোচনা করছে। দরকার হলেই চলে আসবে। ভয়ে আমার পিলে চমকে গেল। শরীর-মন থরথর করে কাঁপতে লাগল। সেদিন থেকে সিরিয়াসলি মশারি টানানো শুরু করলাম।
তারপর তো কেটে গেছে বহু বছর। এরমধ্যে নিজেও সংসার পেতেছি। বাবা হয়েছি। আগে অলসতার কারণে মশারি না-টানালেও এখন আপন পরিবারের কথা চিন্তা করে নিয়মিত সব ঘরের মশারি আমিই টানাই।

এতদিন পর মন্ত্রীর মুখে মশারি টানানোর কথা শুনে মনটা আনন্দে নেচে উঠল। পূর্বে এ রকম জনদরদী মন্ত্রী ছিলেন না। দায়িত্ব নিয়ে মশারি টানানোর কথা এ যাবতকালে কাউকে বলতে শুনিনি। দেশ এখন উন্নত হয়েছে। মন্ত্রী নিজেই মাইক হাতে নিয়ে মানুষকে সচেতন করছেন। উদাত্ত কণ্ঠে বলছেন, ‘মশারি টানান, মশায় কামড়াবে না।’ ধন্যবাদ মন্ত্রী মহোদয়! কিন্তু একটা খটকা থেকেই যাচ্ছে। কেননা বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এডিস ভাইরাসবহনকারী মশারা কামড়ায় ভোরে সাঁঝবেলা। ফলে ভোরবেলা মশারির মধ্যে থাকলেও সাঁঝবেলাতে তো নিত্তনৈমিত্তিক বৈষয়িক কাজের কারণে কোনোভাবেই মশারি আচ্ছাদিত থাকা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে মানুষ কি মশারি সদৃশ কোট পরে থাকবেন? কোথায় পাওয়া যাবে সেই কোট? এত অল্প সময়ের মধ্যে কেইবা বানাবে কোটি কোটি মসকিউটো কোট?

দেশে অবশ্য অনেক জনদরদী কোম্পানি রয়েছে। যেমন হারপিক কোম্পানি। তারা অথবা তাদের দোসররা শুক্রবার বাদ জুম্মা ৫০০মিলির পুরো বোতল হারপিক কমোডে ঢেলে ফ্ল্যাশ করতে আহবান জানিয়েছে নগরবাসীকে। নিঃসন্দেহে এটা যুগান্তকারী মানবসেবামূলক এক আহবান। কিন্তু এখানেও ঘাপলা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী মশারা থাকে ভদ্রপল্লীর পরিস্কার ও বদ্ধ পানিতে। অর্থাৎ নর্দমা বা সুয়ারেজ লাইনে তাদের কোনো গুলতানিমারার শাখা-প্রশাখা নেই। ফলে হারপিক কোম্পানির দূরভিসন্ধিটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। তারা লজ্জাহীনভাবে চাচ্ছে, হারপিক বিক্রি করতে। মোটেও মশা মারতে নয়। তাহলে কে বানাবে মসকিউটো কোট?

মেয়রদ্বয় ফগ মেশিন নিয়ে সিনেমাটিক স্টাইলে মশার সাথে যুদ্ধে নেমেছেন। মশার গুষ্টি নিপাত না করে তাঁরা ঘরে ফিরবেন বলে মনে হচ্ছে না। এটা অবশ্য জাতির আশাহীন ঘোলা চোখের জন্য আরামপ্রদ দৃশ্য। দারুণ আশাব্যঞ্জক। ফলে মেয়রদ্বয় মসকিউটো কোট বানানের কাজে মন দেবেন বলে মনে হয় না। সুতরাং তাঁরা থাকুন যুদ্ধের ময়দানেই।

আর কে আছেন? স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন কর্তাব্যক্তি। তিনি অবশ্য ভেগেছেন। দেশের ঘোর আপতকালীন সময়ে তিনি দেশ ছেড়ে ভেগেছেন। বর্তমানে তিনি তাঁর প্রিয় স্ত্রী ও কন্যা নিয়ে মালেশিয়ায় আছেন, প্রমোদ ভ্রমণে। তিনি ব্যস্ত মানুষ। পরিবারকে সময় দিতে পারেন না। ফুরসত পেয়েছেন পরিবারকে সময় দেওয়ার। সুতরাং তিনিও থাকুন বিদেশেই। সময় দিন পরিবারকেই।
কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান। নজরুলের কবিতার শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসুন তরুণ সমাজ। চাহিদা যখন চরমে তখন আর কোম্পানির উপর দ্বারস্থ হওয়া কেন? আপনারা কেন কাঁচি আর সুই সুতা হাতে তুলে নিচ্ছেন না? কাঁচি দিয়ে মশারি কাটা কী এমন কঠিন কাজ? জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে কি মসকিউটো কোট বানাতে পারবেন না? অবশ্যই পারবেন।

আপনাদের প্রতি চিরদিনই আমাদের অপার আস্থা। ভাষা আন্দোলনে তরুণরাই প্রতিবাদ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তরুণরাই বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন। স্বৈরাচার সরকারকেও বদ করেছিলেন এই তরুণ সমাজ। আপনারা বিপদের দিনে সবসময়ই ঝাপিয়ে পড়েছেন। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটবে না। আসুন মানবতার সেবায় মাঠে নামুন। তবে দয়া করে কোনো দলীয় পতাকা নিয়ে আসবেন না! আসবেন মানবতার পতাকা নিয়ে!

লেখক: মহিউদ্দীন আহমেদ
নাট্যকার, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক

আজকের পত্রিকা/সিফাত