প্রচন্ড মুসল ধারে বৃষ্টি। রাত তখন সাড়ে দশটা, আকাশে মেঘ ও বজ্র পাতের গর্জন, শিলা বৃষ্টি মনে হয় আকাশ বেধ করে বের হচ্ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হইতে ডাক্তার সাহেব ফোন করেছে থানার বড় বাবুকে হাসপাতালের জরুরী বিভাগে অজ্ঞাত নামা একটা মেয়ের লাশ ষ্টেচারে আছে, প্রয়োজনীয় আইন গত ব্যাবস্থা নেয়ার জন্য অনুরোধ করে।

তখন থানার বড় বাবু এস আই বিপ্লবকে ফোন করে বলে হাসপাতালে যাও অজ্ঞাত মেয়ের লাশ আছে,এই লাশের প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা নাও।

বিপ্লব দারোগা সাহেব বজ্র পাতের মধ্যে একটা টমটম নিয়া সাথে একজন মহিলা পুলিশ ও একজন পুরুষ পুলিশ নিয়া থানা হইতে প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র সাথে নিয়া হাসপাতালে রওয়ানা হইয়া হাসপাতালের জরুরী বিভাগে গামছা দিয়ে ঢাকা মৃত দেহটি দেখিতে পায়, তখন কেউ আছে কিনা লাশের সাথে অথবা কে নিয়া এসেছে জিজ্ঞাসা করলে,ডাক্তার সাহেবের উত্তর মৃতের স্বামী ও শাশুড়ি ছিল সম্ভবত আপনারা হাসপাতালে প্রবেশ করেছেন দেখে তারা সরে গেছেন।

দারুগা সাহেব তখন অজ্ঞাত মৃত দেহ হিসাবে প্রাথমিক সুরতহাল করার সময়ে দেখা গেল মেয়েটি উজ্জল শ্যাম বর্ণের চেহারা যেন ঘুমিয়ে আছে, মৃত ভিকটিম এর ডান হাতের কনিষ্ট ও মধ্যমা আঙ্গুলে সামান্য ছোলা জখম আর উল্লেখ যোগ্য কোন জখম পরিলক্ষিত হয় নাই, তবে মৃতের মাথার মধ্যে ভাগে সামান্য/কিঞ্চিত ফোলা পরিলক্ষিত হয় তখন ও আকাশে গর্জন বয়েই চলেছে বৃষ্টি ও মুসল ধারে চলছে কর্তব্যর খাতিরে দারুগা সাহেব এমন বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে যেতে বাধ্য হয়েছে।

রাত তখন একটা হইবে দারুগা সাহেবের মোবাইলে ফোন,অপরিচিত নাম্বার অপর প্রান্ত থেকে বলছে স্যার স্লামালিকুম আমি (মেম্বার সারাজ) (ছদ্ম) নাম, মেয়েটার স্বামীর বাড়ি আমার ওয়ার্ডে মেয়েটার নাম লাবনি, স্বামীর নাম লাবু, শশুড় এর নাম সামছু, গ্রাম-সোহাগপুর, সকল নাম/ঠিকানা(ছদ্ম) নাম,যাক দারুগা সাহেবের জন্য সহজ হয়ে গেল।

নাম/ঠিকানা পুরুন পুর্বক প্রয়োজনীয় কাজ শেষে পর্যাপ্ত আলোতে সুরতহাল সম্পন্ন করে জেলা সদর হাসপাতাল হইতে এম্বুলেন্স এনে পুলিশ স্কটের মাধ্যমে ময়না তদন্তের জন্য পাঠাইয়া দেন।

রাত তখন ০৩টা হইবে বৃষ্টি থেমে গেছে টর্স লাইটের আলোতে আরও ফোর্স সহ মৃতের শশুর বাড়ির দিকে রওনা হন, একদিকে বৃষ্টির রাত, গ্রামের মেঠো পথ ঘুট ঘুটে অন্ধকার ঝি ঝি পোকার আলো ঝলছে, কাদা মাঠির পিচলানো রাস্তায় হাটছে ০৩ সদস্য বিশিষ্ট পুলিশের দল।

তাদের নেই কোন ভয় নেই কোন ক্লান্তি প্রায় ০৪ কিলোমিটার রাস্তা হেটে ভিকটিমের শশুর বাড়ি পৌছিয়া ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া দারুগা সাহেব দেখল রান্না ঘরে একটা কাল ওড়না চালের সাথে কাঠের মধ্যে বাধা আছে।

