কাজী ফয়সাল
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

চন্দ্রিমা হাউজিং সোসাইটিতে নদীর মনগড়া সীমানা পিলার। ছবি: আজকের পত্রিকা

বছরের পর বছর কর্তৃপক্ষের অবহেলার সুযোগে দখল বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন হাউজিং কোম্পানী। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার আশপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদী দখল করে তীরেই মনগড়া সীমানা পিলার বসিয়েছে প্রভাবশালী ব্যক্তি মালিকানাধীন হাউজিং কোম্পানীগুলো।

অন্যদিকে স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু অসাধু ব্যক্তি নদী দখল করে তা বিক্রি করে দিচ্ছে বহিরাগত সাধারণ মানুষের কাছে। যার ফলে ক্রেতারা অনেকটা অজান্তেই প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। যার প্রভাব ইতোমধ্যে চলমান নদী উচ্ছেদ অভিযানে পড়ছে।

লালবৃত্তে মনগড়া সীমানা পিলার ও নদীর প্রকৃত সীমানায় স্থাপনা। ছবি: আজকের পত্রিকা

অসাধু হাউজিং কোম্পানীগুলো কেবল সীমানা পিলার বসিয়ে থেমে থাকেনি। ওই ভরাটকৃত জায়গা প্লট আকারে বিক্রি করে আসছে সাধারণ মানুষে কাছে। যার ফলে প্রতারিত হচ্ছে ওইসব জায়গার ক্রেতারা। বিশিষ্টজনরা বলছেন, এমন প্রতারণার ফাঁদে পড়ার বড় কারণ অসচেতনতা ও ভূমি সংক্রান্ত অজ্ঞতা।

সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানাধীন তুরাগ নদীর তীর কেন্দ্রীক গড়ে ওঠা চন্দ্রিমা উদ্যান হাউজিংসহ আরো কয়েকটি হাউজিংয়ে সরেজমিনে গিয়ে পাওয়া যায় এমনই খামখেয়ালীর দৃশ্য।

সরেজমিনে দেখা যায়, ‘চন্দ্রিমা হাউজিং সোসাইটিতে’ তুরাগ নদীর তীর ঘেষে রয়েছে অন্তত অর্ধ শতাধিক পিলার, যেগুলো তারা নিজেরাই মনগড়াভাবে বসিয়েছে বলে জানা গেছে বিআইডব্লিউটিএ ও স্থানীয় সচেতন মানুষের মুখে। ওই হাউজিংটির মালিক হাজী আক্কাস আলী নামের একজন, যিনি ক্ষমতাশীন রাজনৈতি দলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, তার বসবাস মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে। সরেজমিনে একই রকমের অভিযোগ ও দৃশ্য মেলে তুরাগের ঢাকা উদ্যান, বসিলা গার্ডেন সিটি, আমিন মোমিন হাউজিং, চাঁদ হাউজিং, বুড়িগঙ্গার মধু রিভারভিউ সিটিসহ একাধিক হাউজিং কোম্পানীর বিরুদ্ধে।

লালবৃত্তে নদীর প্রকৃত সীমানার ভিতরে দখল করা স্থাপনা। ছবি: আজকের পত্রিকা

এমন দৃশ্য ও অভিযোগের বিষয়ে মোবাইল ফোনে বসিলা গার্ডেন সিটির জয়েন্ট সেক্রেটারি শামীম আহমেদের কাছে জানতে চাওয়া হয়। তিনি বলেন, আমাদের জায়গা ঠিকঠাকই আছে। তবে দখলের অভিযোগে অভিযুক্ত কেবল আমরা নই। আরো অনেকে হাউজিংও আছে। আমরা ১ ফিট ভরাট করলে অন্যরা ১০০ ফিট ভরাট করছে!

বসিলা গার্ডেন সিটির কর্তৃপক্ষ শামীমের শেষ কথায় ইঙ্গিত পাওয়া যায় তারাও নদীর অংশ অবৈধভাবে দখলে রেখেছেন। একই রকম পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও নিজেরা নির্দোশ দাবি করে চন্দ্রিমা হাউজিং সোসাইটিও।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কেবল রাজধানী ঢাকার আশপাশের নদী দখল নয়। ঢাকার বাইরেও মনগড়া সীমানা পিলার বসিয়ে দখল ও প্রতারণা বাণিজ্য করছে অসাধুরা। অথচ কেবলই প্রশাসনের নজর নেই।