নিচে একটা চেয়ার ও কাঠের ছোট চৌকি যাহা গ্রাম বাংলায় সাধারনত পিড়ি বলা হইয়া থাকে। মৃতের শশুর বাড়ির ঘরের লোকজন সব পালিয়েছে,আশপাশের ঘরের কেউ কিছু বলতে পারেনা।

শুধু এই টুকু জানা গেল মেয়েটার বাড়ি উত্তর বংগে কিছু দিন আগে ঢাকা একটা কাপড়ের মিলে চাকরি করার সুবাধে মেয়েটাকে ভাগাইয়া প্রেম করে বাড়িতে নিয়া আসে ও স্থানীয় কাজির মারফত বিয়ে শাদি করাইছে, তিন সদস্য পুলিশের দল চলল কাজির বাড়ি,কাজি সাহেব ফজরের নামাজের জন্য এমনেই হয়ত উঠবে হাচি কাশি দিচ্ছে তার মধ্যে পুলিশের ডাক,দারোগা সাহেব বলতেছে কাজি সাব আমি থানার দারুগা ভয় টেনশন না করে দরজা খুলুন জরুরী কথা আছে, তখন দরজা খুলে দিলে ঘটনার বিষয়ে বললে মৃত মেয়েটার পুর্ন নাম ঠিকানা পাওয়া যায়। তখন পুলিশ দল থানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন, এদিকে সকাল ১১.১৫ মিনিট ময়না তদন্তের জন্য নিয়ে যাওয়া পুলিশ সদস্যর ফোন,স্যার ডাক্তার ময়না তদন্ত করতেছে না।

আপনাকে তাড়াতাড়ি আসার জন্য বলছে ডাক্তার সাহেব,তখন থানার বড় বাবুকে বিস্তারিত বলে জেলা সদর হাসপাতালে চলে আসে, আর ডাকার কারন জিজ্ঞাসাবাদে ডাক্তার সাহেব বলে আপনি মাথার মধ্যে সামান্য ফোলা জখম লিখলেন,ফোলা কোথায়, আসলে ১২ ঘন্টার উপরে ঘটনা তাই ফোলাটা মিলে গেছে, ডাক্তার তখন দারুগা সাহেব কে বলতেছে যে, এইটা চেঞ্জ করে দেন। দারুগা সাহেব বলেন রাতে তো ফোলা ছিল, এখন নাই তাহলে আমি কি করব। আর এই সুরতহালের কপি তো ০৬ কপি হইছে এইটা চেঞ্জ করা সম্ভব না।

যাক পরবর্তীতে ময়না তদন্ত শুরু হল দারুগা সাব মর্গেই ছিল, তখন দেখা গেল ডুম যখন মাথার চামড়া কেটে সিলাই করতে করতে মাথার মধ্যে গেল, তখনই ঘটল আসল ঘটনা, মাথার মধ্যে ভাগে স্কালটা প্রায় ০৩ ইঞ্চি ফাটা মরা রক্ত গড় গড়িয়ে পড়তেছে ডাক্তার সাব সাথে সাথে দারুগা সাহেবকে ডেকে আনার জন্য সরি বলল। পাশাপাশি ডাক্তার মৌখিক ভাবে এটা মার্ডার বলল।

ডুম যখন গলা হইতে পেট এর চামড়া কেটে তল পেঠে গেল তখন ডাক্তার পেটের ভিতর থেকে একটা বাচ্ছা বের করে দিল। দারগা সাব জিজ্ঞাস করল এটা কি স্যার ডাক্তার উত্তর দিল এটা ১৬ সপ্তাহের একটা বাচ্ছা। দারুগা সাহেবের চোখ প্রায় কপালে ডাবল মার্ডার।

ময়না তদন্ত শেষে দারগা সাব থানায় গিয়ে বড় বাবুকে বিস্তারিত বললে তাৎক্ষনিক ভাবে বড় বাবু দ্রুত এই মৃত লাবনীর স্বামীকে গ্রেফতার এর হুকুম দিল।

এই বার দারুগা সাহেব বেপড়োয়া হয়ে আসামীদের হন্য হন্য হয়ে খুজতে লাগল, কিন্তু আসামীরা তো ঘটনার পড় থেকেই লাপাত্তা, এদিকে এই ঘটনার উপরে থানায় একটা অস্বাভাবিক অর্থ্যাৎ ইউ/ডি মামলা হয়েছে। দিন যায় রাত আসে সমস্ত তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের ভিক্তিতে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যহত রইল।

এদিকে দারগা বাবু লক্ষ্য করল তার চলা ফেরা কাজ কর্মের মধ্যে কোন একটা অদৃশ্য ছায়া তার পিছু পিছু হাটছে, একদিন ঘুমের ঘুরে দারুগা বাবু দেখল লাবনী মেয়েটা তার কাছে কান্না করতেছে এই বলে যে, ভাই আমার বাচ্ছাটা দুনিয়ার আলো বাতাস দেখতে পারল না। আমি খুনিদের বিচার চাই। দারোগা সাহেবের চলা ফেরার পথে প্রায় সময় মনে হত কোন একটা অদৃশ্য ছায়া পিছু পিছু থাকত।

যাই হোক ঘটনার প্রায় দুই মাস পর লাবনীর মৃত্যুর পি.এম রিপোর্ট পাওয়া গেল, রিপোর্টে মাথায় আঘাতসহ অনেক বিবরন দেখা গেল, এইবার দরুগা বাবু ভিকটিমের বড় ভাইকে ঘটনার বিস্তারিত জানাইয়া লেন্ড ফোনে সংবাদ দিলে, বড় ভাই এর উত্তর, ভাই,বোন চলে গেছে সেখানে মামলা দিয়ে আর কি হবে।

যাই হোক নিয়ম অনুযায়ী দারোগা সাহেব নিজে বাদী হইয়া একটা এজাহার দিল, বড় বাবু তাহা মামলা হিসাবে রুজু করিয়া একজন তদন্ত কারী কর্মকর্তা নিয়োগ দিল। কথায় আছে ধর্মের কল বাতাসে নড়ে, খুনি নিজেই দারুগা সাহেব কে ফোন করল স্যার আমি লাবনীর স্বামী, লাবু, আমি আপনার কাছে সারেন্ডার করতে চাই তবে কোন মারধর করতে পারবেন না। আমি সব ঘটনার কথা বলব। বলল ঠিক আছে আসেন।

কথা বার্তার একপর্যায়ে খুনের পিছনের কারন লাবু মিয়া বর্ননা করতে লাগল। কথা গুলো এই রকম স্যার লাবনী আর আমি একই টেক্সটাইলে চাকরি করতাম। আমি লাবনীকে খুব পছন্দ করতাম তাই আমি লাবনীকে সুজা আমার বাড়িতে নিয়ে আসি ও মায়ের অনুমতি নিয়া বিয়ে করি। সত্য বলতে কিছু দিন যাওয়ার পর আমার মা তেমন ভাল ব্যাবহার লাবনীর সাথে করত না।

আমি বুঝতে পারছিলাম যে আমার শশুড় বাড়ি অনেক দুরে আবার শশুড় বাড়ি হইতে কিছুই পাইনি, আমার মায়ের ধারনা ছিল ছেলে আমার ঠকেছে, তাই একটু পরিবারে অশান্তি দেখা দেয়।

ঘটনার দিন আমার স্ত্রী লাবনী তার বাবার বাড়ি ফোনে কথা বলে কান্না কাটি করতেছিল, তাই লাবনীর মা আমাকে ফোন দিল, বাবা তোমরা কেমন আছ, কয়দিন আগে তোমরা বেড়াইয়া গেলা কত হাসি খুশি দেখলাম বাড়ি ঘরের লোকজন তোমাদের আট হাজার টাকা সালামী দিল, তোমরা খুশি মনে গেলা, এখন আমার মেয়ে কান্দে কেন লাবু বলে স্যার আমি আকাশ থেকে পড়ি,আমি কোন দিন শশুড় বাড়ি গেলাম, সার আসল কথা হল লাবনীর আগে ও একটা ছেলের সাথে প্রেম ছিল তাকে বিয়ে করে জামাই সহ লাবনীর বাবার বাড়িতে গিয়েছিল সব ঘটনা শুনে শেষে বাড়ির লোকজন মেনে নিয়েছিল তাদের বিয়ে, কিন্তু এই ঘটনা লাবনী ছাড়া কেউ জানত না।

এই ঘটনা শুনার পর লাবু লাবনীকে ঘটনার বিস্তারিত বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে দুজনার মধ্যে কথা কাটাকাটি ও ঝগড়া শুরু হয় একপর্যায়ে পাশে পড়ে থাকা আটার ইঞ্চি লম্বা আর চার ইঞ্চি প্রস্ত লোহার পাইপ দিয়া মাথায় দেয় বারি এক বাড়িতেই কপোকাত লাবনী, পরে লাবুর মা সহ পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়া লাবনীকে রান্না করার রুমে ঝোলাইয়া দেয় প্রকৃত পক্ষে ফাসিতে আত্মহত্যা করেছে বলে চালিয়ে দিবে কিন্তু আল্লাহর কি মেহের বান। খুনিরা কখনও ছাড় পায় না…।

লেখক : নাজমুল হক, এসআই, হবিগঞ্জ সদর মডেল থানা।

  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share