চন্দ্রিমা হাউজিং সোসাইটিতে নকল সীমানা পিলার। ছবি: আজকের পত্রিকা

এ বিষয়ে নদী কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) যুগ্ম পরিচালক আরিফ উদ্দিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, এর আগে আমরা নদীর তীরে যে সীমানা পিলার স্থাপন করেছিলাম, সেগুলোর হেরফের করে ফেলেছে হাউজিং কোম্পানীগুলো। আমরা তাদের বসানো পিলারগুলো উচ্ছেদ করবো। একই সঙ্গে নদীর দখল হওয়া জায়গা ড্রেজিং করে নদীকে ফিরিয়ে দেবো। এমন পরিকল্পনা নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। হাউজিং কোম্পানীগুলোর মাধ্যমে কেউ প্রতারিত হলে সেবিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ এর কোনো দায় নেই। তারা জমি কিনেছেন হাউজিং কোম্পানীর কাছ থেকে, ভূক্তভোগীরা চাইলে আইনগতভাবে ওই হাউজিং কোম্পানীর সাথে বিষয়টি সমাধান করতে পারেন।

এ বিষয়ে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক আবদুস সোবহান আজকের পত্রিকাকে বলেন, নদীর সীমানা পিলার সরকার নির্ধারণ না করে কোনো হাউজিং কোম্পানী নির্ধারণ করার বিষয়টি সত্যিই হতাশজনক ঘটনা। প্রশাসনের আশকারা না পেলে ওই কোম্পানীগুলো কি করে এতোটা স্পর্ধা পায়! এই শত শত সীমানা পিলার তারা নিশ্চই একদিনেই বসায়নি! এসবর অন্যায় অপরাধ কি সরকারের কারোই নজরে পড়লো না! অন্তত্য স্থানীয় প্রশাসন এ বিষয়ে কি ভূমিকা রেখেছে সেটিই এখন খতিয়ে দেখার বিষয়।

এমন দৃশ্য কেবল রাজধানী কেন্দ্রীক বুড়িগঙ্গা, তুরাগ কিংবা বালু নদীর বিষয়ে নয়। দেশের অনেক জায়গাতেই এমন দৃশ্য বিস্তৃত রয়েছে। সরকার এই ৩ নদীকে অধিকতর গুরুত্ব দিচ্ছে বলেই এসব দৃশ্য বের হয়ে আসছে।

তিনি আরো বলেন, আমার জানামতে সিএস এবং আরএস খতিয়ান দেখে নদীরগুলোর সীমানা নির্ধারণ করার কথা ছিলো জেলা প্রশাসনের। একই সঙ্গে গণপূর্ত অধিদপ্তর (পিডব্লিউডি) অথবা বিআইডব্লিউটিএ নির্ধারিত স্থানে সীমানা পিলার স্থাপন করার কথা ছিলো।

তার মানে যারা এসব দায়িত্ব পালন করার কথা তারা তা সঠিকভাবে পালন করেনি। একইসঙ্গে যারা এগুলো তদারকী করার কথা ছিলো তারাও দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেনি। ফলে এমন পরিস্থিতি তাদেরই ব্যর্থতা।

মনগড়া সীমানা পিলার। ছবি: আজকের পত্রিকা

হাউজিং কোম্পানী কর্তৃক মনগড়া স্থাপিত পিলার দেখে যারা নদী দখল করা জায়গা কিনেছেন তারা নিশ্চিতই প্রতারণার শিকার হয়েছেন। আমি সরকারের কাছে আহ্বান জানাবো যেসব হাউজিং কোম্পানী নদী দখল করার পর প্লট তৈরি করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে ভূক্তভোগী মানুষগুলোর ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এর মধ্যে অনেক ক্রেতাই অসহায় রয়েছেন। যারা হয়তো সারা জীবনের উপর্জান দিয়ে জায়গা ক্রয়, বাড়ি তৈরি করে প্রতারিত হয়েছেন। তাদের নিশ্চই প্রভাবশালী হাউজিং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা উদ্ধারের ক্ষমতা নেই। আশা করছি হাউজিং কোম্পানীগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা সরকার করবে।

তবে এখানে আমার একটা প্রশ্ন থেকে যায়, নদীর জায়গা বিক্রিতে নিশ্চই হাউজিং কোম্পানীগুলো ক্রেতাদের দলিলসহ অন্যান্য কাগজপত্র বুঝিয়ে দিয়েছে। সেইক্ষেত্রে এমন অনিয়মের সঙ্গে স্থানীয় ভূমি অফিসের কোনো অবৈধ হস্তক্ষেপ রয়েছে কিনা প্রশ্ন উঠতে পারে! আশা করছি সরকারের উর্ধ্বতন পর্যায় বিষয়টি তদন্ত করে দেখবেন।

আবদুস সোবহান বলেন, আমরা নদী দখলমুক্ত ও দূষণমুক্ত অবশ্যই চাই। সরকার এসব উচ্ছেদের কাজ অবশ্যই অব্যহত রাখুক এমনটিই কামনা। তবে দায়িত্বশীল যাদের কারনে হাউজিং কোম্পানীগুলো সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করার সুযোগ পেয়েছে তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

আজকের পত্রিকা/কেএফ/এমএইচএস